
দূরে একটি জাহাজ দেখা যাচ্ছিল।
প্রথমে কেউ নিশ্চিত হতে পারছিলেন না—সেটি সত্যিই জাহাজ, নাকি বরফের সমুদ্রের ওপর আলো ও কুয়াশার কোনো বিভ্রম। এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডের পাথুরে তীরে অপেক্ষমাণ মানুষগুলো তখন এতটাই ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত এবং বিচ্ছিন্ন যে আশাও তাদের সঙ্গে নিষ্ঠুর খেলা করতে পারত।
তারপর জাহাজটি আরও কাছে এলো।
১৯১৬ সালের ৩০ আগস্ট। চিলির ছোট বাষ্পচালিত নৌযান Yelcho বরফ ঠেলে দ্বীপের উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছিল। জাহাজটির ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন আর্নেস্ট শ্যাকলটন—সেই মানুষ, যিনি চার মাস আগে সাহায্য আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাঁচ সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে একটি ছোট নৌকায় দিগন্তে হারিয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি চিৎকার করে জানতে চাইলেন, সবাই কেমন আছে।
উত্তর এলো—সবাই নিরাপদ, সবাই ভালো।
অসম্ভব শোনালেও এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডে রেখে যাওয়া ২২ জনের একজনও মারা যাননি। এক ঘণ্টার মধ্যেই সবাই Yelcho-তে উঠে পড়েন। প্রায় দুই বছর ধরে চলা অনিশ্চয়তা, ক্ষুধা, রোগ, বরফ এবং মৃত্যুভয় অবশেষে শেষ হয়েছিল। Royal Museums Greenwich
কিন্তু এই দৃশ্যের শুরু হয়েছিল বিজয় দিয়ে নয়, একটি বিরাট ব্যর্থতা দিয়ে।
পৃথিবীর শেষ বড় অভিযানের স্বপ্ন
বিশ শতকের শুরুতে অ্যান্টার্কটিকা ছিল মানুষের কল্পনায় পৃথিবীর শেষ অজানা মহাদেশ। ১৯১১ সালে রোয়াল্ড আমুন্ডসেন দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছে যাওয়ার পর মেরু অভিযানের পরবর্তী বড় লক্ষ্য হয়ে ওঠে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশকে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত অতিক্রম করা।
আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশ অভিযাত্রী আর্নেস্ট শ্যাকলটন সেই লক্ষ্যেই ১৯১৪ সালে ইম্পেরিয়াল ট্রান্স-অ্যান্টার্কটিক অভিযান শুরু করেন। পরিকল্পনাটি ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। একটি দল ওয়েডেল সাগরের দিক থেকে মহাদেশে নামবে এবং দক্ষিণ মেরু পেরিয়ে রস সাগরের দিকে যাবে। অন্যদিকে Aurora নামের আরেকটি জাহাজের দল বিপরীত দিক থেকে তাদের জন্য খাদ্য ও সরঞ্জামের ডিপো স্থাপন করবে।
শ্যাকলটনের প্রধান দলের জাহাজটির নাম ছিল Endurance—বাংলায় যার অর্থ সহনশক্তি বা সহ্য করার ক্ষমতা। ভবিষ্যতের ঘটনাগুলো বিবেচনা করলে নামটি প্রায় ভবিষ্যদ্বাণীর মতো শোনায়।
১৯১৪ সালের ৫ ডিসেম্বর জাহাজটি দক্ষিণ জর্জিয়ার গ্রিটভিকেন তিমি শিকারকেন্দ্র ছেড়ে ওয়েডেল সাগরের দিকে যাত্রা করে। সেটিই ছিল পরবর্তী ৪৯৭ দিনের মধ্যে অভিযাত্রীদের শেষবারের মতো মাটিতে পা রাখা। South Georgia Heritage Trust
যখন বরফ জাহাজকে বন্দি করল
Endurance ছিল শক্ত কাঠের তৈরি, মেরু অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত একটি জাহাজ। কিন্তু অ্যান্টার্কটিকার বরফ মানুষের প্রকৌশলের হিসাব মানেনি।
