
মালয়েশিয়ার Foreign Workers Centralised Management System বা FWCMS-এ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর জন্য ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ করা হয়েছে। এ খবর একই সঙ্গে আশা ও অস্বস্তি তৈরি করেছে। আশা—কারণ ২০২৪ সাল থেকে সীমিত থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার আবার সক্রিয় হওয়ার সংকেত মিলছে। অস্বস্তি—কারণ কী প্রক্রিয়ায় ২৫টি প্রতিষ্ঠান বাছাই হলো, নিয়োগ কবে শুরু হবে এবং কোন পদ্ধতিতে কর্মী পাঠানো হবে, প্রকাশের দিন পর্যন্ত তা স্পষ্ট নয়। bdnews24.com-এর প্রতিবেদনে এই অনিশ্চয়তার কথাই বলা হয়েছে; FWCMS-এর নিজস্ব বর্ণনা বলছে, প্ল্যাটফর্মটি বিদেশি কর্মী নিয়োগের আবেদন ও লেনদেনকে অনলাইনে সমন্বিত করে।
এই জায়গায় প্রথম সতর্কতা জরুরি: ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ মানেই সিন্ডিকেট প্রমাণিত—এ কথা বলা যাবে না। একটি সীমিত তালিকা কখনো মান যাচাই, সক্ষমতা নিশ্চিত করা বা পরীক্ষামূলকভাবে বাজার চালুর উপায় হতে পারে। কিন্তু একই তালিকা যদি অপ্রকাশ্য মানদণ্ডে তৈরি হয়, অন্য যোগ্য এজেন্সির প্রবেশ আটকে দেয় এবং কাজের আদেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত করে, তখন সেটিই কার্টেল বা সিন্ডিকেটের কাঠামো তৈরি করতে পারে। তাই প্রশ্নটি ‘২৫ কেন’ নয়; প্রশ্ন হলো—‘এই ২৫ কারা, কীভাবে এবং কত দিনের জন্য?’
বাজার খোলার বাস্তব সুযোগ
বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়া শুধু আরেকটি গন্তব্য নয়। নির্মাণ, উৎপাদন, সেবা ও প্ল্যান্টেশন খাতে দেশটি দীর্ঘদিন বাংলাদেশি কর্মীদের বড় বাজার। ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার পুনরায় খোলার অনুরোধ জানান। দুই দেশের নেতা তখন নিয়োগে স্বচ্ছতা ও কর্মীকল্যাণ নিশ্চিত করার কথা বলেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সাল থেকে ঋণদাসত্ব ও জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ থেকে নিয়োগ সীমিত ছিল।
নিয়োগ সত্যিই শুরু হলে তার তিনটি সরাসরি সুফল আছে। প্রথমত, দেশে কর্মসংস্থানের চাপ কিছুটা কমবে। দ্বিতীয়ত, বৈধ পথে কর্মী গেলে অনিয়মিত অভিবাসন ও প্রতারণার ঝুঁকি কমতে পারে। তৃতীয়ত, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়োগকর্তা, কোটা, ভিসা ও কর্মীর নথি একসঙ্গে যাচাই করা গেলে জাল জব-অর্ডার ঠেকানোও সম্ভব।
কিন্তু প্রযুক্তি নিজে স্বচ্ছতা তৈরি করে না। একটি ডিজিটাল দরজার চাবি যদি অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, তবে কাগজের সিন্ডিকেট শুধু অনলাইনে স্থানান্তরিত হয়। FWCMS-এ নাম থাকা তাই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন হতে পারে; এটি ন্যায্য প্রতিযোগিতা বা কর্মীর সুরক্ষার নিশ্চয়তা নয়।
‘সীমিত এজেন্সি’ শুনলেই সন্দেহ কেন
সন্দেহের পেছনে বাংলাদেশের মালয়েশিয়া করিডরের ইতিহাস আছে। ২০১৮ সালে দুই দেশ সব লাইসেন্সধারী যোগ্য এজেন্সির জন্য বাজার উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল; তার আগে ১০ এজেন্সির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল। দ্য ডেইলি স্টারের সে সময়ের প্রতিবেদনে ওই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট পাওয়া যায়। পরে আবার সীমিত এজেন্সিভিত্তিক ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ব্যয়, ভুয়া নিয়োগকর্তা এবং চাকরি না পাওয়ার অভিযোগ সামনে আসে।
