
একটি সরকার সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করছে কি না, তা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় কেবল কতটি পত্রিকা বন্ধ হয়েছে বা কতজন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছেন—এই হিসাব নয়। দেখতে হয় কোন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে না, কোন প্রশ্ন সংবাদ সম্মেলনে করা যাচ্ছে না, কোন সাংবাদিক মামলা বা হামলার আশঙ্কায় নিজেই ভাষা বদলে ফেলছেন এবং কোন প্রতিষ্ঠানের মালিক জানেন যে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে তাঁর অন্য ব্যবসা বিপদে পড়তে পারে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সংকট অনেক সময় প্রকাশিত সংবাদের চেয়ে অপ্রকাশিত সংবাদের ভেতর বেশি দৃশ্যমান।
বাংলাদেশে সরকার বদলের পর সংবাদমাধ্যমের পরিবেশে কিছু বাস্তব পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় দেখা দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ, কেন্দ্রীয়ভাবে সংবাদ নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নির্বিচার ব্যবহারের মতো কিছু চর্চা আগের মাত্রায় দেখা যাচ্ছে না। পুরোনো সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে নতুন অধ্যাদেশ এবং পরে আইন করা হয়েছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার ও ক্ষমতাসীনদের সমালোচনামূলক সংবাদও প্রকাশিত হচ্ছে। এসব পরিবর্তন অস্বীকার করলে বর্তমান পরিস্থিতির ন্যায়সংগত মূল্যায়ন হবে না।
কিন্তু সরাসরি নিয়ন্ত্রণের দৃশ্যমানতা কমা আর সংবাদমাধ্যমের কাঠামোগত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া এক বিষয় নয়। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, নিয়ন্ত্রণের পুরোনো সংস্কৃতি শেষ হয়নি; বরং এর কেন্দ্র ও পদ্ধতি বদলেছে। আগে প্রধানত রাষ্ট্রীয় নির্দেশ, গোয়েন্দা সংস্থার চাপ, ডিজিটাল আইন, লাইসেন্স এবং মালিকপক্ষের রাজনৈতিক নির্ভরতা কাজ করত। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ফৌজদারি মামলা, জনতার সহিংসতা, ডিজিটাল হয়রানি, সাংবাদিকদের প্রোফাইলিং, আদালতের আদেশে বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ এখন শুধু ওপর থেকে নিচে নামে না; রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, মালিক, সংঘবদ্ধ জনতা এবং অনলাইন গোষ্ঠী—বিভিন্ন দিক থেকে একই সঙ্গে কাজ করে।
আইন বদলেছে, আইনি ভয় কি কমেছে?
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর দীর্ঘস্থায়ী ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে। Freedom House-এর মূল্যায়নে নতুন অধ্যাদেশে অনলাইন হয়রানি ও যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কিছু ইতিবাচক বিধান ছিল এবং আগের কিছু কঠোরতা কমানো হয়। কিন্তু কনটেন্ট অপসারণ, অনলাইন বক্তব্যের ফৌজদারি শাস্তি এবং নজরদারির ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ থেকে যায়।
নির্বাচনের পর নতুন সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করেছে। Committee to Protect Journalists বা CPJ-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, আইনটি আগের তিনটি ডিজিটাল আইনের কিছু মৌলিক দুর্বলতা বহন করছে—বিশেষ করে অস্পষ্ট সংজ্ঞা, সাংবাদিকতার জন্য অপর্যাপ্ত সুরক্ষা এবং দুর্বল বিচারিক তদারকি। ফলে আইনের নাম বদলালেও কোন অনলাইন বক্তব্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে, কে কনটেন্ট সরাতে নির্দেশ দিতে পারবে এবং সাংবাদিকের যন্ত্র বা উৎস কতটা সুরক্ষিত থাকবে—এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক