
আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা S&P Global Ratings বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছে। তবে এখানে শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য পরিষ্কার করা প্রয়োজন—বাংলাদেশের ঋণমান এখনই কমানো হয়নি। সংস্থাটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান ‘B+’ এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণমান ‘B’ অপরিবর্তিত রেখেছে। বদলেছে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন। অর্থাৎ বর্তমান ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরবর্তী ধাপে প্রকৃত ঋণমান কমে যেতে পারে।
২৭ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত মূল্যায়নে S&P দুর্বল ব্যাংক খাত, সরকারের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, বহির্বিশ্বের প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। S&P Global Ratings
এই সিদ্ধান্তকে তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের ঘোষণা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। তবে এটিকে সাধারণ সতর্কবার্তা ভেবে উপেক্ষা করাও বিপজ্জনক। কারণ ঋণমানের পূর্বাভাস একটি দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, ঋণদাতা, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। S&P-এর কয়েক মাস আগে Fitch-ও বাংলাদেশের পূর্বাভাস স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচক করেছিল। দুটি বড় সংস্থার একই ধরনের সতর্কতা বোঝায়, সমস্যাটি কোনো একক অর্থনৈতিক সূচকে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্থনীতির একাধিক দুর্বলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সামগ্রিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
ঋণমানের পূর্বাভাস নেতিবাচক হওয়ার অর্থ কী
একটি সরকার বিদেশ থেকে বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়ার সময় ঋণদাতারা মূলত জানতে চান, নির্ধারিত সময়ে সুদ ও আসল ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা। এই সক্ষমতার মূল্যায়নই সার্বভৌম ঋণমান। একটি দেশের রেটিং যত দুর্বল হয়, ঋণদাতারা সাধারণত তত বেশি সুদ বা ঝুঁকি-প্রিমিয়াম দাবি করেন।
বাংলাদেশের ‘B+’ রেটিং এমনিতেই বিনিয়োগযোগ্য মানের নিচে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের চোখে বাংলাদেশ ঝুঁকিমুক্ত ঋণগ্রহীতা নয়। নেতিবাচক পূর্বাভাস জানাচ্ছে, বিদ্যমান চাপগুলো আরও বাড়লে এই রেটিং নিচে নামতে পারে।
রেটিং কমলে তার প্রভাব শুধু সরকার বিদেশ থেকে কত সুদে ঋণ নেবে, সেখানে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রের ঋণমান সাধারণত দেশীয় ব্যাংক ও বড় প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক ঋণ সংগ্রহের ব্যয় নির্ধারণেও একটি ঊর্ধ্বসীমা হিসেবে কাজ করে। ফলে রেটিং অবনমন হলে সরকারি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিষ্ঠান, বিমান সংস্থা এবং বড় বেসরকারি কোম্পানির বৈদেশিক ঋণও ব্যয়বহুল হতে পারে।
বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকের ঋণপত্র বা এলসি নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ফি চাইতে পারে। আমদানিকারকের খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য ও যন্ত্রপাতির দামে তার প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ঋণমান আপাতদৃষ্টিতে উচ্চপর্যায়ের আর্থিক বিষয় হলেও এর শেষ অভিঘাত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ব্যাংক খাত
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ঝুঁকির কেন্দ্রে রয়েছে ব্যাংক খাত। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়মিত ঋণ অনুমোদন, ভুয়া জামানত, সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে ঋণ প্রদান এবং পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আড়াল করার সংস্কৃতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করেছে। কোনো ঋণ আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না হলেই সেটি আদায়যোগ্য হয়ে যায় না। ফলে সরকারি হিসাবে প্রকাশিত খেলাপি ঋণের চেয়েও ব্যাংক খাতের প্রকৃত দুর্বলতা বড় হতে পারে।
দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য দিলে তা সাময়িকভাবে আমানতকারীদের আতঙ্ক কমাতে পারে। কিন্তু মূলধন ঘাটতি, খারাপ সম্পদ এবং পরিচালনা কাঠামোর সমস্যা সমাধান না করে বারবার অর্থ সরবরাহ করলে মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। অন্যদিকে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক পুনর্গঠন বা বন্ধ করতে গেলেও সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। এই সম্ভাব্য ব্যয়ই ব্যাংক খাতের সংকটকে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থের ঝুঁকিতে পরিণত করে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বাংলাদেশকে সব বড় ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্পদের মান নিরীক্ষা, প্রকৃত মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ এবং আইনসম্মত পুনর্গঠন বা অবসায়ন পরিকল্পনা তৈরির পরামর্শ দিয়েছে। দুর্বল ব্যাংকে জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা দেওয়ার বিরুদ্ধেও সংস্থাটি সতর্ক করেছে। আইএমএফ