১৯১৫ সালের ১৮ জানুয়ারির দিকে জাহাজটি ঘন প্যাক আইসে আটকে যায়। সামনে বা পেছনে যাওয়ার কোনো পথ ছিল না। নাবিকেরা ইঞ্জিন চালিয়ে, পাল তুলে এবং বরফ কেটে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু জাহাজটি ক্রমে একটি ভাসমান কারাগারে পরিণত হলো।
মাসের পর মাস Endurance বরফের সঙ্গে উত্তর দিকে ভেসে চলল। শীত নামল। সূর্য হারিয়ে গেল। চারদিকে শুধু অন্ধকার, বরফের চাপ এবং কাঠের জাহাজের ভেতর থেকে আসা ভাঙনের শব্দ।
এই বন্দিজীবনের মধ্যেও শ্যাকলটন একটি নিয়মিত সমাজ বজায় রাখার চেষ্টা করেন। নির্ধারিত সময়ে খাবার, কাজ, ব্যায়াম ও বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ফুটবল খেলা, গান, গল্প এবং বিশেষ দিনের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো। উদ্দেশ্য ছিল শুধু সময় কাটানো নয়; মানুষগুলোর মধ্যে শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিকতার অনুভূতি বাঁচিয়ে রাখা।
শ্যাকলটন বুঝেছিলেন, ঠান্ডা ও ক্ষুধার মতো হতাশাও প্রাণঘাতী।
১৯১৫ সালের অক্টোবরে বরফের চাপ ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জাহাজের কাঠামো বাঁকতে শুরু করে, পানি ঢোকে। ২৭ অক্টোবর শ্যাকলটন জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দেন। মানুষ, খাবার, তিনটি লাইফবোট, তাঁবু ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বরফের ওপর নামিয়ে আনা হয়।
২১ নভেম্বর Endurance শেষবারের মতো মাথা তুলে ওয়েডেল সাগরের নিচে তলিয়ে যায়। ২০২২ সালে জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,০০৮ মিটার নিচে প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। UK Antarctic Heritage Trust
জাহাজটি হারিয়ে যাওয়ার পর শ্যাকলটনের মূল অভিযান শেষ হয়ে গিয়েছিল। অ্যান্টার্কটিকা অতিক্রমের কোনো সম্ভাবনাই আর ছিল না। তাঁর সামনে তখন একটিই লক্ষ্য—সবাইকে জীবিত ফেরানো।

বরফের ওপর ভাসমান জীবন
জাহাজডুবির পর ২৮ জন মানুষ কোনো স্থলভাগে নয়, একটি ভাসমান বরফখণ্ডের ওপর তাঁবু খাটিয়ে থাকতে শুরু করেন। তাদের নিচের বরফ ধীরে ধীরে সাগরের স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল। কোথায় পৌঁছাবে, কেউ জানত না।
তাদের খাদ্য ক্রমে কমছিল। সিল ও পেঙ্গুইন শিকার করে খাবার জোগাড় করতে হতো। শেষ পর্যন্ত স্লেজ টানার কুকুরগুলোকেও হত্যা করতে হয়েছিল। পোশাক ভেজা, ঘুমানোর ব্যাগ বরফে শক্ত এবং মানুষের শরীরে ফ্রস্টবাইটের ক্ষত বাড়ছিল।
বরফের ওপর লাইফবোট টেনে কোনো দ্বীপে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এবড়োখেবড়ো বরফে কয়েক ঘণ্টায় সামান্য পথ এগোনো যেত। প্রচণ্ড পরিশ্রমের তুলনায় অগ্রগতি এত কম ছিল যে শ্যাকলটন সেই চেষ্টা বন্ধ করে দেন।
তারা “পেশেন্স ক্যাম্প” বা ধৈর্যের শিবির স্থাপন করেন। নামটির মধ্যেই তাদের কৌশল ছিল—বরফের সঙ্গে ভেসে অপেক্ষা করা।
১৯১৬ সালের এপ্রিলে তাদের বরফখণ্ড ভেঙে যেতে শুরু করে। আর অপেক্ষার সুযোগ ছিল না। তিনটি লাইফবোট—James Caird, Dudley Docker ও Stancomb Wills—পানিতে নামানো হলো।
পাঁচ দিনের ভয়ংকর নৌযাত্রার পর তারা এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডে পৌঁছান। ৪৯৭ দিন পর প্রথমবারের মতো তাদের পায়ের নিচে শক্ত মাটি ছিল। কিন্তু এটি কোনো উদ্ধার ছিল না।
