
৭ অক্টোবর ২০০১, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তানে আল-কায়েদা ও তালেবানের লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা শুরু করে। ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর শুরু হওয়া অভিযানের প্রথম পর্যায়ে তালেবান সরকার দ্রুত ক্ষমতাচ্যুত হয়। কিন্তু দুই দশক পর, ২০২১ সালের আগস্টে, তালেবান আবার কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং বিদেশি সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়। আজ সেই অভিযানের শুরুর ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এর অর্থ মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ টানা ২৫ বছর চলেছে নয়; বরং যুদ্ধ শুরুর এক প্রজন্ম পরও তার রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো: যে সামরিক শক্তি একটি সরকারকে দ্রুত উৎখাত করতে পারে, সেই শক্তি কেন তার জায়গায় টেকসই রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়তে পারে না? আফগানিস্তান থেকে উত্তরটি সরলভাবে দেওয়া যায় না। সামরিক অভিযান কিছু নিরাপত্তা-লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতে পারে এবং পুনর্গঠনের সুযোগও তৈরি করতে পারে। কিন্তু নিজে থেকে নাগরিক আস্থা, গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমঝোতা এবং স্বনির্ভর প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দিতে পারে না।
এখানে ‘রাষ্ট্র গড়া’ বলতে কোনো রাষ্ট্রহীন ভূখণ্ডে প্রথমবার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বোঝানো হচ্ছে না। আফগানিস্তানের দীর্ঘ রাষ্ট্রীয় ইতিহাস রয়েছে। আলোচ্য বিষয় হলো, ২০০১ সালের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তায় গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে এমন ভিত্তি দেওয়া, যাতে বাইরের সামরিক আশ্রয় সরে গেলেও তা টিকে থাকে। এই পার্থক্য জরুরি; তা না হলে আফগান সমাজকে ইতিহাসহীন কিংবা শাসনব্যবস্থা গড়ার অক্ষম হিসেবে দেখানোর ভুল হয়।
সামরিক বিজয় ও রাজনৈতিক সাফল্যের সময়ও এক নয়। বিমান হামলায় একটি ঘাঁটি ধ্বংস করা সম্ভব; একটি আদালতকে নিরপেক্ষ করে তোলা তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজ। কোনো শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যায়, কিন্তু সেই শহরের মানুষ পুলিশকে বিশ্বাস করবেন কি না, তা আলাদা প্রশ্ন। সরকারি দপ্তরের ভবন তৈরি হতে পারে, অথচ সেখানে নাগরিককে সেবা পেতে ঘুষ দিতে হলে ভবনটি রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বাড়াবে না। অস্ত্রের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও ন্যায্য শাসনের মাধ্যমে আনুগত্য অর্জনের এই ব্যবধানই আফগান অভিজ্ঞতার কেন্দ্র।
শুরুর নিরাপত্তা-লক্ষ্য ধীরে ধীরে অনেক বড় প্রকল্পে পরিণত হয়েছিল। ন্যাটোর নিজের মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দুর্বল করার লক্ষ্য ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত হয়েছিল। ভবিষ্যতের অভিযানে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ এবং মিশনের বিস্তার নিয়ে সতর্ক থাকার সুপারিশ এসেছে সেই মূল্যায়নে।
এই বিস্তারের সমস্যা শুধু বেশি কাজ নেওয়া নয়। সমস্যা হলো সাফল্যের সংজ্ঞা বদলে যাওয়া। সন্ত্রাসী সংগঠনের একটি নেটওয়ার্ক দুর্বল হওয়া, বিদ্রোহ দমন, নির্বাচন আয়োজন, প্রশাসন গড়া এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন—প্রতিটি লক্ষ্য আলাদা সক্ষমতা দাবি করে। একটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি অন্য ক্ষেত্রের ব্যর্থতাকে আড়াল করলে সামরিক কর্তৃপক্ষের আশাবাদ আর নাগরিকের অভিজ্ঞতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। সরকার টিকে আছে বলেই তার ভিত শক্ত, এমন ধারণাও তখন সহজে জন্ম নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আফগান পুনর্গঠন তদারকি সংস্থা সিগারের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে অসংগত কৌশল, অবাস্তব সময়সীমা, টেকসই নয় এমন প্রকল্প এবং স্থানীয় বাস্তবতা যথাযথভাবে না বোঝার সমস্যা উঠে এসেছে। দ্রুত অর্থ ব্যয়ের চাপ দুর্নীতি বাড়িয়েছে এবং কর্মসূচির কার্যকারিতা কমিয়েছে বলেও প্রতিবেদনটি জানিয়েছে।
