বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার একটি অদ্ভুত, কিছুটা বেদনাদায়ক এবং একইসঙ্গে শিক্ষণীয় অধ্যায় যেন নিঃশব্দে পড়ে আছে কক্সবাজারের উপকূলের কাছে, মহেশখালী দ্বীপে। বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল অবকাঠামো—যেখানে একসময় স্বপ্ন ছিল জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থ সাশ্রয় এবং আধুনিকতার প্রতীক হওয়ার—আজ সেটি যেন এক নীরব সাক্ষী ব্যর্থতা, দেরি, অদক্ষতা এবং নীতিগত অসামঞ্জস্যের। হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উন্নত প্রযুক্তি—সবকিছু প্রস্তুত থাকার পরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প শুধু “অপারেটর নেই” এই অজুহাতে বছরের পর বছর পড়ে থাকা শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।
এই প্রকল্প, সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং বা এসপিএম, যার মাধ্যমে গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপলাইনে তেল খালাস করে তা পরিশোধনাগারে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল, তা শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়—এটি ছিল একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। বিশ্বের বহু উন্নত দেশ বহু বছর আগে থেকেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সময়, অর্থ এবং পরিবেশের ক্ষতি কমিয়েছে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া আর তা বাস্তবায়নের মধ্যে যে বিশাল ফাঁক, সেটিই এখানে নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে যুক্ত ছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন এবং এর অধীনস্থ ইস্টার্ন রিফাইনারি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে, বিশেষ করে চীন-এর ঋণ সহায়তায় এই অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ, এটি কেবল একটি অভ্যন্তরীণ প্রকল্প নয়, বরং আন্তর্জাতিক আস্থার সঙ্গেও জড়িত। অথচ সেই প্রকল্পই এখন প্রায় দুই বছর ধরে অলস পড়ে আছে—যেখানে প্রতিদিন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতি বাড়ছে, সুযোগ হারাচ্ছে দেশ।
একটি দেশের জ্বালানি খাত তার অর্থনীতির মেরুদণ্ড। শিল্প, পরিবহন, কৃষি—সবকিছুই এর ওপর নির্ভরশীল। সেই খাতে এমন একটি আধুনিক ব্যবস্থা তৈরি করার পর সেটি ব্যবহার না করা মানে শুধু অর্থের অপচয় নয়, বরং একটি কৌশলগত ব্যর্থতা। যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্থির, যখন সরবরাহে অনিশ্চয়তা, তখন এই ধরনের অবকাঠামো চালু থাকলে বাংলাদেশ অনেকটাই সুরক্ষিত থাকতে পারত। বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সেটি ব্যবহার না করা—এটি কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত বা গ্রহণযোগ্য নয়।
এই ব্যর্থতার পেছনে যে কারণগুলো তুলে ধরা হচ্ছে—যেমন অপারেটর নিয়োগে জটিলতা, বিশেষ আইন বাতিল, দরপত্র প্রক্রিয়ার বিলম্ব—এসব শুনতে হয়তো প্রশাসনিক বাস্তবতা মনে হতে পারে, কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এগুলো আসলে পরিকল্পনার ঘাটতি এবং দূরদর্শিতার অভাবের ফল। একটি প্রকল্প যখন নেওয়া হয়, তখন কি তার অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়নি? যদি রাখা হয়ে থাকে, তাহলে কেন নির্মাণ শেষে এসে সেটি একটি “অমীমাংসিত” সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো?