ব্যাংক সংস্কারের সবচেয়ে কঠিন দিকটি প্রযুক্তিগত নয়, রাজনৈতিক। কার ঋণ ফেরত আসবে না, কার ব্যাংক পুনর্গঠন হবে, কার সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে এবং করদাতার অর্থ কতটা ব্যবহার করা হবে—এসব সিদ্ধান্তে শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর বিরোধিতা আসবে। সরকার যদি শুধু ব্যাংকের নাম পরিবর্তন, একীভূতকরণ কিংবা নতুন পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগের মধ্যে সংস্কার সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আস্থা ফিরবে না।
রাজস্ব সংকট ও সরকারের সীমিত সক্ষমতা
বাংলাদেশের সরকারি ঋণ জিডিপির তুলনায় এখনো অনেক দেশের চেয়ে কম। কিন্তু ঋণের ঝুঁকি শুধু ঋণের মোট পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না; সরকার কত রাজস্ব আয় করে এবং সেই আয় থেকে কত সহজে ঋণ পরিশোধ করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত নিচু। রাজস্বের বড় অংশ বেতন, সুদ, ভর্তুকি ও নিয়মিত প্রশাসনিক ব্যয়ে চলে গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগের জায়গা সংকুচিত হয়। ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ প্রয়োজন হলে এই চাপ আরও বাড়বে।
দুর্বল রাজস্ব পরিস্থিতিতে সরকার সাধারণত তিনটি পথের কোনো একটি বেছে নেয়—নতুন কর আরোপ, দেশীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ গ্রহণ অথবা উন্নয়ন ও সামাজিক ব্যয় কমানো। তিনটিরই সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য আছে। পরোক্ষ কর বাড়লে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যাংক থেকে সরকারি ঋণ বাড়লে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ কমে যেতে পারে এবং সুদ বাড়তে পারে। উন্নয়ন ব্যয় কমালে কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আইএমএফের জানুয়ারি ২০২৬-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে কর-জিডিপি অনুপাত কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থায় থেকেছে। সংস্থাটি তখন ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখলেও সতর্ক করেছিল যে, সংস্কারে বিলম্ব হলে ঝুঁকি নিচের দিকেই থাকবে। পরবর্তী পরিস্থিতিতে আইএমএফ আরও দুর্বল প্রবৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। ফলে S&P-এর দীর্ঘায়িত পুনরুদ্ধারের আশঙ্কা বিচ্ছিন্ন কোনো পূর্বাভাস নয়।
রিজার্ভ বেড়েছে, তবু উদ্বেগ কেন
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সাম্প্রতিক উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড BPM6 অনুযায়ী রিজার্ভ ২০২৫ সালের জুনে ২৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ সালের জুনে ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। একই সময়ে মোট হিসাবে রিজার্ভ ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক
এই উন্নতি গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী প্রবাসী আয়, চলতি হিসাব ও সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যের উন্নতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনা রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে ২০২২ বা ২০২৩ সালের তীব্র ডলারসংকটের সরাসরি পুনরাবৃত্তি বলা ঠিক হবে না।
কিন্তু রিজার্ভের পরিমাণ বাড়লেই সব বহিঃখাতীয় ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। রিজার্ভ কতটা ব্যবহারযোগ্য, আমদানি ব্যয় কত দ্রুত বাড়ছে, বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কত, স্বল্পমেয়াদি দায় কতটা এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ কী রকম—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশ একই সঙ্গে তিন দিক থেকে চাপের মুখে পড়তে পারে। প্রথমত, তেল ও গ্যাসের আমদানি ব্যয় বাড়বে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান বা প্রবাসী আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তৃতীয়ত, জাহাজ চলাচল ও বিমা ব্যয় বাড়লে সব ধরনের আমদানি ব্যয়বহুল হবে। জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি ও খাদ্যমূল্যে ছড়িয়ে পড়বে।
রিজার্ভ রক্ষায় টাকার বিনিময় হারকে আরও নমনীয় করা হলে আমদানি পণ্যের দাম বাড়তে পারে। আবার কৃত্রিমভাবে টাকার দাম ধরে রাখতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করলে সঞ্চিত বৈদেশিক মুদ্রা দ্রুত কমে যেতে পারে। অর্থাৎ নীতিনির্ধারকদের সামনে সহজ কোনো পথ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ৩০ জুলাই ২০২৬-এ আন্তব্যাংক ডলারের গড় দর প্রায় ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা দেখানো হয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রয়েছে। উচ্চ সুদ মূল্যস্ফীতি ও ডলারের চাপ কমাতে সহায়ক হলেও ব্যবসার ঋণ ব্যয় বাড়ায় এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে মন্থর করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক
