‘আগামীকাল যেন ঘুম থেকে না উঠি’—যুদ্ধের ময়দানে থাকা একজন মার্কিন নাবিকের কাছ থেকে স্ত্রীর কাছে আসা এমন একটি বার্তা শুধু ব্যক্তিগত হতাশার প্রকাশ নয়, বরং দীর্ঘদিন সমুদ্রে মোতায়েন থাকা একটি পুরো যুদ্ধজাহাজের ভেতরের গভীর সংকটের ইঙ্গিত। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের প্রায় পাঁচ হাজার নাবিক ও সেনাসদস্য এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে যুদ্ধের ঝুঁকির পাশাপাশি ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও বড় হয়ে উঠেছে।
সান ডিয়েগোতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক টাউন হল সভায় নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা মার্কিন নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে তাঁদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাওসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা। প্রায় ২০০ মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় এক নাবিকের স্ত্রী জানান, সভার দিনই তাঁর স্বামীর কাছ থেকে এমন একটি বার্তা পেয়েছেন, যাতে তিনি লিখেছেন—পরদিন যেন তাঁর ঘুম আর না ভাঙে। এমন বক্তব্যের পরও কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো তাৎক্ষণিক উত্তর না পাওয়ায় পরিবারের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
নৌবাহিনী অবশ্য দাবি করেছে, যুদ্ধজাহাজে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। পরামর্শক, চ্যাপলিন, চিকিৎসক এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে তারা। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন হলো, যখন একটি জাহাজের কয়েক হাজার মানুষ মাসের পর মাস সমুদ্রে অবস্থান করছেন এবং তাঁদের ফেরার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই, তখন বিদ্যমান সহায়তা ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর?
আব্রাহাম লিংকনের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সময়ের দীর্ঘতা। গত নভেম্বর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে সান ডিয়েগো ছাড়ে রণতরিটি। পরে পরিস্থিতির পরিবর্তনে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়। গত জানুয়ারিতে এটি সেখানে পৌঁছানোর পর থেকে আরব সাগরেই অবস্থান করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মে মাসে মিশন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা আর হয়নি। ফলে ক্রুরা আট মাসেরও বেশি সময় ধরে মোতায়েন অবস্থায় রয়েছেন।
এর মধ্যে প্রায় ৪০ দিন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে নৌবাহিনী। সব মিলিয়ে সমুদ্রে টানা প্রায় ২৫০ দিন পার করার অভিজ্ঞতা তাঁদের জন্য এক নজিরবিহীন ধকল তৈরি করেছে। সামরিক দায়িত্বে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু একটি মোতায়েন কখন শেষ হবে, তা যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন সময়ের চাপ ধীরে ধীরে মানসিক চাপেও রূপ নিতে পারে।
নাবিকদের পরিবার ও দায়িত্বে থাকা কয়েকজনের বক্তব্যে সেই চাপেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, ডাকযোগাযোগে সমস্যা এবং খাদ্য ও পানির সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। একপর্যায়ে এমনও হয়েছে যে খাবার রেশন করে দিতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে লন্ড্রির সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। যদিও পরবর্তী সময়ে এসব সমস্যার বড় অংশ সমাধান হয়েছে বলে নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
সাগরে থাকা একটি বিমানবাহী রণতরির জীবন সাধারণ মানুষের কল্পনার চেয়েও কঠিন। প্রতিদিন একই জাহাজ, একই পরিবেশ, নির্ধারিত দায়িত্ব, সীমিত ব্যক্তিগত পরিসর এবং সব সময় যুদ্ধের সম্ভাবনা—সবকিছু মিলিয়ে মানসিক চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সাধারণত দীর্ঘ মোতায়েনের সময় নাবিকদের বিশ্রাম ও রসদ সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর বন্দরে যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়। কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ছিল।
জুলাইয়ের শুরুতে ওমানের একটি বন্দরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি নাবিকদের জন্য কিছুটা স্বস্তি নিয়ে আসে। কয়েক মাস পর তাঁরা তাজা ফল ও সবজি পাওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু সেখানেও অনেক নাবিককে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা এলাকার বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এর আগে ডিসেম্বর মাসে গুয়ামে সংক্ষিপ্ত বিরতি হলেও অনেক নাবিক তখন তীরে নামতে পারেননি বলে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
ফলে বন্দরে যাওয়া বা বিশ্রামের সুযোগের চেয়েও এখন তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি বিষয়—কবে বাড়ি ফিরবেন, সেই নিশ্চয়তা। এক নাবিকের ভাষায়, তাঁরা আর কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছেন না; শুধু দেশে ফেরার একটি নির্দিষ্ট তারিখ জানতে চান। এই আকুতি আসলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েনের সবচেয়ে বড় মানসিক সমস্যাটিকেই সামনে আনে। একজন মানুষ জানেন না তাঁর বর্তমান পরিস্থিতি আর কতদিন চলবে। প্রতিটি নতুন দিন তাই শুধু দায়িত্বের আরেকটি দিন নয়, বরং অনিশ্চয়তারও আরেকটি দিন।
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে পরিস্থিতির আরও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের একজন জানিয়েছেন, তিনি নিজের স্বামীকে চোখের সামনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখছেন। আরেক অভিভাবক সামরিক সংবাদমাধ্যমকে লিখেছেন, তাঁর ছেলে এবং সহকর্মীরা স্বস্তি পাওয়ার জন্য জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভাবছেন—এমন কথা একজন বাবার জন্য কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