সমাধান হয়নি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণে শুধু সাইবার আইন ব্যবহৃত হচ্ছে না। সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, দণ্ডবিধির মানহানি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত অভিযোগও সাংবাদিকতার ওপর চাপ তৈরির উপায় হতে পারে। CPJ বলছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক সাংবাদিককে এমন এফআইআরে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে শত শত ব্যক্তির নাম রয়েছে অথবা প্রথমে অজ্ঞাত আসামি রেখে পরে সাংবাদিকের নাম যোগ করা হয়েছে। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হলে এক মামলায় জামিন পেয়েও অন্য মামলায় আটক থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
Reporters Without Borders বা RSF এবং Transparency International Bangladesh-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ১৩০ জনের বেশি সাংবাদিক আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। অভিযোগের মধ্যে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অপরাধও রয়েছে; অন্তত পাঁচজন সাংবাদিক আটক রয়েছেন। সাংবাদিক অপরাধ করলে তাঁর বিচার হবে—পেশাগত পরিচয় কাউকে দায়মুক্তি দিতে পারে না। কিন্তু সংবাদ পরিবেশন, সম্পাদকীয় অবস্থান, টেলিভিশন আলোচনা বা কোনো সরকারের প্রতি কথিত সমর্থন এবং অপরাধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকে একইভাবে বিচার করা যায় না। আন্তর্জাতিক অপরাধে গণমাধ্যমকর্মীর দায় নির্ধারণের মানদণ্ড অত্যন্ত কঠোর; বিতর্কিত বা পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিকতা নিজে মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়।
এই পার্থক্য স্পষ্ট না হলে বিচার ন্যায়বিচারের বদলে রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া গুরুতর অভিযোগ ব্যবহার করা হলে আজকের সরকার আগের সরকারের দমন-পদ্ধতিকেই নতুন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে। তখন সরকার বদলায়, কিন্তু আইনের রাজনৈতিক ব্যবহার বদলায় না।
রাষ্ট্রের বাইরের নিয়ন্ত্রণও রাষ্ট্রের দায়
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তন হলো সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে সংঘবদ্ধ জনতা ও রাজনৈতিক সমর্থকদের ভূমিকা। ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের সময় সাংবাদিকেরা ভবনের ভেতরে আটকা পড়েছিলেন। দুটি প্রতিষ্ঠানকেই সাময়িকভাবে মুদ্রণ ও অনলাইন প্রকাশনা বন্ধ করতে হয়। বাংলাদেশের বড় সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে এমন হামলা শুধু সম্পত্তির ক্ষতি নয়; এটি অন্য সব সম্পাদক ও সাংবাদিকের উদ্দেশে পাঠানো একটি বার্তা—কোনো গোষ্ঠী আপনাকে শত্রু মনে করলে আপনার কার্যালয়ও নিরাপদ নয়।
CPJ ২০২৫ সালে রাজনৈতিক কর্মসূচি কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর অন্তত ১০টি সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যার বেশির ভাগের সঙ্গে বিএনপি বা এর ছাত্রসংগঠনের সদস্য বা সমর্থকদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে খুলনায় সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনায় TIB নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি দাবি করেছে। সব ঘটনার উদ্দেশ্য একই ছিল—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না। কিন্তু হামলার বিচার না হলে উদ্দেশ্য যাই হোক, ফল হয় একই: সাংবাদিকেরা ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় থেকে সরে যান এবং হামলাকারীরা বুঝে যায় সংবাদ নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রীয় পদে থাকা প্রয়োজন নেই।