যে দ্বীপে কেউ আসত না
এলিফ্যান্ট আইল্যান্ড দক্ষিণ মহাসাগরের একটি পাথুরে, বরফাচ্ছন্ন ও প্রায় অনাবাসী দ্বীপ। কোনো নিয়মিত জাহাজ চলাচলের পথ সেখানে ছিল না। শ্যাকলটনের অভিযানের অবস্থান সম্পর্কে বাইরের পৃথিবীর সঠিক ধারণাও ছিল না।
সেখানে বসে অপেক্ষা করা মানে ধীরে ধীরে মৃত্যুর অপেক্ষা।
দ্বীপটির প্রথম অবতরণস্থল ছিল ঝড় ও বরফের জন্য অনিরাপদ। ফ্র্যাঙ্ক ওয়াইল্ডের নেতৃত্বে কয়েকজন অপেক্ষাকৃত ভালো একটি জায়গা খুঁজে বের করেন, পরে যার নাম দেওয়া হয় পয়েন্ট ওয়াইল্ড। দুটি লাইফবোট উল্টে পাথরের দেয়ালের ওপর বসিয়ে তৈরি করা হয় অস্থায়ী আশ্রয়।
অভিযাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। পার্স ব্ল্যাকবোরোর পায়ে গ্যাংগ্রিন দেখা দেয়। অ্যানেসথেশিয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছাড়াই তাঁর পায়ের আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছিল। সিলের মাংস, পেঙ্গুইন এবং সামান্য অবশিষ্ট বিস্কুট ছিল তাদের খাবার।
শ্যাকলটন জানতেন, সাহায্যের জন্য কাউকে বের হতেই হবে।
নিকটবর্তী পরিচিত জনবসতি ছিল দক্ষিণ জর্জিয়া দ্বীপের তিমি শিকারকেন্দ্র—প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার দূরে। মাঝখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক সমুদ্রগুলোর একটি। সেই পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য তাদের সবচেয়ে বড় নৌকাটি ছিল মাত্র ২২.৫ ফুট বা প্রায় ৬.৯ মিটার লম্বা James Caird।
এটি যুক্তিসংগত পরিকল্পনার চেয়ে মরিয়া জুয়া বলেই বেশি মনে হওয়ার কথা।
ছয় মানুষ, একটি ছোট নৌকা, ১,৩০০ কিলোমিটার সমুদ্র
২৪ এপ্রিল ১৯১৬ শ্যাকলটন পাঁচ সঙ্গীকে নিয়ে এলিফ্যান্ট আইল্যান্ড ছাড়েন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন Endurance-এর ক্যাপ্টেন ও অসাধারণ নেভিগেটর ফ্র্যাঙ্ক ওয়ার্সলি, টম ক্রিন, জন ভিনসেন্ট, টিমোথি ম্যাকার্থি এবং নৌকার কাঠমিস্ত্রি হ্যারি ম্যাকনিশ।
নৌকাটিকে সমুদ্রযাত্রার উপযোগী করতে ম্যাকনিশ কাঠ, ক্যানভাস ও সিলের রক্ত ব্যবহার করে কাঠামো মজবুত করেছিলেন। ওপরে অস্থায়ী ডেক বসানো হয়। কিন্তু বিশাল ঢেউয়ের তুলনায় James Caird ছিল খেলনা নৌকার মতো।
দক্ষিণ মহাসাগরের ঝড়, তুষার ও হিমশীতল পানি তাদের ওপর আছড়ে পড়ছিল। নৌকার ভেতর পানি জমত; মানুষগুলোকে অবিরাম তা বাইরে ফেলতে হতো। ভেজা পোশাক শরীরেই বরফ হয়ে যেত। ঘুম প্রায় অসম্ভব ছিল।
তাদের হাতে আধুনিক জিপিএস বা রেডিও ছিল না। সূর্য দেখা গেলে অল্প সময়ের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ওয়ার্সলিকে সেক্সট্যান্ট ব্যবহার করে অবস্থান নির্ণয় করতে হতো। কয়েক ডিগ্রি ভুল মানেই দক্ষিণ জর্জিয়াকে পাশ কাটিয়ে উন্মুক্ত আটলান্টিকে হারিয়ে যাওয়া।
প্রায় ১৫ দিনের যাত্রার পর ১০ মে তারা দক্ষিণ জর্জিয়া দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে পৌঁছান। এই ১,৩০০ কিলোমিটারের যাত্রা সমুদ্র অভিযানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর নেভিগেশন সাফল্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। UK Antarctic Heritage Trust
কিন্তু তারা দ্বীপের ভুল পাশে পৌঁছেছিলেন।
মানচিত্রহীন পাহাড় পেরিয়ে
