
ধরা যাক, একজন ব্যবসায়ী ক্রেতাকে ঠকান না। কিন্তু তাঁর সততার কারণ হলো, প্রতারণা ধরা পড়লে ব্যবসার ক্ষতি হবে। আরেকজন ব্যবসায়ীও ক্রেতাকে ঠকান না, কারণ তিনি মনে করেন মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা অন্যায়—ধরা পড়ুক বা না পড়ুক। বাইরে থেকে দুজনের আচরণ একই। কিন্তু তাঁদের নৈতিক অবস্থানও কি একই?
ইমানুয়েল কান্টের দর্শন এই প্রশ্নে আমাদের থামিয়ে দেয়। ভালো কাজের ফলের পাশাপাশি তিনি জানতে চান, কাজটি কোন নীতিতে এবং কেন করা হলো। এই প্রশ্ন ব্যক্তিগত সততা থেকে রাজনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত। আমরা কি সঠিক কাজ করি সুবিধার জন্য, নাকি সঠিক বলেই করি? অন্য মানুষকে সম্মান করি, নাকি নিজের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি?
১৭২৪ সালে প্রুশিয়ার কনিগসবের্গে জন্ম নেওয়া কান্ট ১৮০৪ সালে মারা যান। শহরটি আজ রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ নামে পরিচিত। আধুনিক দর্শনে তাঁর গুরুত্ব মূলত মানুষের জ্ঞানের শর্ত, নৈতিক দায়িত্ব এবং স্বাধীনতার সম্পর্ক নতুনভাবে ব্যাখ্যা করায়। তাঁর চিন্তার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি যুক্তির ক্ষমতার সঙ্গে তার সীমাও পরীক্ষা করতে চেয়েছেন।
কান্টকে বুঝতে প্রথমে জানতে হয়, আমরা কীভাবে পৃথিবীকে জানি। তাঁর মতে, মন বাইরের জগতের নিছক নিষ্ক্রিয় আয়না নয়। অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া উপাদানকে বোঝার ক্ষেত্রে মনের নিজস্ব কাঠামো কাজ করে। স্থান ও কাল আমাদের ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতার মৌলিক রূপ; আর কার্যকারণসহ বোধের ধারণাগুলো অভিজ্ঞতাকে সংগঠিত করতে সাহায্য করে। এই বক্তব্য ‘সব সত্য ব্যক্তিভেদে বদলে যায়’—এমন দাবি নয়। কান্ট ব্যাখ্যা করতে চান, অভিজ্ঞতার জগৎকে আমরা কী শর্তে সুশৃঙ্খলভাবে জানতে পারি।
একটি সহজ তুলনা করা যায়: কোনো দৃশ্য দেখার সময় আমরা শুধু রঙের বিচ্ছিন্ন দাগ পাই না; বস্তু, অবস্থান ও ঘটনার সম্পর্কও বুঝি। তবে এটি কান্টের জ্ঞানতত্ত্ব বোঝানোর তুলনা, তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ বিবরণ নয়। তাঁর প্রশ্ন সাধারণ পক্ষপাত নিয়ে নয়, মানব অভিজ্ঞতা সম্ভব হওয়ার মৌলিক শর্ত নিয়ে।
এখানেই আসে জ্ঞানের সীমা। বস্তু আমাদের কাছে যেভাবে অভিজ্ঞতায় উপস্থিত হয় এবং আমাদের জানার শর্তের বাইরে বস্তু নিজে যেমন—কান্ট এ দুটির মধ্যে পার্থক্য করেন। অভিজ্ঞতার শর্ত বাদ দিয়ে বস্তুর নিজস্ব প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান দাবি করা যায় না। এর অর্থ পৃথিবী অবাস্তব নয়। বরং আমাদের জ্ঞানের বৈধ পরিসর আছে; যা ভাবতে পারি, তার সবকিছু জেনে ফেলেছি বলে দাবি করা চলে না।
এই ভাবনা আজও একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সতর্কতা তৈরি করে। নিজের ব্যাখ্যা দৃঢ় মনে হচ্ছে বলে তাকে চূড়ান্ত সত্য ভাবা ঠিক নয়। তবে কান্টের জ্ঞানতত্ত্বকে শুধু ‘নিজের ভুল মেনে নাও’ ধরনের পরামর্শে নামিয়ে আনলেও তার গভীরতা হারায়। তিনি সাধারণ বিনয় শেখানোর পাশাপাশি যুক্তি কোন প্রশ্নে জ্ঞান দিতে পারে এবং কোথায় তার দাবি অতিরিক্ত হয়ে যায়, সেই সীমারেখা খুঁজছিলেন।