এর তাৎপর্য হলো, প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজকে প্রকল্প শেষ করার গতিতে মাপা যায় না। একটি বিদ্যালয় নির্মাণের সময়সীমা নির্ধারণ করা সহজ; শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত বেতন, শিক্ষার মান এবং মেয়েদের নিরাপদে সেখানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব। একইভাবে একটি সেনাদলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া ও অস্ত্র সরবরাহের পরও নেতৃত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ, রসদ এবং নিজস্ব পরিকল্পনার সক্ষমতা প্রয়োজন। দৃশ্যমান উপকরণ তৈরি হয়েছে কি না এবং প্রতিষ্ঠান নিজে চলতে পারছে কি না—দুটি আলাদা হিসাব।
দুর্নীতির প্রশ্নেও সিগারের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের রাজনৈতিক ও আর্থিক সমর্থন দেওয়ার ফলে দায়মুক্তি ও দুর্বল আইনের শাসন বাড়ার ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
যুদ্ধের সময়ে কোনো শক্তিশালী স্থানীয় সহযোগী তাৎক্ষণিক সুবিধা দিতে পারেন। কিন্তু তাঁর অন্যায়কে উপেক্ষা করলে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা পান সেই অন্যায়ের মধ্য দিয়েই। তাঁদের কাছে বিদেশি সমর্থিত সরকারের প্রতিশ্রুতির চেয়ে স্থানীয় দপ্তর, পুলিশ কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির আচরণ বেশি বাস্তব। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বল্পমেয়াদি সুবিধা রাজনৈতিক বৈধতার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি করতে পারে। এটি তালেবানের শাসনকে ন্যায্য করে না; বরং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারানোর একটি পথ ব্যাখ্যা করে।
২০২১ সালের পতনের আরেকটি বড় দিক ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর নির্ভরতা। সিগারের ২০২২ সালের অন্তর্বর্তী মূল্যায়ন অনুযায়ী, মার্কিন সেনা ও ঠিকাদার প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ছিল আফগান বাহিনীর পতনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎক্ষণিক কারণ। একই প্রতিবেদনে উন্নত সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ, বিমান সহায়তা ও রসদব্যবস্থায় বাইরের ওপর নির্ভরতার কথা রয়েছে। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পাওয়া সত্ত্বেও বাহিনীটি পুরোপুরি নিজস্ব সক্ষমতায় চলার অবস্থায় পৌঁছায়নি।
এখানে কঠিন একটি প্রশ্ন ওঠে: যে প্রতিষ্ঠান বিদেশি বিশেষজ্ঞের সহায়তায় কাজ করছে, সেটি কতটা স্থানীয়ভাবে সক্ষম হয়েছে? সাহায্য নেওয়া নিজে ব্যর্থতা নয়। কিন্তু সাহায্য সরে গেলে মূল কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেই নির্ভরতা স্বীকার করেই পরিকল্পনা করতে হয়। বাইরে থেকে পাওয়া সক্ষমতাকে নিজস্ব সক্ষমতা হিসেবে গণনা করলে প্রত্যাহারের পরে বাস্তবতা হঠাৎ ভিন্ন দেখায়। তখন ঘাটতি শুধু সরঞ্জামের থাকে না, রাজনৈতিক নিশ্চয়তারও থাকে।
সেই সঙ্গে আফগান সৈনিকদের সবাইকে লড়াই করতে অনিচ্ছুক হিসেবে দেখানো ইতিহাসকে বিকৃত করবে। একটি বাহিনীর দ্রুত পতন মানেই তার প্রতিটি সদস্য সাহসহীন ছিলেন নয়। সিগারের মূল্যায়নে নেতৃত্বের পরিবর্তন, মনোবলের অবনতি, রসদের দুর্বলতা এবং তালেবানের আক্রমণ ও আলোচনার মাধ্যমে আত্মসমর্পণ আদায়ের সম্মিলিত প্রভাব উঠে এসেছে।
একজন সৈনিকের সিদ্ধান্ত কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাহসের ওপর নির্ভর করে না। তিনি জানতে চান, সহায়তা আসবে কি না, নেতৃত্ব আছে কি না এবং পাশের ইউনিট অবস্থান ধরে রাখবে কি না। একাধিক এলাকা হারানোর সঙ্গে পরের এলাকার প্রতিরোধও দুর্বল হতে পারে। এমন ভাঙন বোঝার জন্য সেনাসংখ্যা কিংবা অস্ত্রের তালিকার পাশাপাশি সম্পর্ক, বিশ্বাস ও সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা দেখতে হয়।
দোহা চুক্তি ও প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও এই ইতিহাসের অংশ। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে বিদেশি সেনা প্রত্যাহারসংক্রান্ত চুক্তি হয়; ২০২১ সালে প্রত্যাহার এগিয়ে নেওয়া হয়। তবে শেষ কয়েক মাসের সিদ্ধান্তকে পুরো ব্যর্থতার একমাত্র ব্যাখ্যা বানালে দুই দশকের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আড়ালে থেকে যাবে। আবার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার কথা বলে প্রত্যাহারের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়ও বাদ দেওয়া যাবে না। কাছের কারণ ও গভীর কারণ একসঙ্গে দেখতে হবে।