তিমি শিকারকেন্দ্রগুলো ছিল দক্ষিণ জর্জিয়ার পূর্ব উপকূলে। মাঝখানে ছিল বরফঢাকা, দুর্গম ও তখনো অতিক্রম না করা পর্বতমালা।
দুর্বল কয়েকজনকে নৌকার কাছে রেখে শ্যাকলটন, ওয়ার্সলি ও টম ক্রিন ১৯ মে রাতের অন্ধকারে পাহাড় পেরোনোর যাত্রা শুরু করেন। তাদের কাছে মানচিত্র ছিল না, উপযুক্ত পর্বতারোহণ সরঞ্জামও ছিল না। বুটে স্ক্রু বসিয়ে বরফে গ্রিপ তৈরি করা হয়েছিল।
প্রায় ৩৬ ঘণ্টা বিরতিহীন চলার পর তারা স্ট্রমনেস তিমি শিকারকেন্দ্রে পৌঁছান। তাদের চুল ও দাড়ি জট পাকানো, মুখ কালো, পোশাক ছিন্নভিন্ন ছিল। প্রথম দেখায় কেউ তাদের চিনতে পারেনি।
অবশেষে সভ্য পৃথিবী জানতে পারল—Endurance-এর মানুষগুলো এখনো বেঁচে আছে।
শ্যাকলটন নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু তাঁর কাজ শেষ হয়নি। এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডে ২২ জন তখনো অপেক্ষা করছিলেন।
বারবার ব্যর্থ উদ্ধার প্রচেষ্টা
দক্ষিণ জর্জিয়ায় পৌঁছানোর মাত্র তিন দিন পরই শ্যাকলটন প্রথম উদ্ধারযাত্রার চেষ্টা করেন। কিন্তু সমুদ্রের বরফ জাহাজকে এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডে পৌঁছাতে দেয়নি।
দ্বিতীয়বার উরুগুয়ের একটি জাহাজ নিয়ে চেষ্টা করা হয়। সেটিও ব্যর্থ হয়। তৃতীয় প্রচেষ্টায় চিলির জাহাজ Emma এগোলেও বরফ ও যান্ত্রিক সমস্যায় ফিরে আসতে হয়।
এদিকে দ্বীপে অপেক্ষমাণ মানুষগুলো জানতেন না, শ্যাকলটন দক্ষিণ জর্জিয়ায় পৌঁছেছেন কি না। তাদের ধারণা ছিল, উদ্ধার আসতে পরবর্তী গ্রীষ্ম পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফ্র্যাঙ্ক ওয়াইল্ড প্রতিদিন লোকজনকে ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে বলতেন—যেন যেকোনো মুহূর্তে জাহাজ আসতে পারে। বাস্তব সম্ভাবনার চেয়ে এই প্রস্তুতি ছিল মানুষের মনোবল বাঁচিয়ে রাখার কৌশল।
চতুর্থ প্রচেষ্টায় চিলির সরকার Yelcho নামের ছোট বাষ্পীয় টাগবোট দেয়। এর ক্যাপ্টেন ছিলেন লুইস পার্দো। জাহাজটি বরফ ভাঙার জন্য তৈরি ছিল না; রেডিওও ছিল না। তবু পার্দো ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
১৯১৬ সালের ৩০ আগস্ট কুয়াশা সরে গেলে Yelcho এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডের কাছে পৌঁছে যায়। শ্যাকলটন দেখলেন, তীরে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
সবাই জীবিত।
চার মাসের বেশি সময় দ্বীপে অপেক্ষা করা ২২ জনকে এক ঘণ্টার মধ্যে জাহাজে তুলে নেওয়া হয়। South Georgia Heritage Trust
সত্যিই কি সবাই ফিরেছিলেন?
Endurance-এ থাকা শ্যাকলটনের ওয়েডেল সাগর দলের ২৮ জনই জীবিত ফিরেছিলেন—এটাই উদ্ধার অভিযানের বিস্ময়।
তবে সম্পূর্ণ ইম্পেরিয়াল ট্রান্স-অ্যান্টার্কটিক অভিযানে আরেকটি দল ছিল। Aurora জাহাজে থাকা রস সাগর দল শ্যাকলটনের সম্ভাব্য পথের জন্য খাদ্যভান্ডার স্থাপন করতে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ভোগের মুখে পড়ে এবং তাদের তিন সদস্য মারা যান।
সুতরাং “সবাই বেঁচে ফিরেছিলেন” কথাটি শ্যাকলটনের সঙ্গে Endurance-এ থাকা ২৮ জনের ক্ষেত্রে সত্য; দুই জাহাজের সম্পূর্ণ অভিযানের ক্ষেত্রে নয়। ইতিহাসের জনপ্রিয় বর্ণনায় এই পার্থক্যটি প্রায়ই হারিয়ে যায়।
নায়ক, না ব্যর্থ পরিকল্পনাকারী?
