তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ও জটিলতা চলছে, তা কেবল একজন রাজনীতিকের ফেরার ব্যক্তিজীবন বা পারিবারিক সংকটের প্রশ্ন নয়; এটি সমগ্র রাজনৈতিক ব্যবস্থার, কূটনৈতিক সম্পর্কের এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির গতিবিধির একটি জটিল কাঁটাযুক্ত চিত্রও বটে। তারেকের মায়ের অসুস্থতা যখন ব্যক্তিগত করুণ এক উপলক্ষ হিসেবে সামনে আসে, ঠিক তখনই ঘোষণা ও প্রতিক্রিয়ার আদলে প্রকাশ পায় যে দেশে ফেরা শুধু ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে না—বরং অনেকগুলো অদৃশ্য শর্ত, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক কৌশল এই সিদ্ধান্তকে আবদ্ধ করে রেখেছে। এই বিবেচনাগুলোকে একত্র করলে বোঝা যায় যে তারেকের দেশে প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি এখন একধরনের সমবায়গত সিদ্ধান্ত, যেখানে রাজনৈতিক দল, পররাষ্ট্রনীতির সংবেদনশীলতা, নিরাপত্তা-উপায় ও আন্তর্জাতিক অবস্থান—সবকিছুর মিলেই নির্ধারিত হবে সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত রূপ।
তারেক নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছেন যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ ‘অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়’—এই কথাটাতেই স্পষ্ট যে তাঁর নিজের হাতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। দলের একাধিক নেতা-এক্টিভিস্ট এবং স্বকীয় বিশ্লেষকরা বিভিন্নভাবে মত দিয়েছেন—কেউ বলেছেন সেটা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উপাদান, কেউ বলেছেন বিদেশি প্রভাব কাজ করতে পারে। যদিও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বিষয়টিকে অল্প কথায় সামলান, দলের একজন উপদেষ্টা মন্তব্য করে বলেন যে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই—এসব বিবৃতি একদিকে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী, অন্যদিকে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলে পড়া যায়। বাস্তবে যারা রাজনীতির অন্তর্দিক নিয়ে কাছ থেকে দেখেন, তারা বলেন—বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় সিদ্ধান্তগুলো প্রায়শই একক ব্যক্তি সিদ্ধান্ত না হয়ে এক ধরনের সমন্বিত কৌশলগত ব্যবস্থাপনায় পরিণত হয়; যেখানে কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছাই কাজ করে না।
আইনি অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন ছিল। সরকারি পর্যায়ে বলা হয়েছে, আগে থেকে লাগানো মামলাগুলো থেকে অব্যাহতি পাওয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা নেয়ার ফলে আইনি বাধার তেমন কোনো কারণ নেই—কিন্তু এটাও একটি বাস্তবতা যে রাজনৈতিক পরিবেশ কখনোই কেবল আইনি বিষয় দিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেকের রাজনীতি থেকে অচল করার প্রক্রিয়া এবং পরে যে শর্তাদি বা সমঝোতা হয়েছিল, সেগুলো সশরীরে ও নীতিগতভাবে একটি দীর্ঘকালের প্রভাব রেখে যেতে পারে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন—ওই সময়ে নেয়া কিছু অনাড়ম্বর সিদ্ধান্ত বা মুচলেকাসমূহের প্রভাব এখনও মুছে যায়নি; অন্যরা বলেন আন্তর্জাতিক স্তরের অবস্থান, বিশেষত ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রের মত বড় শক্তিগুলোর ‘আশ্বাস’ বা ‘আপত্তি’—এসবও ক্যান্ডিডেট বা নেতার প্রত্যাবর্তনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা যে ভয় দেখান—ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিবর্তন না হলে তারেকের দেশে প্রত্যাবর্তন কঠিন—তার পিছনে একটাই যুক্তি কাজ করে: বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিশীলতা অনেক অংশে আন্তর্জাতিক শক্তির পরিবেশের সঙ্গে সংযুক্ত। ঠাণ্ডা কূটনীতি, নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা, এবং বড় দুটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষণ—এসব মিলিয়ে দেশীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মুক্ত গমন বা প্রত্যাবর্তনকে প্রভাবিত করে। উইকিলিক্সের তথ্য ও অতীত কাগজপত্র এমন ইঙ্গিত দেই যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দেশের আপত্তি একটি রাজনৈতিক দৃশ্যকে স্থবির করতে সক্ষম। তবে এও সত্য যে প্রতিটি সময় ও পরিস্থিতি আলাদা; গত বছর বা এর আগের পরিস্থিতির সমান্তরাল আজকের রাজনৈতিক রূপটিকে একেবারে একইভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
