ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার আগাম পূর্বাভাস দেওয়া এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটি শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে, হাজারো মানুষের জীবন মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে। তাই ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে কয়েক সেকেন্ডও অমূল্য। সেই কয়েক সেকেন্ডই যদি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, তবে অসংখ্য প্রাণ রক্ষা সম্ভব। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের সময় এমনই এক প্রযুক্তিগত বিস্ময়ের সাক্ষী হয়েছে বিশ্ব। মাটিতে কম্পন অনুভব করার কয়েক সেকেন্ড আগেই লাখো মানুষের অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে ভেসে আসে গুগলের সতর্কবার্তা। অনেকেই প্রথমে এটিকে অলৌকিক ঘটনা মনে করলেও এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম এবং কোটি কোটি স্মার্টফোনের সম্মিলিত একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক।
আজকের পৃথিবীতে স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়; এটি এখন ব্যক্তিগত সহকারী, নেভিগেশন ডিভাইস, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষক, ক্যামেরা এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে জীবন রক্ষাকারী একটি প্রযুক্তিতেও পরিণত হয়েছে। গুগল এই সম্ভাবনাকেই কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প শনাক্তকরণ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনগুলোকে এক ধরনের ক্ষুদ্র সিসমোগ্রাফ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে আলাদা করে হাজার হাজার ব্যয়বহুল ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ যন্ত্র স্থাপন না করেও কোটি কোটি মানুষের হাতের ফোনই হয়ে উঠেছে তথ্য সংগ্রহের শক্তিশালী মাধ্যম।
প্রতিটি আধুনিক স্মার্টফোনে একটি বিশেষ সেন্সর থাকে, যার নাম অ্যাক্সেলেরোমিটার। সাধারণভাবে এটি ফোনের অবস্থান বুঝে স্ক্রিন ঘুরিয়ে দেয় বা বিভিন্ন মোশনভিত্তিক ফিচার পরিচালনা করে। কিন্তু এই সেন্সরের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম কম্পন শনাক্ত করা। যখন কোনো এলাকায় ভূমিকম্পের প্রাথমিক কম্পন শুরু হয়, তখন ওই এলাকার অসংখ্য অ্যান্ড্রয়েড ফোন একই ধরনের অস্বাভাবিক কম্পন শনাক্ত করে। প্রতিটি ফোন তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুগলের সার্ভারে একটি সংকেত পাঠায়। সার্ভার মুহূর্তের মধ্যেই বিভিন্ন ফোন থেকে আসা তথ্য বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয় যে এটি সাধারণ কোনো কম্পন নয়, বরং একটি বাস্তব ভূমিকম্পের সূচনা।
এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। ভূমিকম্পের সময় প্রথমে তৈরি হয় প্রাইমারি বা পি-ওয়েভ। এটি তুলনামূলক দ্রুত গতিতে ছড়ালেও সাধারণত খুব বেশি ক্ষতি করে না। এর কয়েক সেকেন্ড পর আসে সেকেন্ডারি বা এস-ওয়েভ, যা ভবন ধস, সড়ক ফাটল এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী। স্মার্টফোনগুলো যখন পি-ওয়েভ শনাক্ত করে, তখন সেই তথ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে আলোর গতির কাছাকাছি বেগে গুগলের সার্ভারে পৌঁছে যায়। ফলে এস-ওয়েভ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই গুগল সতর্কবার্তা পাঠাতে সক্ষম হয়। এই কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানই একজন মানুষকে দরজার নিচ থেকে সরে যেতে, গ্যাসের চুলা বন্ধ করতে, লিফট ব্যবহার না করতে কিংবা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে সাহায্য করতে পারে।
ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ স্ক্রিনশট প্রকাশ করেছেন, যেখানে দেখা যায় ভূমিকম্প অনুভব করার আগেই তাদের ফোনে সতর্কবার্তা এসেছে। কেউ কেউ জানিয়েছেন, তারা বার্তাটি দেখেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দ্রুত বাইরে চলে যান। অনেকেই নিরাপদ অবস্থানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। যদিও কয়েক সেকেন্ড খুব দীর্ঘ সময় নয়, কিন্তু জরুরি পরিস্থিতিতে এই অল্প সময়ই জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