শ্যাকলটনের গল্প সাধারণত আদর্শ নেতৃত্বের উদাহরণ হিসেবে বলা হয়। তিনি দলের দুর্বল সদস্যদের নিজের কাছে রাখতেন, রেশন ভাগাভাগিতে সমতা বজায় রাখতেন এবং হতাশা ছড়াতে পারে—এমন ব্যক্তিদেরও দূরে ঠেলে না দিয়ে দায়িত্ব দিয়ে ব্যস্ত রাখতেন।
কিন্তু তাঁর নেতৃত্বের প্রশংসা অভিযানের পরিকল্পনাগত ব্যর্থতাকে মুছে দিতে পারে না। আবহাওয়ার সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও ওয়েডেল সাগরে প্রবেশ, জাহাজের সক্ষমতা এবং অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া নিয়ে ইতিহাসবিদ ও প্রকৌশলীদের প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন দাবিও করা হয়েছে যে Endurance-এর কাঠামো প্রবল প্যাক আইসের চাপ সহ্য করার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না এবং শ্যাকলটন ঝুঁকিটি কিছুটা জানতেন।
অতএব শ্যাকলটনের প্রকৃত কৃতিত্ব নিখুঁত পরিকল্পনা নয়। তাঁর কৃতিত্ব হলো—পরিকল্পনা ধসে পড়ার পর দ্রুত লক্ষ্য বদলানো, নিজের মর্যাদার চেয়ে মানুষের জীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং একের পর এক ব্যর্থতার পরও ফিরে আসার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
তিনি অ্যান্টার্কটিকা অতিক্রম করতে পারেননি। কিন্তু ব্যর্থ অভিযানকে এমন এক উদ্ধারকাহিনিতে রূপ দিয়েছিলেন, যা মূল লক্ষ্য অর্জনের চেয়েও বেশি স্মরণীয় হয়ে উঠেছে।
বরফের নিচে ফিরে পাওয়া Endurance
এক শতাব্দীর বেশি সময় Endurance-এর সঠিক অবস্থান অজানা ছিল। ২০২২ সালের ৫ মার্চ Endurance22 অভিযানের গবেষকেরা ওয়েডেল সাগরের ৩,০০৮ মিটার গভীরে জাহাজটি খুঁজে পান।
অ্যান্টার্কটিকার ঠান্ডা পানি এবং কাঠখেকো সামুদ্রিক প্রাণীর অনুপস্থিতির কারণে জাহাজটি বিস্ময়করভাবে সংরক্ষিত ছিল। পেছনের অংশে সোনালি অক্ষরে লেখা Endurance নামটিও স্পষ্ট দেখা গেছে। ধ্বংসাবশেষটি ১৯৫৯ সালের অ্যান্টার্কটিক চুক্তিব্যবস্থার অধীনে সুরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে বিবেচিত। Historic England
জাহাজটি যেন সময়ের নিচে থেমে থাকা একটি স্মারক—মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ভুল সিদ্ধান্ত এবং সেই ভুলের ভেতর থেকেও বেঁচে ফেরার ক্ষমতার।
শেষ কথা
শ্যাকলটনের অভিযান সফল ছিল না। মহাদেশ অতিক্রমের স্বপ্ন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়েছিল। তাঁর জাহাজ ডুবে গিয়েছিল, মানুষগুলো প্রায় দুই বছর পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং বাঁচার সম্ভাবনা বহুবার শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছিল।
তবু ৩০ আগস্ট ১৯১৬ এলিফ্যান্ট আইল্যান্ড থেকে শেষ মানুষটিকেও তুলে নেওয়া হয়েছিল।
এই গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত সাহস নয়। অন্ধ সাহসই তাদের বিপদের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। প্রকৃত শিক্ষা হলো—ব্যর্থতা স্বীকার করে লক্ষ্য বদলানোর ক্ষমতা, সংকটে মানুষের মনোবল রক্ষা করা এবং কাউকে পেছনে না ফেলার প্রতিশ্রুতি।
Endurance ডুবে গিয়েছিল। অভিযানও ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু শ্যাকলটন যে দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন—সবাইকে বাড়ি ফেরানোর—সেটি তিনি শেষ পর্যন্ত পূরণ করেছিলেন।
আপনার মতামত জানানঃ