সমস্যাটি বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক হলো অভিবাসন ব্যয়। বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া করিডর নিয়ে Winrock International-এর গবেষণায় ২০২১ সালের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কর্মীদের গড় নিয়োগ ব্যয় ছিল প্রায় ৩,৯০০ ডলার, যেখানে G2G Plus ব্যবস্থার পরিকল্পিত সীমা ছিল ৪২০ ডলার; গড় মাসিক আয় ছিল প্রায় ২৫০ ডলার। গবেষণায় আরও দেখা যায়, ৮০ শতাংশ উত্তরদাতার প্রথম যোগাযোগ ছিল দালালের সঙ্গে। পূর্ণ গবেষণাটি এখানে। সাম্প্রতিক আরেক গবেষণায় Verité শত শত কর্মীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রায় ৫,০০০ ডলার ব্যয় এবং বহু ঋণের কথা জানিয়েছে—যা কম মজুরির কর্মীকে শোষণ ও জোরপূর্বক শ্রমের ঝুঁকিতে ঠেলে দেয়। Verité-এর গবেষণা-সারাংশ।
এই ইতিহাস দেখায়, বাজারে এজেন্সির সংখ্যা কমলে কয়েকটি স্তরে ‘রেন্ট’ বা অস্বাভাবিক মুনাফা তৈরির সুযোগ বাড়ে। তালিকার বাইরে থাকা লাইসেন্সধারী এজেন্সি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে কর্মী বা জব-অর্ডার ‘বিক্রি’ করতে পারে; জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের দালালরা কর্মীর কাছ থেকে নগদ অর্থ নিতে পারে; আর কর্মীর প্রকৃত নিয়োগকর্তা ও কাজের তথ্য আড়ালে থাকতে পারে। প্রতিটি স্তরের কমিশন শেষ পর্যন্ত কর্মীর ঋণে যোগ হয়।
আগের সংকট কেবল বেশি খরচের ছিল না
২০২৪ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশি কর্মীদের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানান। তাদের কাছে আসা তথ্যে ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে নিয়োগ, অতিরিক্ত ফি, ঋণদাসত্ব এবং মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়ার অভিযোগ ছিল। চাকরি না পেয়ে অনেক কর্মী অনিয়মিত অবস্থায় পড়েন; এতে গ্রেপ্তার, আটক, বহিষ্কার ও আরও শোষণের ঝুঁকি তৈরি হয়। এগুলো অভিযোগ হিসেবে উত্থাপিত হলেও সমস্যার ব্যাপ্তি বোঝাতে যথেষ্ট গুরুতর। OHCHR-এর বিবৃতি।
এ কারণেই নতুন ব্যবস্থার সাফল্য ‘কতজন গেলেন’ দিয়ে মাপা বিপজ্জনক। সঠিক সূচক হবে: কতজন যাচাই করা চাকরিতে গেলেন, কর্মী কত টাকা দিলেন, কত মাসে ঋণ শোধ হলো, চুক্তির মজুরি পেলেন কি না এবং অভিযোগ করলে প্রতিকার মিলল কি না। শুধু দ্রুত কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য অতীতের ভুল পুনরাবৃত্তি করতে পারে।
যে তথ্যগুলো এখনই প্রকাশ করা দরকার
বর্তমান উদ্যোগকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারকে অন্তত সাতটি বিষয়ে প্রকাশ্য উত্তর দিতে হবে।
১. বাছাইয়ের মানদণ্ড: ২৫টি এজেন্সির আর্থিক সক্ষমতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা, অভিযোগের ইতিহাস, কমপ্লায়েন্স স্কোর ও নির্বাচনের নম্বর প্রকাশ করতে হবে।
২. মালিকানা ও স্বার্থের সম্পর্ক: নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিক, পরিচালক এবং অন্য এজেন্সির সঙ্গে সম্পর্ক প্রকাশ করা জরুরি। একই গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠান ভিন্ন নামে তালিকায় থাকলে প্রতিযোগিতা কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়।
৩. তালিকার মেয়াদ ও প্রবেশপথ: তালিকাটি স্থায়ী, পরীক্ষামূলক নাকি ঘূর্ণায়মান—তা জানাতে হবে। নির্দিষ্ট মান পূরণকারী অন্য লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের আবেদন ও আপিলের সুযোগ থাকতে হবে।