গুগলের এই ব্যবস্থা কেবল শক্তিশালী ভূমিকম্প শনাক্ত করেই থেমে থাকে না। ভূমিকম্পের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে ব্যবহারকারীদের জন্য ভিন্ন ধরনের সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। মৃদু কম্পনের ক্ষেত্রে মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়, আর মাঝারি বা তীব্র ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। নোটিফিকেশনে ট্যাপ করলে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির এলাকা এবং নিরাপত্তা নির্দেশিকাও দেখা যায়। ফলে আতঙ্কিত না হয়ে মানুষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।
বিশ্বজুড়ে প্রায় দুইশ কোটির বেশি অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস এই ব্যবস্থার অংশ। অর্থাৎ পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় জনভিত্তিক ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক। আগে যেখানে কেবল উন্নত দেশগুলো ব্যয়বহুল সিসমিক স্টেশন স্থাপন করতে পারত, এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কম সম্পদসম্পন্ন দেশগুলোও এই প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ অবকাঠামো দুর্বল, সেখানে এই প্রযুক্তি মানুষের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে এই ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এটি ভূমিকম্প ঘটার অনেক আগে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না। ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর প্রাথমিক কম্পন শনাক্ত করে দ্রুত সতর্কবার্তা পাঠানোই এর কাজ। অর্থাৎ এটি পূর্বাভাস নয়, বরং অত্যন্ত দ্রুতগতির একটি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। এছাড়া ব্যবহারকারীর ফোনে ইন্টারনেট সংযোগ চালু থাকতে হবে এবং ফোনটি অ্যান্ড্রয়েডের সমর্থিত সংস্করণে চলতে হবে। কোনো এলাকায় যদি খুব কম সংখ্যক অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারী থাকে, তাহলে তথ্য বিশ্লেষণেও কিছুটা সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিগ ডেটা প্রযুক্তির বিকাশ এই ধরনের ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তুলছে। প্রতিদিন কোটি কোটি ডিভাইস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা এখন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহারের মাধ্যমে সতর্কবার্তার নির্ভুলতা বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভূমিকম্প ছাড়াও বন্যা, ভূমিধস, সুনামি কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় স্মার্টফোনভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্যও এই প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বড় ধরনের ভূমিকম্প বাংলাদেশে প্রতিদিন ঘটে না, তবুও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে দেশের বিভিন্ন সক্রিয় ফল্ট লাইনে শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে। রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ শহরে কয়েক সেকেন্ডের আগাম সতর্কবার্তাও হাজারো মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়ক হতে পারে। তাই ব্যবহারকারীদের উচিত ফোনের জরুরি সতর্কবার্তা সুবিধা চালু রাখা এবং দুর্যোগের সময় কীভাবে নিরাপদ থাকতে হয় সে বিষয়ে সচেতন থাকা।
প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের সচেতনতার বিকল্প নেই। অনেকেই ফোনে আসা সতর্কবার্তা গুরুত্ব দেন না অথবা অপ্রয়োজনীয় মনে করে বন্ধ করে রাখেন। কিন্তু জরুরি মুহূর্তে এই একটি নোটিফিকেশনই পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে। তাই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলার মৌলিক নিয়মগুলোও সবার জানা জরুরি।
ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তি কেবল মানুষের জীবনকে সহজ করছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে জীবনও বাঁচাচ্ছে। কোটি কোটি স্মার্টফোন একসঙ্গে কাজ করে যখন একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, তখন সেটি মানবসভ্যতার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে ওঠে। কয়েক সেকেন্ডের একটি সতর্কবার্তা হয়তো একটি ভবন ধস ঠেকাতে পারে না, কিন্তু সেই ভবনের ভেতরে থাকা মানুষটিকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে পারে। আর সেই কারণেই গুগলের অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেম শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের অন্যতম কার্যকর জীবনরক্ষাকারী উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আপনার মতামত জানানঃ