এমন একটি ঘটনা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। নাবিকদের কয়েকজন জানিয়েছেন, এক ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে আটকাতে হয়েছিল। ঘটনাটি জাহাজের লাউডস্পিকারে জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এ নির্দিষ্ট ঘটনার বিষয়ে মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তারা বরং বলেছে, নাবিকদের পাশে দাঁড়াতে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ। দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকা একজন নাবিকের জন্য পরিবার থেকে পাওয়া একটি চিঠি, ফোনকল বা বার্তা অনেক সময় মানসিকভাবে টিকে থাকার বড় অবলম্বন হতে পারে। কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের ক্ষেত্রে ডাক যোগাযোগেও বিঘ্ন ঘটেছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত রসদ সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে বলে নৌবাহিনী জানিয়েছে। ফলে খাবার, স্বাস্থ্যসামগ্রী এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে ডাক বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ পিছিয়ে গেছে।
নৌবাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাহাজে পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা রয়েছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সচল এবং খাবারে প্রয়োজনীয় আমিষও দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ সরবরাহ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। কিন্তু শারীরিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি মানসিক ক্লান্তির যে স্তর তৈরি হয়েছে, সেটি শুধু খাবার বা পানি সরবরাহ বাড়িয়ে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।
সামরিক গবেষণাতেও দীর্ঘ মোতায়েনের এই মানসিক চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে ‘মিলিটারি মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার ও উভচর যুদ্ধজাহাজে কর্মরত ৯৫৬ জন নাবিকের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রামের সুযোগ না পাওয়া এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগকে মানসিক চাপের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যা এবং মানসিক চাপ কমানোর সুযোগের অভাবও বড় উদ্বেগ হিসেবে উঠে আসে।
আব্রাহাম লিংকনের পরিস্থিতির সঙ্গে এসব পর্যবেক্ষণের মিল রয়েছে। এখানে যুদ্ধের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ মোতায়েনের ক্লান্তি। একজন নাবিককে শুধু শত্রুর সম্ভাব্য হামলার কথা মাথায় রেখেই কাজ করতে হচ্ছে না; তাঁকে একই সঙ্গে ভাবতে হচ্ছে পরিবার, সন্তান, বাড়ি এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা। আর যখন দেশে ফেরার কোনো নির্দিষ্ট দিন সামনে থাকে না, তখন অপেক্ষাটাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় মানসিক বোঝা।
দীর্ঘদিন মার্কিন নৌবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত চিফ পেটি অফিসার থমাস নাটজম্যানের বক্তব্যও এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, একটি মোতায়েন কখন শেষ হবে তা না জানা নাবিকদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি করে। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, সেখানে সপ্তাহের দিনের আলাদা কোনো অনুভূতি থাকে না—প্রতিটি দিন যেন একই রকম। একজন মানুষ নিজের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু সেই চেষ্টা অনন্তকাল চালিয়ে যাওয়া কঠিন।
আব্রাহাম লিংকনের বর্তমান সংকট তাই শুধু একটি যুদ্ধজাহাজের সমস্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি আধুনিক যুদ্ধের একটি বড় মানবিক বাস্তবতাও সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সক্ষমতা, অস্ত্র, বিমান ও জাহাজের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই সব ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকা মানুষগুলোর মানসিক সক্ষমতা কতটা টেকসই, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন নৌবাহিনী যদি দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনকে ভবিষ্যতের সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে ধরে নেয়, তাহলে শুধু যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা নয়, নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য, বিশ্রাম, পরিবার-যোগাযোগ এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘরে ফেরার ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ক্লান্ত একজন নাবিক শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো জাহাজের নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকতে পারেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই যুদ্ধজাহাজটি কত দিন সমুদ্রে থাকবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—একজন মানুষকে কত দিন পর্যন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে তার কাছ থেকে একই মাত্রার দায়িত্ব, সতর্কতা ও মানসিক দৃঢ়তা প্রত্যাশা করা যায়?
আব্রাহাম লিংকনের নাবিকেরা এখন যুদ্ধের মাঝখানে শুধু শত্রুর মোকাবিলা করছেন না; তাঁরা সময়, ক্লান্তি, বিচ্ছিন্নতা এবং অনিশ্চয়তার সঙ্গেও লড়ছেন। তাঁদের পরিবারের কাছে তাই একটি বন্দরের বিরতি নয়, একটি খাবারের সরবরাহ নয়, এমনকি কোনো বিশেষ সুবিধাও নয়—সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে একটি নির্দিষ্ট উত্তর: কবে তাঁরা বাড়ি ফিরবেন?
সেই উত্তর যত দীর্ঘ সময় অজানা থাকবে, ততই বাড়তে পারে ক্লান্তি ও হতাশার চাপ। আর যুদ্ধের বাইরে থেকেও এই প্রশ্নটি তখন ক্রমেই বড় হয়ে উঠবে—একটি সামরিক মিশন সফল করতে গিয়ে তার সঙ্গে থাকা মানুষগুলোর মানসিক মূল্য কতটা দেওয়া হচ্ছে?
আপনার মতামত জানানঃ