বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আবারও বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল। দীর্ঘ দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা কমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এক কঠিন বাস্তবতা সামনে এসেছে। এবারের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অর্থাৎ পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অন্যদিকে, অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। সংখ্যার হিসাবে প্রতি দুইজন পরীক্ষার্থীর প্রায় একজন এবার উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি।
শুধু পাসের হার নয়, জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। এবারের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ফল অর্জন করেছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। অথচ কয়েক বছর আগেও দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের ওপরে। এমনকি করোনাকালীন সময়ে বিশেষ মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পাসের হার শতভাগ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সেই তুলনায় ২০২৬ সালের ফলাফলকে কেবল একটি পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দেশের শিক্ষা, পাঠদান, মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
ফলাফলের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, হঠাৎ এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলেন কেন? শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল, নাকি প্রশ্নপত্র ও খাতা মূল্যায়নের পদ্ধতিতে কোনো সমস্যা তৈরি হয়েছে? দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নম্বর দেওয়ার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে বলেই কি ফলাফল এতটা নিচে নেমেছে? নাকি শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা দুর্বলতাগুলো এবার একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে?
সরকারের পক্ষ থেকে এবারের ফলাফলকে মূল্যায়নের স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলাফল প্রকাশের সময় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন স্বীকার করেছেন, পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা সন্তোষজনক নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সমস্যাটি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামগ্রিক শিখন পদ্ধতি, পাঠ্যবই এবং শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ঘাটতি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিনও আগের বছরগুলোতে জিপিএ-৫ ও পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর একটি সংস্কৃতির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, সেই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে এবার শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, পরীক্ষকদের অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার প্রবণতা থেকে সরে আসতে বলা হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষে যত নম্বর পাওয়ার যোগ্য, তাদের ততটুকুই দেওয়ার নির্দেশনা ছিল।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। মূল্যায়ন কঠোর হলেই কি ফলাফল ভালো না হওয়ার দায় পুরোপুরি শিক্ষার্থীদের ওপর বর্তায়? প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই মূল্যায়ন হতে হবে নির্ভুল, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ন্যায়সংগত। একজন পরীক্ষক যে উত্তরে ১০ নম্বর দিচ্ছেন, অন্য পরীক্ষক একই মানের উত্তরে যদি ৪ নম্বর দেন, তাহলে সেটি আর স্বচ্ছ মূল্যায়ন থাকে না। ফলে নম্বর কমানোর পরিবর্তে মূল্যায়নের মান নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
এবারের ফলাফল নিয়ে বোর্ড কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও এমন কিছু বিষয় উঠে এসেছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, খাতা মূল্যায়নের নম্বরপত্র বিশ্লেষণ করে পরীক্ষকদের মধ্যে অস্বাভাবিক নম্বরের পার্থক্য দেখা গেছে। এ কারণে ইতোমধ্যে ১০০ জনেরও বেশি পরীক্ষককে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো না হলেও বিষয়টি স্পষ্ট করে যে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যেও কিছু অসংগতি থাকতে পারে।
এখানে মনে রাখা জরুরি, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন শুধু একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। একজন পরীক্ষকের ভুল সিদ্ধান্ত একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নম্বর প্রদানের মানদণ্ড এবং পুনর্মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটি বিষয়। বিষয়ভিত্তিক ফলাফলে দেখা গেছে, ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে, আইসিটিতে ফেল করেছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। অর্থাৎ এই দুটি বিষয়ই সামগ্রিক ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।
ইংরেজিতে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা দেশের ভাষা শিক্ষার দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনেছে। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ইংরেজি ভাষায় দুর্বলতা নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় অতিক্রম করে। অনেক শিক্ষার্থী ব্যাকরণের নিয়ম মুখস্থ করতে পারে, পরীক্ষায় নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করে উত্তর লিখতেও পারে, কিন্তু বাস্তবে ইংরেজি পড়া, লেখা, শোনা কিংবা বলার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা যায়।
এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ ইংরেজি শিক্ষকের অভাব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইংরেজি শিক্ষাকে যোগাযোগের দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের ভাষাগত ভিত্তি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই যথাযথভাবে তৈরি হয় না। ফলে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এসে ইংরেজির তুলনামূলক জটিল বিষয়গুলো বুঝতে গিয়ে তারা সমস্যায় পড়ে।
শিক্ষাবিদদের বক্তব্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, দক্ষ ইংরেজি শিক্ষকের ঘাটতি ফলাফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ। অনেক প্রতিষ্ঠানে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ইংরেজি পড়ানো হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় ভাষাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় ইংরেজি শিক্ষার সংস্কার শুধু উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীদের ভাষার ভিত্তি তৈরি করতে হবে। মুখস্থনির্ভর ব্যাকরণ চর্চার পরিবর্তে পড়া, লেখা, শোনা ও বলার সমন্বিত অনুশীলন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং শ্রেণিকক্ষে ব্যবহারিক ইংরেজি শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
আইসিটি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনাও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। অথচ যে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলার কথা, সেই বিষয়েই এত বড় সংখ্যক শিক্ষার্থী ব্যর্থ হচ্ছেন। এটি দেশের ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
বোর্ড কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত আইসিটি শিক্ষক নেই। অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে আইসিটি পড়ানোর প্রবণতাও রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বিষয়টির মৌলিক ধারণা যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে পারছে না। একই সঙ্গে সিলেবাস অনুধাবনেও দুর্বলতা রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিগত বৈষম্য। রাজধানীর অনেক শিক্ষার্থী কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পেলেও গ্রামাঞ্চলের বহু শিক্ষার্থীর কাছে এসব সুবিধা নেই। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত আইসিটি ল্যাবও নেই। ফলে বইয়ে কম্পিউটার ও প্রযুক্তির বিভিন্ন ব্যবহার সম্পর্কে পড়লেও বাস্তবে সেগুলো হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পায় না শিক্ষার্থীরা।
এখানে একটি মৌলিক অসংগতি রয়েছে। যে দেশে ডিজিটাল বাংলাদেশ কিংবা স্মার্ট বাংলাদেশের মতো লক্ষ্য সামনে রেখে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের কথা বলা হয়, সেই দেশের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ যদি আইসিটি শিক্ষার মৌলিক সুবিধা থেকেই বঞ্চিত থাকে, তাহলে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। শুধু পাঠ্যবইয়ে প্রযুক্তির অধ্যায় যুক্ত করলেই প্রযুক্তিগত শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন কম্পিউটার ল্যাব, দক্ষ শিক্ষক, ব্যবহারিক ক্লাস এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ।
তবে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ শুধু ইংরেজি ও আইসিটি শিক্ষকের সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজধানীর বাইরে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কম। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস না করেই শুধু ফরম পূরণ করে পরীক্ষায় অংশ নেয়। এমন পরিস্থিতিতে ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করা কঠিন।
কিন্তু শিক্ষার্থীরা কেন নিয়মিত ক্লাসে আসে না, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষকদের পাঠদানের মান, অভিভাবকদের সচেতনতা, আর্থিক সংকট এবং শিক্ষার্থীদের পারিবারিক বাস্তবতা—সবকিছুই উপস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলে। অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্বও পালন করতে হয়। আবার কোথাও শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নিয়মিত হলেও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ধরে রাখার মতো পরিবেশ থাকে না।
তাই উপস্থিতি কম হওয়ার জন্য শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করলে সমস্যার মূল কারণ আড়ালে থেকে যাবে। বরং কেন শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে আসতে আগ্রহী হচ্ছে না, সেই বিষয়টি অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
এবারের ফলাফলে শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে বৈষম্যও স্পষ্ট হয়েছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে এই হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ। অন্যদিকে, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার মাত্র ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। যশোর বোর্ডে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। রাজশাহী বোর্ডে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং দিনাজপুর বোর্ডে ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
অর্থাৎ রাজধানীকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মানগত পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই বৈষম্যের পেছনে শিক্ষকের প্রাপ্যতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষার উপকরণ, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং আর্থসামাজিক অবস্থার ভূমিকা থাকতে পারে।
একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অঞ্চলভেদে এত বড় পার্থক্য থাকা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগজনক। কারণ একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত তার মেধা ও পরিশ্রমের ভিত্তিতে, সে রাজধানীতে পড়াশোনা করছে নাকি প্রত্যন্ত অঞ্চলে—তার ভিত্তিতে নয়।