৪. যাচাই করা চাকরির নিবন্ধন: প্রতিটি জব-অর্ডারে মালয়েশীয় নিয়োগকর্তা, কর্মস্থল, খাত, পদ, মজুরি, ওভারটাইম, আবাসন, চুক্তির মেয়াদ ও অনুমোদিত কর্মীসংখ্যা একটি জনসাধারণের যাচাইযোগ্য রেজিস্ট্রিতে দিতে হবে। কর্মী যেন পাসপোর্ট নম্বর বা আবেদন আইডি দিয়ে নিজের চাকরি যাচাই করতে পারেন।
৫. একক মোট ব্যয়: মেডিকেল, প্রশিক্ষণ, ভিসা, বিমানভাড়া, এজেন্সি সেবা ও অন্যান্য সব খরচ মিলিয়ে কর্মীকে কত দিতে হবে—একটি সর্বমোট অঙ্কে প্রকাশ করতে হবে। ILO-এর ন্যায্য নিয়োগ নীতি বলছে, কর্মীর ওপর নিয়োগ ফি ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় চাপানো উচিত নয়। ILO-এর নীতিবিবৃতি।
৬. ডিজিটাল অর্থপ্রদান ও রসিদ: নগদ টাকা ও দালালনির্ভর লেনদেন বন্ধ করে ব্যাংক বা অনুমোদিত ডিজিটাল চ্যানেলে প্রতিটি পেমেন্ট নিতে হবে। এক টাকারও ‘রসিদবিহীন’ ব্যয় বৈধ ধরা যাবে না।
৭. ক্ষতিপূরণ ও অভিযোগ: চাকরি না থাকলে, চুক্তি বদলে গেলে বা ভিসা ব্যর্থ হলে কত দিনে অর্থ ফেরত মিলবে—তার বাধ্যতামূলক বিধান দরকার। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় যৌথ হটলাইন, বাংলা ভাষায় অভিযোগ এবং সময়সীমাবদ্ধ নিষ্পত্তি থাকতে হবে। এজেন্সির পারফরম্যান্স বন্ড থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
২৫-এর বিকল্প কী হতে পারে
বাজারকে রাতারাতি সব এজেন্সির জন্য খুলে দিলেই অনিয়ম দূর হবে না। অযোগ্য প্রতিষ্ঠান ও দালালও ঢুকে পড়তে পারে। তাই ‘মাত্র ২৫’ বনাম ‘সবাই’—এই দুই চরম বিকল্পের বাইরে নীতিগত পথ আছে।
প্রথমত, প্রকাশ্য মানদণ্ড পূরণকারী সব এজেন্সিকে প্রাক্যোগ্যতা দেওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, যাচাই করা জব-অর্ডার একটি কেন্দ্রীয় পুলে রেখে স্বচ্ছ অ্যালগরিদম, লটারি বা ঘূর্ণায়মান ব্যবস্থায় এজেন্সি বরাদ্দ করা যায়। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান BOESL-কে কম-ব্যয়ের মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক চ্যানেল হিসেবে রাখা যায়। চতুর্থত, প্রতি মাসে এজেন্সিভিত্তিক কর্মীসংখ্যা, গড় ব্যয়, অভিযোগ, ফেরত অর্থ ও শাস্তির তথ্য প্রকাশ করা দরকার। এতে প্রতিযোগিতা থাকবে গোপন যোগাযোগে নয়, সেবার মান ও কম ব্যয়ে।
শেষ কথা: তালিকা নয়, ব্যবস্থাই রায় দেবে
২৫টি এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খোলার প্রথম দৃশ্যমান পদক্ষেপ। এটি কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সীমিত এজেন্সির ব্যবস্থা যখন অস্বচ্ছ নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সুযোগের মূল্য কর্মীকেই ঋণ, জমি বিক্রি এবং বছরের পর বছর কম মজুরিতে দিতে হয়।
এখনই ‘পুরোনো সিন্ডিকেট ফিরে এসেছে’—এমন চূড়ান্ত রায় দেওয়ার প্রমাণ নেই। একইভাবে ‘বাজার খুলেছে, সব ঠিক’ বলারও ভিত্তি নেই। সরকার যদি নির্বাচনের স্কোর, মালিকানা, চাকরির তালিকা, মোট ব্যয় ও অর্থপ্রবাহ প্রকাশ করে এবং যোগ্য অন্য প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ খোলা রাখে, তবে ২৫টি এজেন্সি একটি সীমিত কিন্তু নিয়ন্ত্রিত সূচনা হতে পারে। আর যদি এই তথ্যগুলো গোপন থাকে, কাজের আদেশ কেনাবেচা হয় এবং কর্মীর খরচ আবার কয়েক গুণ বেড়ে যায়, তাহলে নাম নতুন হলেও কাঠামোটি হবে পুরোনো সিন্ডিকেটেরই পুনরাবৃত্তি।
বাংলাদেশের সাফল্য তাই কত দ্রুত বিমান ভরে কর্মী পাঠানো গেল—সেটিতে নয়। সাফল্য হবে যখন একজন কর্মী দালাল ছাড়া চাকরি যাচাই করতে পারবেন, ঘোষিত অঙ্কের বাইরে এক টাকাও দেবেন না, মালয়েশিয়ায় নেমে ঠিক সেই কাজটি পাবেন এবং অভিযোগ করলে দুই রাষ্ট্রের কাছেই প্রতিকার পাবেন। শ্রমবাজার খোলার আসল অর্থ সেটিই।
আপনার মতামত জানানঃ