
ভোলার কোনো চর নদীতে হারিয়ে গেলে, সাতক্ষীরার জমিতে লবণ উঠে এলে কিংবা কুড়িগ্রামে বারবার বন্যায় ঘর ভেঙে গেলে মানুষ প্রথমে নতুন বাঁধ, নতুন ফসল অথবা কাছের কোনো নিরাপদ গ্রামে টিকে থাকার চেষ্টা করে। সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে পরিবারটি জেলা শহরে যায়। সেখানেও কাজ না মিললে শেষ ভরসা হয়ে ওঠে ঢাকা।
এই যাত্রা সাধারণত একদিনে ঘটে না। একটি ঘূর্ণিঝড়, একটি বন্যা বা একটি নদীভাঙন কাউকে স্থানচ্যুত করতে পারে; কিন্তু স্থায়ীভাবে গ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্ত তৈরি হয় জমি হারানো, ঋণ, ফসলের ক্ষতি, কাজের অভাব এবং পুনর্বাসনের ব্যর্থতার সম্মিলিত চাপে। ফলে যাঁরা ঢাকায় এসে রিকশা চালান, নির্মাণশ্রমিক হন কিংবা গৃহকর্মে যোগ দেন, তাঁদের পরিচয়ে জলবায়ু সংকটের ছাপ থাকলেও সরকারি নথিতে তাঁরা প্রায়ই কেবল ‘গ্রাম থেকে আসা দরিদ্র মানুষ’।
এই অদৃশ্যতাই বাংলাদেশের পরবর্তী নগর সংকটের সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ মানুষ শহরে পৌঁছাচ্ছে, কিন্তু নগর পরিকল্পনায় তাদের আগমন এখনো একটি ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হচ্ছে—ভবিষ্যতের স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে নয়।
সংখ্যার ভেতরে যে সতর্কবার্তা
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বা IOM-এর ২০২৫ সালের প্রথম দেশব্যাপী হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বর্তমানে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৯ লাখ ৫৬ হাজার। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন মডেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীর সংখ্যা ১ কোটি ৩৩ লাখ থেকে প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
এই সংখ্যাগুলোর মধ্যে পার্থক্য বিভ্রান্তি নয়; বরং মডেল, সময়সীমা, জলবায়ু পরিস্থিতি ও ‘অভিবাসী’ সংজ্ঞার পার্থক্যের ফল। এগুলো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণীও নয়। কিন্তু একটি বিষয়ে সব হিসাবই একমত—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও কৃষি উৎপাদনের সংকট বাংলাদেশের ভেতরে বড় আকারের জনস্থানান্তর ঘটাবে।
এই মানুষদের সবাই ঢাকায় আসবেন না। কেউ কাছের গ্রাম, জেলা শহর, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী কিংবা অন্য কোনো নগরে আশ্রয় নেবেন। কিন্তু কাজ, হাসপাতাল, শিক্ষা, পরিবহন ও পরিচিত মানুষের নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ায় ঢাকা এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী আকর্ষণকেন্দ্র। অর্থাৎ জলবায়ু অভিবাসনের জাতীয় চাপের একটি অসম অংশ শেষ পর্যন্ত রাজধানীকেই বহন করতে হতে পারে।
আশ্রয় দেয় যে শহর, ঝুঁকিও তৈরি করে সেই শহর
গ্রামে জীবিকা হারানো মানুষের কাছে ঢাকা সুযোগের শহর। এখানে দৈনিক মজুরির কাজ আছে, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি আছে এবং একই এলাকার আগে আসা মানুষের সহায়তা পাওয়া যায়। কিন্তু শহরে পৌঁছানোর পর তাঁদের বড় অংশ এমন জায়গায় বসতি গড়েন, যেখানে জমির দাম কম অথবা দখল করে থাকা সম্ভব—খালপাড়, রেললাইনের ধারে, নিচু জমি এবং ঘন বস্তি।
ফলে জলবায়ু ঝুঁকি থেকে পালিয়ে তাঁরা নতুন জলবায়ু ও নগর ঝুঁকির মধ্যে প্রবেশ করেন। বর্ষায় জলাবদ্ধতা, গ্রীষ্মে অতিরিক্ত তাপ, অগ্নিকাণ্ড, দূষিত পানি, অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন এবং উচ্ছেদের ভয় তাঁদের নিত্যসঙ্গী হয়। গ্রামের ঘর নদীতে হারানোর পর ঢাকার অনিরাপদ বসতিতে আবার ঘর হারানোর এই চক্রকে কি সত্যিই পুনর্বাসন বলা যায়?