পাসের হারের ঐতিহাসিক চিত্রও এবারের ফলাফলের গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে। ২০০৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০০৮ সালে তা বেড়ে প্রায় ৭৫ শতাংশে পৌঁছায়। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বছরে পাসের হার ৬৬ থেকে ৭৮ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে প্রচলিত লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি এবং বিশেষ মূল্যায়ন পদ্ধতিতে শতভাগ পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়। ২০২১ সালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষার মাধ্যমে পাসের হার দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ৩ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেন।
এরপর ২০২৫ সালে পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ২০২৬ সালে তা আরও কমে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, বিভিন্ন বছরের পরীক্ষার সিলেবাস, প্রশ্নের ধরন, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং বিশেষ পরিস্থিতি এক রকম ছিল না। তাই শুধু পাসের হারের তুলনা দিয়ে শিক্ষার মানের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে পাসের হার কমে যাওয়ার প্রবণতা যে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে অনুসন্ধানের প্রয়োজন তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এবারের ফলাফলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি। অন্যদিকে, শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠানে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যায় না। এটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাঠদান, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক তদারকি এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
একটি প্রতিষ্ঠানে যদি কোনো শিক্ষার্থীই পাস না করে, তাহলে সেখানে কী ধরনের পাঠদান হয়েছে, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নিয়েছেন কি না, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি কেমন ছিল এবং প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক শিক্ষার মান কী পর্যায়ে রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষণপদ্ধতি ও ভালো ফলাফলের পেছনের কারণগুলোও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। সফল প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর পদ্ধতি অন্য প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে।
তবে এবারের ফলাফলের সবচেয়ে মানবিক দিকটি ভুলে গেলে চলবে না। প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, কয়েক বছরের পরিশ্রম, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন এবং অসংখ্য প্রত্যাশা। একজন শিক্ষার্থীর কাছে এই ফলাফল শুধু একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা নয়; এটি অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, উচ্চশিক্ষা এবং কর্মজীবনের পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তোলে।
বিশেষ করে যারা মাত্র এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন, তাদের জন্য পুরো একটি বছর অপেক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এবার নতুন সুযোগের ঘোষণা দিয়েছে। সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীরা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। একই সঙ্গে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করার সুযোগও থাকছে। বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরীক্ষার পাশাপাশি ফলাফলও ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
এটি শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে। কারণ একটি বা দুটি বিষয়ে ব্যর্থ হওয়ার কারণে পুরো একটি বছর হারানোর ঝুঁকি কমবে। তবে এই সুযোগ কার্যকর করতে হলে দ্রুত ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রকাশ করতে হবে। নিবন্ধন ফি, পরীক্ষার তারিখ, সিলেবাস, পরীক্ষার ধরন এবং ফলাফল প্রকাশের সময়সীমা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। শিক্ষার্থীদের যেন কোনো ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়াকে কার্যকর ও সহজ করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী যদি মনে করেন তার প্রাপ্ত নম্বর প্রকৃত মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তাহলে তার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার সুযোগ থাকতে হবে। তবে পুনর্নিরীক্ষণ মানেই নতুন করে সম্পূর্ণ উত্তরপত্র মূল্যায়ন নয়—এ বিষয়েও শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এইচএসসি ফলাফল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই ফলাফলকে শুধু সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ রাখলে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যাবে। অতীতে পাসের হার বেশি ছিল বলে শিক্ষার মান ভালো ছিল, এমন দাবি যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি এবার পাসের হার কমেছে বলে শিক্ষার্থীদের মেধা হঠাৎ কমে গেছে, সেটিও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে না।
প্রকৃত সমস্যার সমাধান করতে হলে শিক্ষার প্রতিটি স্তরে পরিবর্তন আনতে হবে। দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম, মানসম্মত পাঠ্যবই, ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ, প্রযুক্তিগত সুবিধা, অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য দূর করা এবং পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অভিন্ন মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করে বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব দক্ষতা অর্জনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
আপনার মতামত জানানঃ