আফগানিস্তানকে কেবল কাবুলের সরকারি দপ্তর ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের চোখে দেখারও সীমা আছে। রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের অভিজ্ঞতায়। জমির বিরোধে বিচার পাওয়া, বাজারে নিরাপদে যাওয়া, চিকিৎসা পাওয়া এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিকার—এসবের মধ্য দিয়ে নাগরিক রাষ্ট্রকে চিনতে শেখেন। রাজধানীতে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করলেই তার কর্তৃত্ব ও আস্থা সর্বত্র পৌঁছে যায় না। স্থানীয় অংশগ্রহণ ছাড়া কেন্দ্রীয় কাঠামো অনেক সময় দূরের ক্ষমতা হয়েই থাকে।
তবু এই দুই দশকে কিছুই অর্জিত হয়নি, এমন দাবি ভুল। সিগারের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে শিশুমৃত্যু কমা ও সাক্ষরতা বৃদ্ধিসহ কিছু অগ্রগতির কথা রয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজকে সরকারের পতনের সঙ্গে শূন্য করে দেখা যায় না। রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে বলে তাঁদের অর্জন অর্থহীন হয়ে যায়নি। বরং সেই অর্জনগুলোকে কেন যথেষ্ট সুরক্ষা দেওয়া গেল না, সেটিই আরও জরুরি প্রশ্ন।
তালেবানের ফিরে আসাও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রমাণ নয়। ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা এবং নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা ভিন্ন বিষয়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের জাতিসংঘ ব্রিফিংয়েও আফগান নারীদের ওপর বিধিনিষেধ এবং জাতিসংঘের নারী কর্মীদের কার্যালয়ে প্রবেশের বাধার কথা উঠে এসেছে। সমাজের একটি বড় অংশকে শিক্ষা, কাজ ও সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ থেকে দূরে রাখলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের মানবিক ও সামাজিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই অভিজ্ঞতা থেকে ‘বাইরের সহায়তা কখনো কাজে আসে না’—এমন সিদ্ধান্তও টানা উচিত নয়। অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, কূটনৈতিক সহায়তা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রতিষ্ঠানকে শক্ত করতে পারে। প্রশ্ন হলো, সহায়তার নকশা স্থানীয় দায়িত্ব ও সক্ষমতা বাড়াচ্ছে কি না। যাঁরা প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করবেন, তাঁরা সিদ্ধান্তের মালিক হচ্ছেন কি না। এবং বাইরের সমর্থন কমলে কোন কাজগুলো নিজের সম্পদে চালানো যাবে, তার সৎ হিসাব আছে কি না।
বাংলাদেশসহ অন্য দেশের জন্যও এই ইতিহাসে একটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আছে। বড় ভবন, আধুনিক সরঞ্জাম কিংবা শক্তিশালী বাহিনী রাষ্ট্রের সক্ষমতার দৃশ্যমান অংশ। কিন্তু এগুলোর সঙ্গে ন্যায্য সেবা, জবাবদিহি ও জনআস্থা যুক্ত না হলে ভিত দুর্বল থাকে। আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের ইতিহাস ও পরিস্থিতি এক নয়; তবু উপকরণে বিনিয়োগের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নিয়মে বিনিয়োগ প্রয়োজন—এই শিক্ষা প্রাসঙ্গিক।
যুদ্ধ শুরুর ২৫ বছর পর আফগানিস্তান তাই সামরিক শক্তির সীমা নিয়ে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়। শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে সরানো সম্ভব, কিন্তু তার জায়গায় স্থায়ী রাজনৈতিক বৈধতা বসানো যায় না। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান গড়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে; সেই সুযোগকে টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতায় রূপ দিতে প্রয়োজন স্থানীয় অংশগ্রহণ, ন্যায্যতা, কার্যকর সেবা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা। সামরিক বিজয় দরজা খুলতে পারে। রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখে সেই দরজার ভেতরে নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক।
আপনার মতামত জানানঃ