এখানেই আসে জবাবদিহিতার প্রশ্ন। একটি প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার সিদ্ধান্ত যারা নিয়েছেন, যারা এটি বাস্তবায়ন করেছেন, যারা এর তদারকি করেছেন—তাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে এই অবস্থার জন্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় দায় নির্ধারণ করা হয় না, বা হলেও তা কার্যকর হয় না। ফলে একই ধরনের ভুল বারবার ঘটে, এবং তার মূল্য দেয় সাধারণ জনগণ।
এই প্রকল্পটি বিশেষ আইনের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, যাতে সময় বাঁচানো যায়। কিন্তু সেই একই আইনের কারণে পরবর্তীতে অপারেটর নিয়োগে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এটি একটি ক্লাসিক উদাহরণ—যেখানে শর্টকাট নেওয়ার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত আরও বড় সমস্যার সৃষ্টি করেছে। উন্নয়ন মানে শুধু দ্রুত কাজ শেষ করা নয়, বরং টেকসই এবং কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এখানে সেই দৃষ্টিভঙ্গির অভাব স্পষ্ট।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দক্ষ জনবলের অভাব। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে এই ধরনের প্রকল্প পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞ অপারেটর নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যখন এই প্রকল্প নেওয়া হচ্ছিল, তখন কি এই বাস্তবতা জানা ছিল না? যদি জানা থাকে, তাহলে কেন আগেভাগে জনবল প্রশিক্ষণ বা আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা হয়নি? একটি আধুনিক অবকাঠামো তৈরি করে সেটি চালানোর মতো দক্ষতা না থাকা—এটি উন্নয়নের একটি অসম্পূর্ণ চিত্র।
এখানে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সমন্বয়হীনতাও স্পষ্ট। এক সরকার একটি নীতি নেয়, পরবর্তী সরকার এসে সেটি বাতিল করে—ফলে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দিক পরিবর্তন করে, তাহলে তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। কিন্তু বাস্তবে আমরা তার বিপরীত চিত্রই দেখছি।
এই প্রকল্পটি চালু না থাকার ফলে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা শুধু আর্থিক নয়। বর্তমান পদ্ধতিতে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তর করে তা রিফাইনারিতে নেওয়া হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। এতে তেলের অপচয়ও হয়, পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিও বাড়ে। অন্যদিকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি পরিবহন করলে এই সমস্যাগুলো অনেকটাই কমে যেত। অর্থাৎ, একটি আধুনিক, পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আমরা এখনও পুরনো, অদক্ষ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে শুধু দুঃখজনক নয়, বরং উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। তাদের মতে, এটি একটি বড় ধরনের সুযোগ হারানো। এমন একটি সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা একটি বড় ইস্যু, তখন বাংলাদেশ নিজের তৈরি সক্ষমতাকেই কাজে লাগাতে পারছে না। এটি কেবল পরিকল্পনার ব্যর্থতা নয়, বরং বাস্তবায়নের অদক্ষতারও প্রমাণ।
এই ঘটনার একটি বৃহত্তর প্রভাবও রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের পথে এগোতে চায়, তখন এই ধরনের উদাহরণ তার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বা উন্নয়ন সহযোগীরা যখন দেখে যে একটি দেশ বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে, কিন্তু তা চালু রাখতে পারে না, তখন তাদের আস্থা কমে যায়। এটি ভবিষ্যতের বিনিয়োগ এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই পুরো পরিস্থিতিতে এখনো কোনো স্পষ্ট সময়সীমা নেই। কবে এই প্রকল্প চালু হবে, কবে এর সুফল পাওয়া যাবে—তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। অর্থাৎ, সমস্যার স্বীকৃতি থাকলেও সমাধানের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এটি একটি প্রশাসনিক স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়।
এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। উন্নয়ন প্রকল্প শুধু অর্থ ব্যয়ের বিষয় নয়, বরং তা একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া—যেখানে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, পরিচালনা এবং মূল্যায়ন—সবকিছু সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি জায়গায় ব্যর্থতা পুরো প্রকল্পকে অকার্যকর করে দিতে পারে। এবং সেই ব্যর্থতার দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য, যেখানে সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেখানে প্রতিটি বড় বিনিয়োগ অত্যন্ত মূল্যবান। সেই বিনিয়োগ যদি ব্যবহার না হয়, তাহলে তা শুধু অর্থের অপচয় নয়, বরং একটি জাতীয় ক্ষতি। এই প্রকল্পটি তাই শুধু একটি অবকাঠামো নয়—এটি একটি সতর্কবার্তা, একটি শিক্ষা, এবং একইসঙ্গে একটি প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই উন্নয়নের জন্য প্রস্তুত, নাকি শুধু তার বাহ্যিক রূপ তৈরি করছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া জরুরি, কারণ এর ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতের পথচলা।
আপনার মতামত জানানঃ