২০২৫ সালে কড়াইল বস্তির অগ্নিকাণ্ড হাজারো মানুষকে নতুন করে গৃহহীন করেছিল। সরু রাস্তা ও যানজটের কারণে দমকলকর্মীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সমস্যা হয়। ঘটনাটি দেখিয়েছে, শহরের শ্রমবাজার যাঁদের ওপর নির্ভর করে, তাঁদের আবাসন কতটা ভঙ্গুর। জলবায়ু অভিবাসীদের বড় অংশ যদি একই ধরনের অনানুষ্ঠানিক বসতিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, তবে একটি দুর্যোগ থেকে বাঁচতে এসে তাঁরা আরেক ধরনের দুর্যোগের স্থায়ী বাসিন্দা হবেন।
ঢাকার সক্ষমতার পাঁচটি দুর্বল জায়গা
প্রথম সংকট আবাসন। ঢাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিকল্পিত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ভাড়াবাসের সরবরাহ অত্যন্ত সীমিত। সরকারি আবাসন প্রকল্পের বড় অংশ মধ্যবিত্ত কিংবা স্থায়ী চাকরিজীবীদের নাগালে থাকলেও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের আয়, পরিচয়পত্র ও জামানতের বাস্তবতার সঙ্গে সেগুলোর মিল নেই। ফলে বস্তি শুধু দারিদ্র্যের ফল নয়; সাশ্রয়ী আবাসন নীতির অনুপস্থিতিরও ফল।
দ্বিতীয় সংকট কাজ। শহর নতুন মানুষকে কাজ দেয়, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা অস্থায়ী, অনিরাপদ এবং সামাজিক সুরক্ষাহীন। রিকশা চালানো, নির্মাণকাজ, ক্ষুদ্র বিক্রি, পরিচ্ছন্নতা বা গৃহকর্মে অসুস্থতার দিন মানেই আয় বন্ধ। অতিরিক্ত তাপের কারণে বাইরে কাজের সময় কমে গেলে এই শ্রমিকেরাই প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হন। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন তাঁদের গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করে, আবার শহরে এসে সেই একই পরিবর্তনের তাপ ও রোগ তাঁদের আয় কমায়।
তৃতীয় সংকট পানি ও পয়োনিষ্কাশন। ঢাকার জনসংখ্যা যত বাড়ে, নিরাপদ পানি, নালা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শৌচাগারের ওপর চাপ তত বাড়ে। অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বৈধ সংযোগ না থাকায় পানি কিনতে দরিদ্র মানুষকে অনেক সময় তুলনামূলক বেশি খরচ করতে হয়। জলাবদ্ধতার সময় পয়োবর্জ্য ও পানির মিশ্রণ ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
চতুর্থ সংকট স্বাস্থ্য ও তাপ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ঢাকার তাপসূচক জাতীয় গড়ের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। ঘন টিনের ঘর, গাছের অভাব এবং খোলা জায়গা না থাকায় দরিদ্র বসতিগুলো শহরের গরমের সবচেয়ে কঠিন অংশ বহন করে। শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য এটি শুধু অস্বস্তি নয়—স্বাস্থ্য ও আয়ের সরাসরি হুমকি।
পঞ্চম সংকট প্রশাসনিক অদৃশ্যতা। জলবায়ু অভিবাসীদের আলাদা পরিচয় ও প্রয়োজন নিয়ে নিয়মিত নগর তথ্যভান্ডার নেই। কে কোথা থেকে এলেন, কেন এলেন, কোথায় থাকছেন, কী দক্ষতা আছে এবং কোন সেবা দরকার—এসব তথ্য ছাড়া পরিকল্পনা হয় অনুমানের ওপর। আর নাগরিক পরিচয় বা ঠিকানার জটিলতার কারণে অনেকে সামাজিক সুরক্ষা, স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবার পূর্ণ সুযোগও পান না।
ঢাকা কি নিজেই জলবায়ু নিরাপদ?
ঢাকাকে প্রায়ই গ্রামের বিপরীতে একটি ‘নিরাপদ’ গন্তব্য হিসেবে কল্পনা করা হয়। বাস্তবে রাজধানী নিজেই বন্যা, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, পানি সংকট ও দূষণের ঝুঁকিতে আছে। জলাভূমি ভরাট, খাল দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং দুর্বল নিষ্কাশনব্যবস্থা বৃষ্টিকে নগর দুর্যোগে রূপ দেয়।
নতুন কয়েক লাখ মানুষ যোগ হলেই সংকট তৈরি হবে—বিষয়টি এত সরল নয়। ঢাকার বর্তমান অবকাঠামো ইতিমধ্যেই অসম ও অতিরিক্ত চাপে আছে। নতুন অভিবাসীরা বরং পুরোনো ব্যর্থতাগুলোকে দৃশ্যমান করে তুলবেন। তাঁদের দায়ী করলে আসল প্রশ্ন আড়ালে থাকবে: কেন বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষা এত প্রবলভাবে একটি শহরে কেন্দ্রীভূত?