সাধারণ মানুষ কোথায় আক্রান্ত হবে
ঋণমানের নেতিবাচক পূর্বাভাসের পরদিনই বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাবে—এমন নয়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে এবং কয়েকটি পথে ছড়িয়ে পড়ে।
সরকার ও বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের ব্যয় বাড়লে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রকল্প ব্যয়বহুল হবে। ডলারের দর বাড়লে আমদানি করা জ্বালানি, ভোজ্যতেল, সার, ওষুধের কাঁচামাল ও শিল্পের যন্ত্রপাতির দাম বাড়বে। উচ্চ সুদে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার সম্প্রসারণ কঠিন হবে। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকারি অর্থ ব্যবহার করা হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা সামাজিক সুরক্ষার বরাদ্দ চাপে পড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, ব্যাংক খাতের অনিয়মের মূল্য যেন সাধারণ আমানতকারী ও করদাতাদের দিয়ে পরিশোধ করানো না হয়। বছরের পর বছর যাঁরা ঋণ নিয়ে ফেরত দেননি, তাঁদের সম্পদ ও দায় নির্ধারণ না করে শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে ব্যাংকের ঘাটতি পূরণ করা হলে সেটি সংস্কার নয়; লোকসানের সামাজিকীকরণ। লাভ ব্যক্তিগত হাতে থাকবে, আর ক্ষতি বহন করবে রাষ্ট্র—এই ব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে কোনো আন্তর্জাতিক রেটিংই দীর্ঘমেয়াদে উন্নত হবে না।
এখন কী করতে হবে
প্রথম কাজ হওয়া উচিত ব্যাংক খাতের প্রকৃত ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করা। প্রতিটি বড় ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্পদের মান স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করে কত ঋণ আদায়যোগ্য, কত মূলধন প্রয়োজন এবং কোন ব্যাংক টেকসই নয়—তা জানাতে হবে। ঋণখেলাপি ও ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট মালিকদের সম্পদ উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হবে না।
দ্বিতীয়ত, রাজস্ব বাড়াতে শুধু ভ্যাট ও পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। উচ্চ আয়, সম্পদ, অঘোষিত অর্থ এবং কর-সুবিধা পাওয়া বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যায়সংগত প্রত্যক্ষ কর প্রয়োগ জরুরি। কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরকে এমনভাবে করতে হবে, যাতে হয়রানি না বাড়িয়ে ফাঁকি কমানো যায়।
তৃতীয়ত, জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বচ্ছ ক্রয়, অপচয় কমানো, দেশীয় নবায়নযোগ্য শক্তি এবং কার্যকর ভর্তুকি সংস্কার প্রয়োজন। ভর্তুকি একবারে তুলে দিয়ে মূল্যস্ফীতির বোঝা মানুষের ওপর চাপানো সমাধান নয়; ধনী ও উচ্চ ব্যবহারকারীর সুবিধা কমিয়ে দরিদ্র পরিবার ও উৎপাদনশীল খাতকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে।
চতুর্থত, বিনিময় হার ও রিজার্ভের তথ্য নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। বাজারে একাধিক ডলার দর, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং নীতির আকস্মিক পরিবর্তন বিনিয়োগকারীর আস্থা নষ্ট করে। স্থিতিশীলতা মানে টাকার একটি নির্দিষ্ট দাম যেকোনো মূল্যে ধরে রাখা নয়; বরং এমন পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে বাজার, ব্যবসা ও নাগরিকেরা নীতির দিক বুঝতে পারেন।
সবশেষে, অর্থনৈতিক সংস্কারকে কেবল আইএমএফ বা ঋণমান সংস্থাকে সন্তুষ্ট করার প্রকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। ব্যাংকের জবাবদিহি, ন্যায্য করব্যবস্থা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক সুরক্ষা দেশের নিজস্ব প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সংস্থার সতর্কতা সেই প্রয়োজনকে শুধু আরও দৃশ্যমান করছে।
S&P-এর নেতিবাচক পূর্বাভাস তাই বাংলাদেশের অর্থনীতি ধসে পড়েছে—এমন ঘোষণা নয়। রিজার্ভের উন্নতি, রপ্তানি সক্ষমতা, প্রবাসী আয় এবং তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত সরকারি ঋণ এখনো গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। কিন্তু এই শক্তিগুলো দুর্বল ব্যাংকব্যবস্থা, সীমিত রাজস্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বহিঃখাতের অভিঘাতকে অনির্দিষ্টকাল সামাল দিতে পারবে না।
বাংলাদেশ নতুন ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে কি না, তার উত্তর শেষ পর্যন্ত কোনো রেটিং সংস্থা দেবে না। উত্তর নির্ভর করবে সরকার সমস্যাগুলো স্বীকার করে কঠিন সংস্কার শুরু করে, নাকি সাময়িক রিজার্ভ বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে তুলে ধরে। নেতিবাচক পূর্বাভাস এখনো সতর্কবার্তা; কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরবর্তী সংবাদটি শুধু পূর্বাভাস বদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