এখানে সরকার প্রায়ই বলতে পারে, হামলাটি রাষ্ট্র করেনি। কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে সুরক্ষা দেওয়া, হামলা ঠেকানো এবং অপরাধীদের বিচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী সংবাদকক্ষ পুড়িয়ে প্রকাশনা বন্ধ করে দিতে পারলে এবং অপরাধের দ্রুত বিচার না হলে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তাই পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়। রাষ্ট্রের নির্দেশে সংবাদ বন্ধ হওয়া এবং রাষ্ট্রের ব্যর্থতায় জনতার হাতে সংবাদ বন্ধ হওয়ার পদ্ধতি আলাদা, কিন্তু পাঠকের তথ্য পাওয়ার অধিকারের ওপর ফল প্রায় একই।
ডিজিটাল পরিসরেও নিয়ন্ত্রণ এখন বিকেন্দ্রীভূত। সাংবাদিক, বিশেষ করে নারী সাংবাদিকেরা সমন্বিত ট্রলিং, যৌন হুমকি, চরিত্রহনন এবং রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের শিকার হন। কাউকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’, ‘ভারতের এজেন্ট’, ‘জঙ্গিবাদী’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বলে চিহ্নিত করার পর তাঁর প্রতিবেদনের তথ্য নিয়ে আলোচনা আর মুখ্য থাকে না; তাঁকে সামাজিক ও পেশাগতভাবে বিচ্ছিন্ন করাই লক্ষ্য হয়ে ওঠে। সরকার এসব প্রচারণা সরাসরি পরিচালনা না করলেও ক্ষমতাসীন রাজনীতিকেরা একই ভাষা ব্যবহার করলে অনলাইন আক্রমণ বৈধতা পায়।
CPJ সাংবাদিকদের বিষয়ে পুলিশি তথ্য সংগ্রহ ও প্রোফাইলিংয়ের অভিযোগও উল্লেখ করেছে। কোনো অপরাধের সুনির্দিষ্ট তদন্ত ছাড়া সাংবাদিকের রাজনৈতিক পরিচয়, অতীতের কাজ বা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হলে সেটি সংবাদ উৎসের গোপনীয়তা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ভয় তৈরি করে। সাংবাদিক জানেন না কোন প্রতিবেদন ভবিষ্যতে তাঁর বিরুদ্ধে একটি প্রশাসনিক নথির অংশ হয়ে উঠবে। ফলে সরাসরি ফোন করে সংবাদ বন্ধ করতে না বললেও আত্মনিয়ন্ত্রণ কাজ শুরু করে।
স্বাধীন কমিশনের বদলে নতুন আমলাতন্ত্র?
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি একীভূত ও স্বাধীন মিডিয়া কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল সংবাদপত্র, সম্প্রচার ও অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য বিচ্ছিন্ন এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বদলে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরি করা। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন এবং সম্প্রচার কমিশন নামে দুটি আলাদা অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করা হয়। মতামত দেওয়ার জন্য সময় ছিল মাত্র তিন দিন।
TIB, ARTICLE 19 ও সম্পাদক পরিষদের আপত্তি ছিল—প্রস্তাবিত কমিশনগুলোর নিয়োগ, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও অর্থায়নে আমলাতন্ত্রের প্রভাব এত বেশি যে এগুলো স্বাধীন নিয়ন্ত্রকের বদলে সরকারি নিয়ন্ত্রণের নতুন প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে। সংস্কারের নামে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তৈরি করলেই স্বাধীনতা আসে না। আসল প্রশ্ন হলো, কমিশনার কে নিয়োগ দেবেন, সরকার তাঁদের অপসারণ করতে পারবে কি না, বাজেট কে নিয়ন্ত্রণ করবে, লাইসেন্সের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বাধীন আপিল থাকবে কি না এবং কমিশন কি সরকার ও গণমাধ্যম মালিক—উভয়ের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে পারবে?
