২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন একটি দিন, যার অভিঘাত এখনো শেষ হয়নি। দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন, তাঁর দেশত্যাগ এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের একের পর এক আত্মগোপন বা বিদেশে চলে যাওয়া—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা রাতারাতি পাল্টে যায়। সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে ওঠে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার অবস্থান।
দুই বছর পরও প্রশ্নটি একই রয়ে গেছে—ভারতে থাকা আওয়ামী লীগের নেতারা এই দীর্ঘ সময় কীভাবে কাটালেন? তারা কি কেবল নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন, নাকি বিদেশের মাটিতে বসেই দলকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এতদিন পর তাদের সামনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার কোনো বাস্তব পথ আদৌ তৈরি হয়েছে কি না?
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে কেন্দ্র করে গত দুই বছরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কেও তৈরি হয়েছে এক ধরনের অস্বস্তিকর ভারসাম্য। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা ভারতের জন্য যেমন একটি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তেমনি আওয়ামী লীগের নেতাদের জন্য ভারত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক নির্বাসন ও ভবিষ্যতের অপেক্ষার জায়গা।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়ার পর তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি অংশও বিভিন্নভাবে দেশ ছাড়েন। কেউ ভারতে, কেউ অন্য দেশে আশ্রয় নেন। আবার দলের বহু নেতা দেশে থেকে গ্রেপ্তার হন, আত্মগোপনে চলে যান কিংবা সক্রিয় রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামোও কার্যত ভেঙে পড়ে। যে দলটি একসময় রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল, সেই দলের নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ হঠাৎ করেই রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ে যায়।
ভারতে থাকা নেতাদের জীবন তাই ছিল এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে নিরাপত্তা ও আইনি ঝুঁকি থেকে দূরে থাকার সুযোগ, অন্যদিকে নিজ দেশের রাজনৈতিক মাটির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা। ক্ষমতায় থাকার সময় যেসব নেতা নিয়মিত সভা, সমাবেশ, প্রশাসন ও দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তাদের অনেকের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে অনলাইন যোগাযোগ, ব্যক্তিগত বৈঠক এবং বিদেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়ের মধ্যে।
এই দুই বছরকে শুধু ‘পালিয়ে থাকা’ বলে দেখলে পুরো ঘটনাটির রাজনৈতিক তাৎপর্য ধরা পড়ে না। কারণ আওয়ামী লীগের জন্য এটি ছিল একই সঙ্গে টিকে থাকার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সময়। ক্ষমতা হারানোর পর দলটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেলেও রাজনৈতিক আলোচনায় আওয়ামী লীগ কখনো অদৃশ্য হয়নি। বরং দলটির ভবিষ্যৎ, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ এবং তাদের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থেকেছে।
দেশের বাইরে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের সামনে প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দলের বহু নেতা ও সমর্থকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কেউ কারাগারে যান, কেউ আত্মগোপন করেন। ফলে বিদেশে থাকা নেতাদের জন্য দেশে ফেরার অর্থ ছিল সম্ভাব্য গ্রেপ্তার কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য একটি প্রতীকী কেন্দ্র তৈরি করে। দলের প্রধান নেতা দেশে নেই, কিন্তু দলটির রাজনৈতিক অস্তিত্বও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি—এই বার্তাটি ধরে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর ভারত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে সময় যত গড়িয়েছে, ততই প্রশ্ন উঠেছে—বিদেশে বসে একটি রাজনৈতিক দল কতদিন কার্যকরভাবে রাজনীতি করতে পারে?
রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো মাঠের সংগঠন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম, জনসম্পৃক্ততা এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি—এসব কোনো কিছুই দীর্ঘদিন বিদেশে বসে পরিচালনা করা সহজ নয়। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও সেই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। দুই বছরের ব্যবধানে দলের স্থানীয় পর্যায়ের অনেক সংগঠন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। অনেক নেতা পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন, কেউ কেউ রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছেন, আবার অনেকে এখনো আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
অন্যদিকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ বিদেশে থাকায় আওয়ামী লীগের ভেতরেও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ধরে দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর অনুপস্থিতিতে দলটি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, কে মাঠের নেতৃত্ব দেবে এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কীভাবে সংগঠনকে মানিয়ে নেবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইনি বাস্তবতা। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে গুরুতর মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে। অনুপস্থিতিতে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে। তিনি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও বিচারিক বাস্তবতায় তাঁর দেশে ফেরা মানেই গ্রেপ্তার এবং আদালতের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা।
এই জায়গাটিই আওয়ামী লীগের বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের ভবিষ্যৎকে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিত করে তুলেছে।
কারণ রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন আর ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন এক বিষয় নয়। একজন নেতা দেশে ফিরে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে চাইলে তাঁকে প্রথমে আইনি বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। ফলে আওয়ামী লীগের জন্য দেশে ফেরার প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক ইচ্ছার বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে বিচার, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়।
এর মধ্যেই শেখ হাসিনা ২০২৬ সালের জুলাইয়ে Reuters-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, সম্ভাব্য গ্রেপ্তার কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি থাকলেও তিনি দেশে ফিরতে চান। 1
এই ঘোষণা আওয়ামী লীগের দুই বছরের বিদেশযাপনের আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এতদিন যে প্রশ্ন ছিল—তারা কবে ফিরবেন, আদৌ ফিরবেন কি না—তা এখন বদলে হয়েছে, ‘ফিরলে কী হবে?’
কারণ শেখ হাসিনার দেশে ফেরার অর্থ শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক।
ভারতের জন্য বিষয়টি আরও জটিল। শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ভারতের অন্যতম ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক অংশীদার ছিলেন। তাঁর সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবিলা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে দুই দেশের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হয়েছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দেয়। ঢাকার পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানানো হয়েছে। দিল্লিকে তাই একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনার অবস্থান নিয়ে কূটনৈতিক হিসাব করতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের জন্য দুই বছর ছিল এক ধরনের ‘অপেক্ষার রাজনীতি’। তারা বাংলাদেশে নেই, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নও নন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মামলা, নির্বাচন, সরকারের সিদ্ধান্ত, দলীয় নিষেধাজ্ঞা—সবকিছুই তারা দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন।
কিন্তু দূর থেকে রাজনীতি করার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাস্তবতা দ্রুত বদলে যায়।
২০২৪ সালের আগস্টে যারা মনে করেছিলেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়তো দ্রুত বদলে যাবে, দুই বছর পর তাদের সামনে ভিন্ন বাংলাদেশ। নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির মতো নতুন শক্তি রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও দলটির নিবন্ধন স্থগিত থাকার বাস্তবতায় দলটির সামনে নির্বাচনী রাজনীতিতে ফেরার পথও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের বিদেশে থাকা নেতাদের জন্য শুধু দেশে ফিরে আসাই যথেষ্ট নয়। তাদের সামনে আরও বড় প্রশ্ন—ফিরে এসে তারা কী ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশ পাবেন?
