
ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরবর্তী ধাপ কী হবে—এই প্রশ্নটি রাজনীতি ও কূটনীতির অঙ্গনে বেশ কিছুদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। সেই অনিশ্চয়তার ভেতরেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই ইঙ্গিত দিলেন, নির্বাচনের পর তিনি কোন পথে হাঁটতে চান এবং কোন বিষয়গুলোতে নিজের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করবেন। এই ইঙ্গিতটি এসেছে একদিকে কূটনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ থেকে, অন্যদিকে সরকারিভাবে জানানো একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার মধ্য দিয়ে।
১১ জানুয়ারি সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে–এর স্ত্রী আকি আবে–এর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে সৌজন্যমূলক। তবে সেই বৈঠকটি ছিল কেবল সৌজন্যের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। বৈঠকের একপর্যায়ে আকি আবে সরাসরি জানতে চান, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ড. ইউনূস কী ধরনের কাজে নিজেকে যুক্ত দেখতে চান। এই প্রশ্নের উত্তরে প্রধান উপদেষ্টার যে বক্তব্য উঠে এসেছে, সেটিই এখন রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রে।
সরকারের উপপ্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার পরে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ড. ইউনূস তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রকে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার মূল স্তম্ভ হিসেবে দেখছেন। এই তিনটি ক্ষেত্র—ডিজিটাল হেলথ কেয়ার, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি এবং ‘তিন শূন্য’ ধারণা—আসলে তার দীর্ঘদিনের চিন্তা ও দর্শনেরই সম্প্রসারণ। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থেকেও তিনি যে নিজেকে কেবল একজন প্রশাসক হিসেবে নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক রূপান্তরের অংশ হিসেবেই দেখতে চান, এই বক্তব্য তারই প্রতিফলন।
ডিজিটাল হেলথ কেয়ারের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। ড. ইউনূসের ভাবনায়, বাংলাদেশের নারীরা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলো এখনো স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে স্বাস্থ্যপরামর্শ, প্রাথমিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ সেবা সহজলভ্য করা গেলে এই বৈষম্য অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেন প্রযুক্তির মাধ্যমে দূরে থেকেও তাঁদের পরিবারের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত খোঁজখবর রাখতে পারেন—এই দৃষ্টিভঙ্গিটিও তার পরিকল্পনার অংশ। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তার ধারণাকে আধুনিকভাবে পুনর্গঠনের একটি প্রচেষ্টা।
তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে নতুন কিছু নয়। ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার ধারণার মাধ্যমে তিনি বহু দশক ধরেই তরুণদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ দেখিয়েছেন। নির্বাচনের পর তিনি এই ক্ষেত্রটিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক মাত্রায় নিয়ে যেতে চান বলে ইঙ্গিত মিলেছে। তার ভাবনায়, বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী যদি শুধু চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তায় রূপান্তরিত হয়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক স্থিতিশীলতাও শক্ত ভিত্তি পাবে।
আর ‘তিন শূন্য’—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ—এই ধারণাটি ড. ইউনূসের বৈশ্বিক পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ। নির্বাচনের পর রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব শেষ হলেও তিনি এই দর্শনকে কেন্দ্র করেই আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ চালিয়ে যেতে চান। এই লক্ষ্যগুলো আদর্শবাদী মনে হলেও, ড. ইউনূসের দৃষ্টিতে এগুলো ভবিষ্যৎ বিশ্বের জন্য বাস্তব ও জরুরি লক্ষ্য।
এই কর্মপরিকল্পনারই অংশ হিসেবে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে তার জাপান সফরের বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। জাপানের বিখ্যাত সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন–এর আমন্ত্রণে তিনি সেখানে যাচ্ছেন। এই ফাউন্ডেশনটি আন্তর্জাতিক পরিসরে গবেষণা, শান্তি ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে সমুদ্রবিষয়ক গবেষণা ও ব্লু-ইকোনমির ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে।
জাপান সফরে ড. ইউনূসের আলোচনার একটি বড় অংশ জুড়ে থাকবে সমুদ্রসম্পদ ও ব্লু-ইকোনমি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় সমুদ্র শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। জাপানের মতো প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর ও সমুদ্রগবেষণায় অভিজ্ঞ দেশের সঙ্গে এই খাতে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ তার দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে ড. ইউনূসের নির্বাচন-পরবর্তী ভূমিকা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—তিনি কি সক্রিয় রাজনৈতিক পরিসরে থাকবেন, নাকি নিজেকে পুরোপুরি সামাজিক ও বৈশ্বিক উদ্যোগে নিয়োজিত করবেন? এখন পর্যন্ত পাওয়া বক্তব্য ও পরিকল্পনা ইঙ্গিত দেয়, তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার চেয়ে প্রভাবের ক্ষেত্রটি বিস্তৃত করতে বেশি আগ্রহী। রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন শেষ হলে তিনি হয়তো আর দৈনন্দিন রাজনীতির অংশ থাকবেন না, কিন্তু তার চিন্তা ও উদ্যোগ নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতেই থাকবে।
আকি আবে–র সঙ্গে সাক্ষাৎটি তাই কেবল একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না। এটি ছিল দুই ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিসরের প্রতিনিধির মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময়। জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্কের মানবিক ও উন্নয়নমূলক দিকগুলোও এই সাক্ষাতের মাধ্যমে নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের পর ড. ইউনূসের করণীয় নিয়ে যে ছবি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, তা হলো—তিনি নিজেকে একটি নির্দিষ্ট পদ বা ক্ষমতার গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখতে চান না। বরং স্বাস্থ্য, তরুণ সমাজ, পরিবেশ ও অর্থনীতির মতো মৌলিক প্রশ্নগুলোকে কেন্দ্র করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করতে চান। এই পথ সহজ নয়, আবার প্রচলিত রাজনৈতিক রীতির সঙ্গেও পুরোপুরি মেলে না। কিন্তু ড. ইউনূসের দীর্ঘ ক্যারিয়ার দেখলে বোঝা যায়, প্রচলিত পথের বাইরে গিয়েই তিনি বরাবর নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।
নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার একটি সাংবিধানিক সরকার পাবে। সেই সরকারের বাইরে দাঁড়িয়ে ড. ইউনূস কোন ভূমিকা রাখবেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন পর্যন্ত তার বক্তব্য ও পরিকল্পনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব শেষ হলেও, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ভাবনা ও সক্রিয়তা থেমে যাবে না।
আপনার মতামত জানানঃ