আফগানিস্তানের কাবুল থেকে মার্কিন বাহিনীর বিশৃঙ্খল প্রত্যাহারের পাঁচ বছর পূর্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবারও এক পুরোনো প্রশ্নকে সামনে এনেছে—বৃহৎ সামরিক শক্তি কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করতে পারে? দুই দশকের যুদ্ধ, বিপুল অর্থব্যয়, লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং শেষ পর্যন্ত তালেবানের পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা শুধু একটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়; এটি ছিল একটি বৈশ্বিক কৌশলের সীমাবদ্ধতার প্রতীক। আজ, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি এবং বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে তার সামরিক অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তখন অনেক বিশ্লেষক আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাচ্ছেন। তাঁদের মতে, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রায়ই ভুলে যাওয়া হয়, আর সেই ভুলে যাওয়ার ফলই নতুন সংকটের জন্ম দেয়।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রথম লক্ষ্য ছিল আল-কায়েদাকে ধ্বংস করা এবং তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করা। প্রাথমিক পর্যায়ে সেই লক্ষ্য অনেকাংশে অর্জিত হলেও যুদ্ধ দ্রুত একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রগঠন প্রকল্পে রূপ নেয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, নিরাপত্তা বাহিনী গঠন, নির্বাচন পরিচালনা এবং পশ্চিমা ধাঁচের প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি জটিল। আফগানিস্তানের সামাজিক, জাতিগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বাইরের পরিকল্পনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ফলে দুই দশকের প্রচেষ্টার পরও একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে ওঠেনি।
২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছে। কাবুল বিমানবন্দরের দৃশ্য, দেশ ছাড়তে মরিয়া মানুষের ভিড় এবং দ্রুত তালেবানের রাজধানী দখল—সব মিলিয়ে সেই মুহূর্ত আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়। এত দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতি এবং বিপুল ব্যয়ের পরও যদি পূর্বের শক্তিই আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে, তাহলে পুরো অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
যুদ্ধের মানবিক মূল্যও ছিল ভয়াবহ। হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, অসংখ্য মানুষের বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামোর ক্ষতি এবং একটি প্রজন্মের দীর্ঘ অনিশ্চয়তা আফগান সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর হাজারো সেনাও প্রাণ হারিয়েছেন বা স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। অর্থনৈতিক ব্যয়ের পরিমাণও ছিল বিশাল। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, এই যুদ্ধের জন্য ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণে আলোচনার বিষয়।
আফগান যুদ্ধের অন্যতম বড় সমালোচনা হলো, এটি এমন একটি ধারণার ওপর দাঁড়িয়েছিল যে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি না থাকলে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ আবারও বড় হুমকি হয়ে উঠবে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন, সেই আশঙ্কা কতটা বাস্তব ছিল। তাঁদের মতে, সম্ভাব্য হুমকির মূল্যায়নে অতিরঞ্জন নীতিনির্ধারণকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেই লক্ষ্য অর্জনের উপায় যদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে তা নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
এই বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যনীতি ঘিরে। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ার পর অনেক পর্যবেক্ষক আশঙ্কা করছেন, সীমিত সামরিক পদক্ষেপ ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ইতিহাস বলছে, বহু যুদ্ধ শুরু হয়েছে দ্রুত ফল পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে; কিন্তু বাস্তবে সেগুলো বছরের পর বছর ধরে বিস্তৃত হয়েছে। যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ হলেও, সম্মানজনক ও স্থিতিশীলভাবে যুদ্ধ শেষ করা অনেক কঠিন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে ইরাক যুদ্ধও একই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামরিক অভিযান শুরু হয়। পরে সেই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। যুদ্ধের ফলে একটি সরকার পতন হলেও দীর্ঘ সময় ধরে দেশটি সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাতে নিমজ্জিত থাকে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং বাস্তব পরিস্থিতির ভুল মূল্যায়ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে—সামরিক শক্তি কি রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে? অনেক ক্ষেত্রে সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক লক্ষ্য অর্জন করলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সমঝোতা, কার্যকর প্রশাসন এবং জনগণের আস্থা ছাড়া স্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। অস্ত্র দিয়ে ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সামাজিক বাস্তবতা পরিবর্তন করা অনেক বেশি জটিল।
ভয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি। সম্ভাব্য হুমকিকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, নিরাপত্তা-উদ্বেগ যদি পর্যাপ্ত তথ্য, কৌশলগত বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তা ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তে রূপ নিতে পারে। তাই যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের আগে হুমকির প্রকৃতি, বিকল্প কূটনৈতিক পথ এবং সম্ভাব্য পরিণতি গভীরভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
বিশ্বরাজনীতিতে অর্থনৈতিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জ্বালানি, বাণিজ্যপথ, কৌশলগত অবস্থান এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার—এসব বিষয় বহু সংঘাতের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের মতো অঞ্চলে নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতি এতটাই পরস্পরনির্ভর যে একটিকে অন্যটি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখা কঠিন। ফলে কোনো সংঘাতের ব্যাখ্যা কেবল আদর্শিক বা নিরাপত্তাগত দৃষ্টিকোণ থেকে করলে পূর্ণ চিত্রটি ধরা পড়ে না।
একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও বিদেশনীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। নির্বাচনী রাজনীতি, জনমত, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন এবং নেতৃত্বের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে কখনো কখনো এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার আন্তর্জাতিক প্রভাব বহু বছর ধরে থাকে। তাই সামরিক অভিযান কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চিন্তারও প্রতিফলন।
আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—কোনো অভিযানের শুরুতেই তার সমাপ্তির পথ নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং কার্যকর প্রস্থান কৌশল ছাড়া দীর্ঘ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, ততই অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়ে, মানবিক সংকট গভীর হয় এবং রাজনৈতিক সমর্থন কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা প্রাথমিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে অনেক সময় আর মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো দেখায়, সামরিক শক্তি এখনো আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বাস্তব উপাদান। তবে একই সঙ্গে কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক আইনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু সামরিক সাফল্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের অংশগ্রহণ।
আফগানিস্তানের ঘটনা তাই শুধু অতীতের একটি অধ্যায় নয়; এটি বর্তমান এবং ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। যেকোনো রাষ্ট্র যখন নতুন সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনা করবে, তখন তাকে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। কারণ যুদ্ধের সিদ্ধান্ত মুহূর্তে নেওয়া গেলেও তার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করতে হয়।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে নতুন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এড়িয়ে চলা। প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং সামরিক শক্তি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উন্নত হলেও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, কূটনৈতিক সংযম এবং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণের বিকল্প নেই। আফগানিস্তান, ইরাক এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই সত্যই আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, শান্তি প্রতিষ্ঠা তত কঠিন; আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় তখনই, যখন অতীতের শিক্ষা উপেক্ষা করা হয়।
আপনার মতামত জানানঃ