বিশ্বের মানচিত্রে এমন কিছু স্থান আছে, যেগুলোর গুরুত্ব কেবল ভৌগোলিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। হরমুজ প্রণালি তেমনই একটি কৌশলগত জলপথ। প্রতিদিন বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই সংকীর্ণ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত নতুন মাত্রা পাওয়ায় হরমুজ প্রণালি আবারও বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ট্যাংকারে হামলা, পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান, নতুন অবরোধ এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল এখন এক অস্থির বাস্তবতার মুখোমুখি।
সাম্প্রতিক ঘটনায় সংযুক্ত আরব আমিরাত অভিযোগ করেছে, হরমুজ প্রণালিতে দুটি ট্যাংকারে ইরানের হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ভারতীয় ও ইউক্রেনীয় নাগরিকও রয়েছেন। ইউএই এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, সংশ্লিষ্ট ট্যাংকার দুটি সতর্কবার্তা অমান্য করে নিষিদ্ধ রুট দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করেছিল। তাই তাদের লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছে। এই দুই বিপরীত বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এই ঘটনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী সব পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২০ শতাংশ চার্জ আরোপ করবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করবে। এই ঘোষণা শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলের জন্য এককভাবে কোনো রাষ্ট্রের টোল আরোপের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নৌপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব হলেও একতরফাভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে ট্রাম্পের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক অঙ্গনেও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বোঝার জন্য এর ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রপ্তানিকৃত জ্বালানির বড় অংশ এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তাই হরমুজ প্রণালির বিকল্প খুবই সীমিত। এই জলপথে কোনো ধরনের সামরিক সংঘাত বা অবরোধ দেখা দিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি শুরু হতে পারে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালিকে তার কৌশলগত শক্তির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা সামরিক চাপ বাড়লে তেহরান বারবার এই প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। যদিও পুরোপুরি বন্ধ করার মতো পরিস্থিতি খুব কমই সৃষ্টি হয়েছে, তবুও এমন হুমকি বিশ্ববাজারে উদ্বেগ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। কারণ এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প রুটে এত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখার জন্য এই উপস্থিতি জরুরি। ইরান অবশ্য এটিকে নিজের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা যখনই বেড়েছে, তখনই হরমুজ প্রণালি সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্যাংকারে হামলার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং বীমা খাতে। যুদ্ধঝুঁকি বেড়ে গেলে জাহাজ মালিকদের অতিরিক্ত বীমা খরচ বহন করতে হয়। সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে শুধু তেল নয়, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন আমদানিকৃত পণ্যের দামও বৃদ্ধি পেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের অর্থনীতিতেই।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে দেশে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাবে। এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খরচ, শিল্প উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়তে পারে। মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যাবে। তাই হাজার কিলোমিটার দূরের একটি জলপথের সংঘাতও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো একদিকে ইরানের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নৌপথে একতরফাভাবে চার্জ আরোপের ঘোষণাকেও সমর্থন দিচ্ছে না। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) ইতোমধ্যে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নৌপথে বাধ্যতামূলক টোল আরোপের সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি নেই। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবিক ক্ষয়ক্ষতি। সামরিক উত্তেজনার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন সাধারণ নাবিক, জাহাজকর্মী এবং বেসামরিক মানুষ। সম্প্রতি নিহত ভারতীয় নাবিকের ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মূল্য অনেক সময় নিরীহ মানুষকেই দিতে হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার নাবিক প্রতিদিন এমন ঝুঁকি নিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য পরিবহন করেন।
বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আন্তঃনির্ভরশীল। একটি অঞ্চলের সংঘাত দ্রুত অন্য অঞ্চলের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। করোনা মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা ইতোমধ্যে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর হতে পারে। সেই বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক দক্ষতারও পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে কঠোর বক্তব্য দিচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কোনো পক্ষের জন্যই অব্যাহত সংঘাত লাভজনক নয়। কারণ এতে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই জাতিসংঘ, আঞ্চলিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির ওপর নির্ভর করছে না; এটি নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক আস্থা এবং আইনের শাসনের ওপরও। যদি উত্তেজনা আরও বাড়ে, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন সংকট সৃষ্টি হতে পারে। আবার কার্যকর সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্তও হতে পারে। ইতিহাস বলছে, এই অঞ্চলে বহুবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, আবার কূটনৈতিক উদ্যোগে তা প্রশমিতও হয়েছে।
আজকের বিশ্বে কোনো সংঘাত আর কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতির যুগে একটি সংকীর্ণ জলপথের নিরাপত্তা কোটি কোটি মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। হরমুজ প্রণালি তাই শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির স্পন্দন, আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরীক্ষাক্ষেত্র এবং বৈশ্বিক শান্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। বর্তমান সংকট বিশ্বকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে যুদ্ধের চেয়ে সংলাপ, প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতা এবং সংঘাতের চেয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানই মানবজাতির জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।
আপনার মতামত জানানঃ