নৈতিকতার ক্ষেত্রে কান্টের প্রশ্ন আরও সরাসরি। তাঁর ‘নিঃশর্ত নৈতিক নির্দেশ’ বা categorical imperative-এর একটি মূল পরীক্ষা হলো: যে নীতিতে আমি কাজ করছি, তা কি সবার জন্য সাধারণ নিয়ম হোক বলে যুক্তিসংগতভাবে চাইতে পারি? নিজের সুবিধার জন্য এমন ব্যতিক্রম দাবি করা যাবে না, যা অন্য সবাই গ্রহণ করলে ব্যবস্থাটিই ভেঙে পড়ে।
মিথ্যা প্রতিশ্রুতির উদাহরণটি ধরা যাক। কেউ টাকা ধার নেওয়ার জন্য ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন, অথচ তাঁর ফেরত দেওয়ার ইচ্ছা নেই। তিনি প্রতিশ্রুতির ওপর অন্য মানুষের বিশ্বাস ব্যবহার করছেন। কিন্তু প্রয়োজন হলেই সবাই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেবে—এমন নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট হবে। নিজের জন্য সুবিধা চাইতে গিয়ে তিনি সেই নিয়মের ভিত্তি ধ্বংস করছেন, যার ওপর সুবিধাটি নির্ভর করে।
এই পরীক্ষা সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমোদনের পরীক্ষা নয়। সমাজের অধিকাংশ মানুষ কোনো কাজ মেনে নিলেই সেটি কান্টীয় অর্থে নৈতিক হয়ে যায় না। প্রশ্ন হলো, নিজের কাজের নীতিকে অন্যের ক্ষেত্রেও গ্রহণ করা সম্ভব কি না এবং যুক্তিসংগত নৈতিক নিয়ম হিসেবে তা টিকে কি না। এতে ক্ষমতাবান ব্যক্তির জন্য আলাদা নীতি এবং সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা নীতির দাবি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
কান্টের নৈতিকতার আরেকটি কেন্দ্রীয় ধারণা মানবমর্যাদা। মানুষকে সব সময় একই সঙ্গে উদ্দেশ্য হিসেবে দেখতে হবে, কখনো নিছক উপায় হিসেবে নয়। এখানে ‘নিছক’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চিকিৎসক, শ্রমিক বা সহকর্মীর সাহায্য নিই; পারস্পরিক সহযোগিতা নিষিদ্ধ নয়। অন্যায় শুরু হয় যখন কারও সিদ্ধান্ত, সম্মতি ও মর্যাদাকে অগ্রাহ্য করে তাঁকে নিজের লাভের যন্ত্রে পরিণত করি।
এই নীতির বর্তমান প্রয়োগ ভাবলে দেখা যায়, কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী কেবল উৎপাদনের সংখ্যা নন; কোনো ভোটার শুধু নির্বাচনী হিসাব নন; কোনো দরিদ্র মানুষ কেবল প্রচারের ছবির বিষয় নন। এগুলো কান্টের সরাসরি উদাহরণ নয়, তাঁর নীতির আলোকে আমাদের সময়ের পরিস্থিতি বিচার করার উপায়। সাহায্য করার মধ্যেও প্রশ্ন থাকে: যাঁকে সাহায্য করছি, তাঁর নিজের মত ও সিদ্ধান্তের জায়গা রাখছি কি?
এই কারণে কান্টের কাছে স্বাধীনতা শুধু যা ইচ্ছা তা করার সুযোগ নয়। ক্ষণিকের লোভ, ভয় কিংবা সামাজিক চাপের নির্দেশ মেনে চলাও এক ধরনের পরাধীনতা হতে পারে। নৈতিক স্বায়ত্তশাসন হলো যুক্তির ভিত্তিতে এমন নীতি মেনে চলা, যার কর্তৃত্ব আমরা নিজেরাও গ্রহণ করি এবং যা অন্য যুক্তিসম্পন্ন মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এটি নিজের খেয়ালকে আইন বানানোর অনুমতি নয়।
একইভাবে কর্তব্য থেকে কাজ করা মানে আনন্দ বা সহমর্মিতার বিরোধিতা করা নয়। কাউকে সাহায্য করে আনন্দ পেলে কাজটি খারাপ হয়ে যায় না। কান্টের প্রশ্ন হলো, আনন্দ না পেলেও কিংবা সুবিধা না থাকলেও নৈতিক কারণটি কাজের ভিত্তি হবে কি না। সহানুভূতি আচরণকে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু তার উপস্থিতি-অনুপস্থিতির ওপর মানুষের মর্যাদা নির্ভর করা উচিত নয়।
ব্যক্তির এই স্বাধীন চিন্তা সামাজিক জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ। ১৭৮৪ সালের ‘আলোকায়ন কী?’ প্রবন্ধে কান্ট অন্যের নির্দেশের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে নিজের বুদ্ধি ব্যবহারের সাহসের কথা বলেন। তাঁর কাছে আলোকায়নের জন্য যুক্তির প্রকাশ্য ব্যবহার জরুরি: মানুষ পাঠকসমাজের সামনে যুক্তি তুলে ধরবেন, সমালোচনা করবেন এবং প্রচলিত ধারণা পরীক্ষা করবেন।