একটি দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর ক্ষমতার বাইরে গেলে তার সংগঠন ও জনসমর্থনের চরিত্র বদলে যায়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের আন্দোলন ও সরকারের পতনের সঙ্গে যে সহিংসতা, প্রাণহানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ জড়িয়েছে, তার রাজনৈতিক দায় থেকে দলটি সহজে মুক্ত হতে পারবে না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চালানো হচ্ছে এবং তাদের নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন হচ্ছে।
এই দুই বয়ানের মাঝখানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির অন্যতম বড় সংঘাত তৈরি হয়েছে।
আওয়ামী লীগের জন্য তাই ভারতের দুই বছরকে শুধু নির্বাসনের সময় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল আত্মসমালোচনা করার, নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সময়। কিন্তু দলটি সেই সময় কতটা কাজে লাগাতে পেরেছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
একসময় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক কাঠামো এবং বিস্তৃত সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক। ক্ষমতা হারানোর পর সেই কাঠামোর বড় অংশ আর তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে ভবিষ্যতে দলটিকে যদি আবার রাজনীতিতে ফিরতে হয়, তাহলে শুধু পুরোনো নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে তা সম্ভব হবে না। নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব, নতুন রাজনৈতিক ভাষা এবং অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে আত্মসমালোচনার সক্ষমতা—সবকিছুর প্রয়োজন হবে।
এখানে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি দলের সভাপতি এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারিক রায় এবং রাজনৈতিক বিরোধিতাও সবচেয়ে তীব্র। ফলে তাঁর নেতৃত্বেই দল ফিরবে, নাকি তাঁর অনুপস্থিতিতে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে—এই প্রশ্ন আওয়ামী লীগের সামনে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আর যদি শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের পরিকল্পনা অনুযায়ী সত্যিই বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তাহলে সেটি হবে ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি। তাঁর প্রত্যাবর্তন একদিকে বিচারিক প্রক্রিয়াকে সামনে আনবে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন রাজনৈতিক দর-কষাকষি শুরু হতে পারে।
তবে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা আর বাস্তব প্রত্যাবর্তন এক নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, আদালতের সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ভারত সরকারের অবস্থান—সবকিছুই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও বিশ্লেষণেও এমন ইঙ্গিত রয়েছে যে শেখ হাসিনার ফেরার পরিকল্পনাকে এখনই নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। 2
দুই বছর আগে আওয়ামী লীগের নেতারা দেশ ছেড়েছিলেন মূলত ক্ষমতার পতনের অভিঘাতে। দুই বছর পর তাদের সামনে ফিরে আসার প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায়। তখন তারা ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা; এখন তাদের অনেকেই মামলার আসামি, কেউ বিদেশে, কেউ কারাগারে, কেউ আত্মগোপনে।
এই পরিবর্তনই আসলে আওয়ামী লীগের দুই বছরের গল্পের সবচেয়ে বড় দিক।
একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতা হারালে তার সামনে সাধারণত দুটি পথ থাকে—পরাজয় মেনে নিয়ে নতুনভাবে সংগঠিত হওয়া অথবা পুরোনো রাজনৈতিক অবস্থান আঁকড়ে ধরে ফিরে আসার চেষ্টা করা। আওয়ামী লীগ এখন এই দুই পথের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে। দলটি এখনো নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দিচ্ছে না, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আগের জায়গায় নেই।
ভারতে কাটানো এই দুই বছর তাই আওয়ামী লীগের জন্য ছিল সময় কেনার সময়। কিন্তু সময় কখনো স্থির থাকে না। বাংলাদেশ বদলেছে, রাজনীতির চরিত্র বদলেছে, নতুন ভোটারদের রাজনৈতিক প্রত্যাশা বদলেছে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রও বদলে গেছে।
এখন আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হলো—তারা কি ২০২৪ সালের আগের রাজনৈতিক কাঠামোতে ফিরে যেতে চাইবে, নাকি সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতা মেনে নিজেদের পুনর্গঠন করবে?
শেখ হাসিনা যদি সত্যিই দেশে ফেরেন, তাঁর বিচার হবে কি না, আওয়ামী লীগ আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরতে পারবে কি না, দলটির নিবন্ধন ও নির্বাচনী ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর আগামী কয়েক মাসে আরও স্পষ্ট হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় ইতোমধ্যে পরিষ্কার: ভারতের মাটিতে কাটানো দুই বছর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সাময়িক বিরতি মাত্র নয়। এটি দলটির অস্তিত্ব, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সময়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে—এমন ঘোষণা দেওয়া যত সহজ, বাস্তবে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ তত সহজ নয়। কারণ বাংলাদেশের মতো দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের দেশে কোনো বড় দলকে কেবল ক্ষমতা হারানোর মাধ্যমে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না। একইভাবে অতীতের রাজনৈতিক দায় ও বিতর্ক উপেক্ষা করেও কোনো দল নতুন করে জনসমর্থন ফিরে পেতে পারে না।
আওয়ামী লীগের সামনে এখন তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ‘কবে ফিরবে’ নয়; বরং ‘কীভাবে ফিরবে’।
আর সেই উত্তরের ওপরই নির্ভর করতে পারে শুধু আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নয়, বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক ভারসাম্যও।
আপনার মতামত জানানঃ