তারেক যখন ব্যক্তিগতভাবে মায়ের শয্যাসংলগ্ন সময় মায়া-পাশের আশাও চান, সেটি সার্বজনীন মানবিক অনুভূতি। কিন্তু রাজনীতি কখনোই কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির ইচ্ছার জবাব দিয়ে কাজ করে না। বিশেষত যখন সেই রাজনীতির কেন্দ্র ব্যক্তি দেশের ক্ষমতায় দীর্ঘদিনে প্রভাবিত দুই পরিবারের ধারাবাহিকতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে থাকা। মাইনাস টু বা মাইনাস ফোরের মত ঐতিহাসিক ধারণা—যেটি এক সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বাইরে রাখতে বা সীমাহীনভাবে নিচু অবস্থায় রাখতে চেয়েছিল—তারেক কিভাবে ও কবে ফিরে আসবেন তা সেই বৃহত্তর কৌশলের ওপর নির্ভরশীল। মহিউদ্দিন আহমদের মতবিশেষীরা বলছেন, ১/১১ বা তৎপরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া সমঝোতা ও লেনদেনের নির্দিষ্টতা আজও প্রাসঙ্গিক থাকতে পারে—এই কথাটা উপেক্ষা করা যাবে না।
অন্যদিকে, বিএনপি নিজেই এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও কাজে লাগাতে পারে। তাদের নেতারা সূচিত করেছে—নির্বাচনের তফসিল দিলে পরিস্থিতি যাই হোক, তিনি ফিরে আসবেন। এ বক্তব্যটি দলকে অভ্যন্তরীণ ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখাতে পারে, একই সঙ্গে বিরোধী শঙ্কা-প্রচারণাও জাগাতে পারে। তবে বাস্তবে ফিরে এসে নির্বাচনে নেতৃত্ব দেবার ব্যাপারে সার্বিক পরিকল্পনা না থাকলে এবং যদি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে ফিরে আসা কেবল প্রতীকী নয় সমস্যা বাড়ানোরও কারণ হতে পারে।
ফেরার পরিকল্পনায় নিরাপত্তা একটি বড় দিক। সংবাদ মাধ্যমে যে দুই বুলেটপ্রুফ গাড়ি কেনা ও অস্ত্রে লাইসেন্স নেওয়ার ব্যাপার প্রচার হয়েছে, তা নির্দেশ করে যে দল নিজের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সচেতন। কিন্তু নিরাপত্তা ক্ষণস্থায়ী হয়; রাজনৈতিক পুনরায় শাসনের পরিবেশ, কোর্ট, প্রশাসন ও রাজনৈতিক শত্রু-সমর্থকের অবস্থান—এসব দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তাই কেবল গাড়ি বা নিরাপত্তা প্রটোকলই যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক পুনর্মিলন ও ক্ষমতায় ফেরার পথ খোলার আগে বিস্তৃত কূটনৈতিক ও আইনি সহায়তাও প্রয়োজন।
আরও বিস্তৃত প্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় নামের অনুপস্থিতি নতুন নেতা ও কৌশলকে বিকশিত করেছে—কখনও তা দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণে পরিণত হয়েছে, আবার কখনো তা অভ্যন্তরীণ সংঘাত সৃষ্টি করেছে। তারেকের অনুপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—তারেক ফেরার সময় যদি দলের কনট্রোল পুরোনো অবস্থায় ফিরে আসে, তাহলে কি বিএনপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব ও সংগঠন সেই রূপে গ্রহণযোগ্য থাকবে, নাকি নতুন নেতৃত্ব, নতুন কৌশল ইতিমধ্যে শক্তিশালী হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরও তার দেশের ফিরনে অদৃশ্য ভূমিকা রাখে।
অবশেষে রাজনৈতিক মানসিকতাও একটি বড় ফ্যাক্টর—দলের নেতারা বলছেন, ‘মায়ের পাশে থাকা’ স্বাভাবিক একটি মানবিক দাবি। সাধারণ জনতাও প্রায়শই ব্যক্তিগত সম্পর্ককে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপরে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু বাস্তব রাজনীতি দেখায় যে কখনো কখনো কূটনৈতিক আপত্তি, নিরাপত্তা ঝুঁকি, বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে আসা হুমকি ব্যক্তিগত মানসিকতা-ইচ্ছাকে পাল্টিয়ে দেয়। তারেক নিজে যদি বলছেন সিদ্ধান্ত তার একক নয়, তাহলে মনে করা যায় তিনি যেসব কৌশলগত পরামিতি বিবেচনা করছেন—তারা গোপনীয়, বহুমাত্রিক ও সংবেদনশীল। এ কারণেই তার স্ট্যাটাসে ‘বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশ সীমিত’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
এখনকার প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে—তার দেশের ফেরাকে কীভাবে নিরাপদ, ন্যায়সঙ্গত এবং দলীয়-জাতীয় স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়? এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে—বিশেষ করে যখন বহুসংখ্যক ফ্যাক্টর, অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক, সবই সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে? দেশের রাজনৈতিক ও নীতি নির্ধারণী মহল, গণমাধ্যম, এবং আন্তর্জাতিক অংশীদাররা—সবাই এই সিদ্ধান্তের আচরণকে মূল্যায়ন করছে। সেই সাথে, জনমতও গুরুত্ব রাখে; সাধারণ মানুষ মায়া ও রাজনৈতিক বাস্তবতা—দুটোর মধ্যেই বিবেচনায় থাকবে।
সংক্ষেপে বলা যায়, তারেকের দেশে ফিরে আসা এখন আর ব্যক্তিগত একক সিদ্ধান্ত নয়—এটি একটি রাজনৈতিক কনসেনসাস, কূটনৈতিক সহানুভূতি, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং দলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির সমন্বিত ফসল। প্রত্যাবর্তন হলে সেটি কেবল ব্যক্তির পুনরায় দেশে পৌঁছানো হবে না; বরং তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিবে—যখন এই মোড় সকলের জন্য গ্রহণযোগ্য, নিরাপদ এবং আইনসম্মত হবে, তখনই সত্যিকারের ‘ফেরা’ গৃহীত বলে গণ্য হবে।
আপনার মতামত জানানঃ