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার আরেকটি ভিত্তি তথ্য পাওয়ার অধিকার। বাংলাদেশের তথ্য অধিকার আইনের কাঠামো আন্তর্জাতিক তুলনায় দুর্বল নয়। কিন্তু প্রধান তথ্য কমিশনার ও দুই কমিশনারের পদ প্রায় ১৮ মাস শূন্য থাকায় মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত কমিশনের আপিল ব্যবস্থা কার্যত অচল ছিল। কোনো সরকারি সংস্থা তথ্য না দিলে সাংবাদিক বা নাগরিকের প্রতিকারের জায়গা না থাকা নীরব নিয়ন্ত্রণের একটি শক্তিশালী রূপ। এতে সংবাদ নিষিদ্ধ করতে হয় না; তথ্য না দিলেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেমে যায়।
মালিকানা ও অর্থনৈতিক নির্ভরতাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বহু গণমাধ্যম এমন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মালিকানাধীন, যাদের ব্যাংক, বিদ্যুৎ, আবাসন, আমদানি বা অন্য খাতে সরকারি অনুমোদন দরকার। সরকারি বিজ্ঞাপনের বণ্টন, লাইসেন্স নবায়ন, কর তদন্ত এবং মালিকের অন্য ব্যবসার ওপর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পাদকীয় নীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। এই চাপ সাধারণত কোনো সরকারি চিঠিতে লেখা থাকে না। মালিক ও সম্পাদক আগেই বুঝে নেন কোন সংবাদে ঝুঁকি আছে। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিককে গ্রেপ্তার না করার প্রশ্ন নয়; মালিকানার স্বচ্ছতা, সরকারি বিজ্ঞাপনের নিরপেক্ষ নীতি এবং সাংবাদিকের চাকরির নিরাপত্তার প্রশ্নও।
সর্বশেষ বিতর্কে সরকার সংবাদমাধ্যমকে শেখ হাসিনার দিল্লির বক্তব্য প্রচার না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে। সরকার ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি আদেশকে আইনি ভিত্তি হিসেবে দেখিয়েছে। বিচারাধীন মামলার প্রভাব, সম্ভাব্য উসকানি এবং আদালতের আদেশ অবশ্যই সংবাদমাধ্যমকে বিবেচনায় নিতে হয়। একই সঙ্গে একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তির বক্তব্য সংবাদযোগ্য কি না, তার কোন অংশ প্রচার করা হবে এবং কীভাবে যাচাই ও প্রাসঙ্গিকতা যোগ করা হবে—এটি মূলত সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত। সম্পূর্ণ প্রচার-নিষেধাজ্ঞা আদালত, সরকার ও সম্পাদকের এখতিয়ারের সীমা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। ক্ষতিকর বক্তব্য হুবহু সম্প্রচার না করেও তার সংবাদমূল্য, অসত্য দাবি ও রাজনৈতিক তাৎপর্য সমালোচনামূলকভাবে প্রতিবেদন করা সম্ভব।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকার বদলের পর সংবাদমাধ্যমের পরিবেশে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু স্বাধীনতার প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। নিয়ন্ত্রণের ধরন বরং আরও জটিল হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের পাশাপাশি এখন মামলা, জনতার সহিংসতা, রাজনৈতিক ট্যাগিং, ডিজিটাল আক্রমণ, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, তথ্য না দেওয়া এবং মালিকানাগত স্বার্থ একসঙ্গে কাজ করে। এই ব্যবস্থায় সরকার সব সংবাদ বন্ধ করার নির্দেশ না দিয়েও এমন পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যেখানে সম্পাদক ও সাংবাদিক নিজেরাই ঝুঁকিপূর্ণ প্রশ্ন এড়িয়ে চলেন।
সংবাদমাধ্যম স্বাধীন করতে তাই শুধু একটি আইন বাতিল যথেষ্ট নয়। সাংবাদিকতার কাজকে সাইবার, সন্ত্রাসবিরোধী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের অপব্যবহার থেকে সুরক্ষা দিতে হবে; সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার স্বাধীন পর্যালোচনা করতে হবে; হামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে; পুলিশি প্রোফাইলিং বন্ধ করতে হবে; তথ্য কমিশনকে কার্যকর করতে হবে; সরকারি বিজ্ঞাপনের স্বচ্ছ নীতি করতে হবে; গণমাধ্যমের প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ করতে হবে এবং আমলাতন্ত্রের বাইরে স্বাধীন মিডিয়া কমিশন গড়তে হবে।
শেষ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পরীক্ষা সরকারকে প্রশংসা করা যায় কি না, তা নয়। পরীক্ষা হলো—সরকার, বিরোধী দল, সামরিক-বেসামরিক প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠী সম্পর্কে অস্বস্তিকর সত্য প্রকাশের পরও একজন সাংবাদিক নিরাপদ থাকেন কি না। বাংলাদেশে সরকার বদলেছে; নিয়ন্ত্রণের কিছু যন্ত্রও বদলেছে। কিন্তু সাংবাদিককে নীরব রাখার রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং সেই প্রয়োজন মেটানোর প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ এখনো রয়ে গেছে। নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি বদলেছে, নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি এখনো ভাঙেনি।
আপনার মতামত জানানঃ