ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলমসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগে সম্পদ জব্দের ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাইপ্রাসের একটি আদালত সম্প্রতি সেখানকার রাজধানী নিকোশিয়ায় অবস্থিত একটি বিলাসবহুল বাড়ি জব্দের নির্দেশ দিয়েছে, যার মালিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমকে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংক ঋণের নামে বিপুল অর্থ তুলে তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বাংলাদেশের অনুরোধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এই ঘটনা শুধু একটি সম্পত্তি জব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বিস্তৃত তদন্ত ও আন্তর্জাতিক আর্থিক অপরাধ অনুসন্ধানের অংশ। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য বিভিন্ন দেশে আইনি প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এখন পর্যন্ত দেড় ডজনের বেশি দেশ ও অঞ্চলে অর্থপাচারের সম্ভাব্য সম্পদের সন্ধান পেয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনসহ আরও অনেক দেশ রয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে গেছে। একটি অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়েছে, এই সময়ে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে। এই অর্থের বড় অংশ ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থার অপব্যবহার করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, ব্যবসার নামে ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দিয়ে সেই অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ বা সম্পদ কেনার মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে।
এই অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ সরকার একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন লেনদেন, ব্যাংক হিসাব এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রবাহ বিশ্লেষণ করছে। তদন্তে উঠে এসেছে, পাচার হওয়া অর্থ বিভিন্ন দেশে রিয়েল এস্টেট, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে।
সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কিছু সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। যুক্তরাজ্য, আইল অব ম্যান এবং সাইপ্রাসে কিছু সম্পত্তি ইতোমধ্যে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফ্রিজ করা হয়েছে। তবে এসব সম্পদ পুরোপুরি বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা এখনই সম্ভব নয়। কারণ সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে এই সম্পদ অবৈধভাবে অর্জিত এবং বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থের মাধ্যমেই কেনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদী। অন্য দেশের আইন অনুযায়ী প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয় এবং সেই দেশের বিচারব্যবস্থা যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেয়। শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অনুরোধের ভিত্তিতে কোনো দেশ তৎক্ষণাৎ সম্পদ জব্দ বা ফেরত দেয় না। ফলে আইনি লড়াই এখানে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অর্থপাচারের মামলায় সফলতার হার খুবই কম। বিশ্বের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, পাচার হওয়া অর্থের মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ—প্রায় এক শতাংশের মতো—আবার ফেরত আসে। আর সেই প্রক্রিয়াটিও বহু বছর সময় নিয়ে সম্পন্ন হয়। কখনও কখনও একটি মামলা শেষ হতে ৭ থেকে ২০ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়।
এর প্রধান কারণ হলো প্রমাণের জটিলতা। কোনো দেশের আদালতে প্রমাণ করতে হয় যে অর্থটি অবৈধভাবে বের হয়েছে এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেটি পাচার করা হয়েছে। কিন্তু যখন অর্থ বিভিন্ন দেশে ঘুরে বিনিয়োগ হিসেবে রূপান্তরিত হয়, তখন তার উৎস ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ তৃতীয় দেশের মাধ্যমে আরও জটিল আর্থিক কাঠামো ব্যবহার করে স্থানান্তর করা হয়।
এছাড়া আরেকটি বড় সমস্যা হলো আইনি ব্যয় এবং দক্ষ আইনজীবীর প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মামলা পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদী। বাংলাদেশ এখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছে, যেগুলো সফল হলে পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশ থেকে ফি গ্রহণ করবে। এটিকে “নো উইন, নো ফি” মডেল বলা হয়, যেখানে মামলা জিততে না পারলে কোনো অর্থ দিতে হয় না।
অন্যদিকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ অনেক দেশ অর্থপাচারকে তাদের আইনের চোখে সরাসরি অপরাধ হিসেবে না দেখে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে সম্পদ জব্দ বা ফেরত আনার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। তাই শুধু আইনি লড়াই নয়, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ সরকার বলছে, তারা পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আইনি সহায়তা চুক্তির চেষ্টা চলছে। কিছু দেশ ইতিবাচক সাড়া দিলেও অনেক দেশ এখনো একক চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। ফলে বহুপাক্ষিক সমন্বয় এবং দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়েই এগোতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রক্রিয়ার ফলাফল অনিশ্চিত হলেও এটি শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একবার যদি কয়েকটি বড় মামলায় সফলতা আসে, তাহলে ভবিষ্যতে অর্থপাচারকারীদের জন্য এটি একটি কঠোর বার্তা হয়ে দাঁড়াবে। তারা আর সহজে দেশের অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার সাহস পাবে না।
অন্যদিকে ব্যবসায়িক মহল থেকে কিছুটা ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি লড়াই চালানোর কথা বলেছেন। তারা দাবি করেছেন, তাদের সম্পদ বৈধভাবে অর্জিত এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি এখন সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে। কোন দেশ কত দ্রুত সহযোগিতা করে, কোন আদালত কী রায় দেয়, এবং প্রমাণ কতটা শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করা যায়—এসবের ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কতটা অর্থ পুনরুদ্ধার করতে পারবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার এই লড়াই শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী আইনি, কূটনৈতিক এবং প্রশাসনিক সংগ্রাম। সাইপ্রাসে একটি সম্পত্তি জব্দের ঘটনা সেই বৃহৎ প্রচেষ্টার একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সামনে পথ দীর্ঘ এবং কঠিন হলেও এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক শুদ্ধতা ও জবাবদিহিতার একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