
বর্তমান বিশ্ব এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন জ্বালানি আর
শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়—এটি পরিণত হয়েছে শক্তি, কূটনীতি এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট একসময় বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু আজকের পরিস্থিতি আরও জটিল। এখন শুধু তেল নয়, গ্যাসও সমানভাবে সংকটের কেন্দ্রে। ফলে বিশ্বজুড়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর।
১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে এবং পশ্চিমা বিশ্ব প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করে যে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সেই সময় থেকেই বিকল্প জ্বালানির সন্ধান শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং অন্যান্য উন্নত দেশ ধীরে ধীরে নিজেদের জ্বালানি কৌশল পুনর্গঠন করতে থাকে। তেলের পাশাপাশি গ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে উঠে আসে। বাংলাদেশেও একই সময়ে তেল অনুসন্ধান করতে গিয়ে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে দেশের জ্বালানি চাহিদার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। ইউরোপ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, আর যুক্তরাষ্ট্র গ্যাসকে তরল করে এলএনজি আকারে রপ্তানি করার কৌশল গ্রহণ করে। এলএনজি প্রযুক্তি ব্যয়বহুল হলেও এটি একটি কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। কারণ, এটি সরাসরি পাইপলাইনের ওপর নির্ভরশীল নয় এবং বিশ্ববাজারে নতুন ধরনের নির্ভরতার সম্পর্ক তৈরি করে। জাপান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশ এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশও ধীরে ধীরে এই বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ হয়ে ওঠে। ২০১০ সালের পর থেকে দেশের জ্বালানি নীতিতে এলএনজি এবং কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। একদিকে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি, অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ—এই দুইয়ের ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এর ফলে দেশের জ্বালানি খাত আরও বেশি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে, যা বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের সময় বড় একটি দুর্বলতা হিসেবে সামনে এসেছে।
কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা—সব মিলিয়ে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উন্নত দেশগুলো তাদের মজুত এবং বিকল্প উৎসের কারণে কিছুটা নিরাপদ থাকলেও, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় হঠাৎ করেই অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। ফলে এখন দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে যাচ্ছে, আর সেই ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির মাধ্যমে। এলএনজি শুধু দামীই নয়, এটি একটি জটিল অবকাঠামো নির্ভর প্রক্রিয়া, যেখানে তরলীকরণ, পরিবহন এবং পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর—সবকিছুই ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ।
এই নির্ভরতা কেবল অর্থনৈতিক ঝুঁকিই তৈরি করছে না, বরং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। কারণ, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ও চুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ছে দেশ। এমনকি কখনও কখনও জ্বালানি আমদানির জন্য রাজনৈতিক অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ছে, যা একটি দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকেও সীমিত করে দিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বড় উদ্বেগ হলো—সংকটের সুযোগে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। যেমন, দেশে আবার কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাব সামনে আসছে। কিন্তু ফুলবাড়ীর মতো এলাকায় কয়লা উত্তোলন করলে যে পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতি হবে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য আরও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। কৃষিজমি নষ্ট হওয়া, পানিসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংস হওয়া—এসব বিষয় অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরে থেকে যায়, কিন্তু বাস্তবে এগুলোর প্রভাব অনেক বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি টেকসই ও দূরদর্শী জ্বালানি কৌশল গ্রহণ করা। দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। সমুদ্রবক্ষে সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রগুলো অনুসন্ধান করে সেগুলো থেকে উৎপাদন শুরু করা গেলে আমদানিনির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তবে এই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে সময় লাগবে। তাই স্বল্পমেয়াদে বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং পর্যাপ্ত সূর্যালোকের কারণে বড় আকারে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের উদাহরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যা প্রমাণ করে সঠিক নীতি ও প্রণোদনা থাকলে দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব। বিশেষ করে ‘ফিড-ইন ট্যারিফ’ নীতির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব।
বাংলাদেশেও যদি একই ধরনের নীতি গ্রহণ করা যায়, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কৃষিক্ষেত্রে সৌরচালিত সেচব্যবস্থা এবং বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প—এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে জ্বালানি খাতে একটি বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সবচেয়ে বড় কথা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ শুধু অর্থনৈতিক সাশ্রয়ই করে না, বরং এটি একটি দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাও বাড়ায়। কারণ, এতে বিদেশি জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমে যায় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির চাপ থেকেও কিছুটা মুক্ত থাকা যায়।
বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়, এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার। তাই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কীভাবে এই জটিল বাস্তবতার মধ্যে নিজেদের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই পথ খুঁজে বের করা যায়। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, স্বল্পমেয়াদি সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার দিকে নজর দেওয়াই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
যদি এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর জ্বালানি কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে। আর যদি একই পথে চলতে থাকে, তাহলে এই নির্ভরতার চক্র থেকে বের হওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠবে। তাই সময় এসেছে নতুন করে ভাবার, নতুন কৌশল গ্রহণ করার এবং একটি টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার।
আপনার মতামত জানানঃ