তাই জলবায়ু অভিবাসনকে শুধু ঢাকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা হিসেবে দেখলে সমাধান হবে না। মানুষকে শহরে আসা থেকে আটকানো নৈতিকও নয়, বাস্তবসম্মতও নয়। প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যাতে স্থানান্তর বাধ্যতামূলক বিপর্যয় না হয়ে পরিকল্পিত অভিযোজনের পথ হতে পারে।
সমাধান শুধু ঢাকাকে বড় করা নয়
প্রথম কাজ হতে হবে উৎস এলাকায় মানুষের থাকার সক্ষমতা বাড়ানো। উপকূলে লবণসহিষ্ণু কৃষি, নিরাপদ পানি, টেকসই বাঁধ, নদীভাঙন এলাকায় দ্রুত পুনর্বাসন, দুর্যোগবিমা এবং বিকল্প কাজের সুযোগ থাকলে সবাইকে জীবিকা বাঁচাতে রাজধানীতে ছুটতে হবে না। তবে কিছু মানুষের স্থানান্তর অনিবার্য হবে—এই সত্যও নীতিতে স্বীকার করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, যশোর, কুমিল্লা, রংপুরসহ মাঝারি শহরগুলোকে জলবায়ু-সহনশীল ও অভিবাসীবান্ধব কর্মসংস্থানকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিল্প, প্রশিক্ষণ, হাসপাতাল, শিক্ষা ও পরিবহনের বিনিয়োগ বিকেন্দ্রীকরণ না হলে ‘ঢাকামুখী স্রোত কমানো’ শুধু স্লোগান হয়েই থাকবে। কাছাকাছি একটি শহরে সম্মানজনক কাজ পাওয়া গেলে একটি পরিবারকে শত শত কিলোমিটার দূরে ঢাকা আসতে হবে না।
তৃতীয়ত, ঢাকায় সাশ্রয়ী ভাড়াবাসকে অবকাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বহুতল সামাজিক ভাড়াবাস, নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং কর্মস্থলের সঙ্গে সুলভ গণপরিবহন যুক্ত না হলে বস্তি উচ্ছেদ করে সমস্যাকে কেবল এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় সরানো হবে। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষকে দ্বিতীয়বার বাস্তুচ্যুত করে।
চতুর্থত, নগরের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে স্থানান্তরযোগ্য করতে হবে। একজন মানুষ সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় এলে তাঁর খাদ্য, স্বাস্থ্য বা শিশু শিক্ষার অধিকার যেন পুরোনো ঠিকানায় আটকে না থাকে। দক্ষতা যাচাই, স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ, শ্রমিক নিবন্ধন এবং দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যবিমা নতুন বাসিন্দাদের অনানুষ্ঠানিকতার ফাঁদ থেকে বের করতে পারে।
সবশেষে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য ও একক সমন্বয়। জলবায়ু, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার, আবাসন, শ্রম ও সমাজকল্যাণ—এতগুলো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আলাদা থাকলে মানুষ মাঝখানে হারিয়ে যায়। কোথায় মানুষ আসছে এবং কোন সেবায় কত চাপ পড়ছে, তা নিয়মিতভাবে প্রকাশ না করলে সংকট দৃশ্যমান হবে শুধু বস্তিতে আগুন লাগলে কিংবা জলাবদ্ধতায় মৃত্যু হলে।
মানুষ সমস্যা নয়, অপরিকল্পিত শহরই সমস্যা
জলবায়ু উদ্বাস্তু শব্দটি মানুষের অসহায়ত্ব বোঝায়, কিন্তু তাঁদের শুধু বোঝা হিসেবে দেখার ঝুঁকিও তৈরি করে। বাস্তবে এই মানুষরাই ঢাকার ভবন নির্মাণ করেন, পোশাক কারখানায় কাজ করেন, রিকশা চালান, বাসাবাড়ি ও রাস্তা পরিচ্ছন্ন রাখেন এবং শহরের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে সচল করেন। শহর তাঁদের শ্রম গ্রহণ করে, কিন্তু নিরাপদ বাসস্থান ও নাগরিক অধিকার দিতে কুণ্ঠিত হয়।
ঢাকা নতুন মানুষের জন্য প্রস্তুত কি না—এই প্রশ্নের সৎ উত্তর হলো, বর্তমান কাঠামোয় নয়। কিন্তু সংকট অনিবার্যও নয়। ভবিষ্যতের জনস্থানান্তর এখন থেকেই মানচিত্রে আনলে, মাঝারি শহরে বিনিয়োগ করলে এবং ঢাকার আবাসন ও সেবা ব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করলে অভিবাসনকে মানবিক বিপর্যয় থেকে অভিযোজনের সুযোগে রূপ দেওয়া সম্ভব।
প্রশ্নটি তাই মানুষ ঢাকায় আসবে কি না, সেটি নয়। মানুষ ইতিমধ্যেই আসছে। প্রশ্ন হলো, আমরা তাঁদের খালপাড়ের অনিরাপদ ঘর, অদৃশ্য শ্রম এবং পরবর্তী উচ্ছেদের দিকে ঠেলে দেব—নাকি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নগরবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পরিকল্পনায় জায়গা করে দেব।
ঢাকা যদি সেই সিদ্ধান্ত এখন না নেয়, তবে জলবায়ু সংকট একদিন শুধু উপকূলের ডুবে যাওয়া জমির গল্প থাকবে না। সেটি রাজধানীর প্রতিটি বস্তি, হাসপাতাল, পানির লাইন, যানবাহন এবং শ্রমবাজারের প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠবে।
আপনার মতামত জানানঃ