তবে তাঁকে সীমাহীন অবাধ্যতার প্রবক্তা হিসেবে পড়া ঠিক হবে না। ওই প্রবন্ধে কান্ট দায়িত্ব পালনের সময় যুক্তির ব্যবহার এবং জনসমক্ষে চিন্তাশীল লেখক হিসেবে যুক্তি প্রকাশের মধ্যে পার্থক্য করেন। তাঁর পরিভাষায় প্রথমটি ‘ব্যক্তিগত’ এবং দ্বিতীয়টি ‘প্রকাশ্য’ ব্যবহার—আজকের সাধারণ অর্থের সঙ্গে যা সহজে মেলে না। এই ধারণায় সমালোচনার স্বাধীনতার শক্তিশালী দাবি যেমন আছে, তেমনি কর্তৃত্ব মেনে চলার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়েও কান্টের চিন্তা ছিল। ১৭৯৫ সালের ‘স্থায়ী শান্তি’ প্রবন্ধে তিনি শান্তিকে শুধু যুদ্ধ থেমে থাকার অবস্থা হিসেবে দেখেননি। প্রতিনিধিত্ব ও আইনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা, স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর শান্তিপূর্ণ সংঘ এবং বিদেশির প্রতি সীমিত বিশ্বনাগরিক আতিথেয়তার অধিকার নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। তাঁর ‘প্রজাতান্ত্রিক’ ধারণাকে বর্তমান নির্বাচনী গণতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা যাবে না; সেখানে প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতার পৃথকীকরণের গুরুত্ব ছিল।
এর বর্তমান তাৎপর্য হলো, ভালো শাসকের সদিচ্ছার চেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন বেশি। যুদ্ধের সিদ্ধান্তের মূল্য যাঁরা দেবেন, তাঁদের সম্মতি ও অধিকার অগ্রাহ্য করে শান্তি টেকসই করা কঠিন। তবে কান্টের শান্তির প্রকল্প আন্তর্জাতিক রাজনীতির সব সংঘাতের প্রস্তুত সমাধান নয়; এটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শান্তির শর্ত ভাবার একটি দিকনির্দেশ।
কান্টের দর্শন নিয়ে আপত্তিও রয়েছে। কঠোর নৈতিক নিয়ম বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রয়োগ হবে? কাউকে রক্ষা করতে সত্য গোপন করা প্রয়োজন হলে কী করা উচিত? দায়িত্বের সংঘাত ও অনিশ্চিত পরিণতি কীভাবে বিবেচনায় আসবে? এসব প্রশ্ন কান্টীয় নৈতিকতা নিয়ে বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর দর্শন আচরণের নীতিকে গভীরভাবে পরীক্ষা করে, কিন্তু বাস্তব সিদ্ধান্তের সব কঠিন পরিস্থিতি সহজ করে দেয় না।
তবু তাঁর দর্শনের স্থায়ী শক্তি আমাদের আত্মপক্ষসমর্থনের অভ্যাসে বাধা দেওয়া। ‘আমি লাভবান হব’, ‘সবাই করে’, ‘আমার পক্ষের মানুষ’—এসব কারণকে তিনি নৈতিকতার যথেষ্ট ভিত্তি হতে দেন না। তাঁর চিন্তা আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়: আমার নীতি কি নিজের সুবিধার বাইরে টিকবে? অন্যের মর্যাদা কি আমার উদ্দেশ্যের কাছে গৌণ হয়ে যাচ্ছে? আমি কি যুক্তি দিয়ে ভাবছি, নাকি পরিচিত কর্তৃত্বের নির্দেশ অনুসরণ করছি?
কান্টের কাছে মানুষ এমন এক সত্তা, যে নিজের কাজের কারণ পরীক্ষা করতে পারে এবং সেই কাজের দায় নিতে পারে। জ্ঞানের সীমা স্বীকার করা, স্বাধীনভাবে যুক্তি ব্যবহার করা এবং অন্যকে পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখা—এই তিনটি কাজ তাই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর দর্শন সহজ সান্ত্বনা দেয় না। বরং এমন একটি কঠিন দায়িত্ব সামনে রাখে: নিজের সুবিধার বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের নীতিকে বিচার করা।
আপনার মতামত জানানঃ