১৯৮১ সালের ৩০ মে, ভোরের অন্ধকার তখনও পুরোপুরি কাটেনি। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের নীরবতা ভেঙে গুলির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। সেই গুলিতেই শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে এই মৃত্যুর খবর বাস্তবে পৌঁছায় পরদিন সকালে, যখন তারা দৈনিক পত্রিকার পাতা খুলে আট কলামের ব্যানার শিরোনামে দেখতে পান—রাষ্ট্রপতি নিহত।
১৯৮১ সালের বাংলাদেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা। তখন ২৪ ঘণ্টার টেলিভিশন সংবাদ ছিল না, ছিল না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা মুহূর্তে খবর পৌঁছে দেওয়ার কোনো ডিজিটাল ব্যবস্থা। সংবাদপত্রই ছিল জাতির প্রধান তথ্যভরসা। তাই ৩১ মে সংখ্যার প্রথম পাতা সাজানোর সময় ইত্তেফাক, আজাদসহ দেশের প্রধান সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকরা শুধু একটি সংবাদ প্রকাশ করেননি; তারা কার্যত পুরো জাতিকে একই মুহূর্তে জানিয়েছিলেন এক অভূতপূর্ব জাতীয় ট্র্যাজেডির কথা।
শিরোনামগুলোর ভাষা ছিল সংক্ষিপ্ত, সরাসরি এবং শোকাবহ—রাষ্ট্রপতি আর বেঁচে নেই। তবে এই মর্মান্তিক সংবাদটির পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও একই গুরুত্বে প্রকাশিত হয়েছিল। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এমন সংকটময় মুহূর্তে সংবাদপত্র শুধু তথ্য পরিবেশন করেনি; বরং জনগণকে এটিও জানাতে চেয়েছিল যে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো এখনো কার্যকর রয়েছে এবং প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
সে সময়ের সংবাদ পরিবেশনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল সরকারি প্রেস নোটের ওপর সংবাদপত্রগুলোর ব্যাপক নির্ভরশীলতা। বড় রাজনৈতিক ঘটনা ঘটলেই সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা ছিল প্রচলিত রীতি। রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সেই প্রেস নোটগুলোতে সরকারের শোকবার্তা, ক্ষমতা হস্তান্তরের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং জনগণের প্রতি শান্ত ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান স্থান পায়। একই সঙ্গে এসব বিবৃতি একটি বাস্তবতাও সামনে নিয়ে আসে—ঢাকা তখনও পুরো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানত না। চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কেও সরকারের কাছে নিশ্চিত তথ্য ছিল না।
পরবর্তী কয়েক দিনের সংবাদে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ঘটনাটি শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়; এটি ছিল চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে এক সামরিক বিদ্রোহের ঘটনাও। সংবাদপত্রগুলোর প্রতিবেদনে মেজর জেনারেল এম. এ. মঞ্জুরকে বিদ্রোহের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার এবং সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ. এম. এরশাদ বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের জন্য একের পর এক প্রকাশ্য আহ্বান জানান। প্রথমে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়, পরে অনুগত সেনাসদস্যদের আত্মসমর্পণ শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে সেই সময়সীমা আরও বাড়ানো হয়।
এ সময় নৌবাহিনীও প্রকাশ্যে সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে। নৌবাহিনী প্রধান জানান, চট্টগ্রাম বন্দর এবং নৌঘাঁটি সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সংবাদপত্রগুলো এই ঘোষণাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে, কারণ এটি ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে বিদ্রোহ ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে চলে আসছে।
এই সময়ের সংবাদগুলোর সবচেয়ে আলোচিত এবং বেদনাদায়ক বিষয়গুলোর একটি ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ হস্তান্তরকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক। সরকারের অনুরোধে রেড ক্রস উদ্যোগ নিলেও সংবাদপত্রে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী মেজর জেনারেল মঞ্জুর মরদেহ হস্তান্তরে সম্মত হননি। রেড ক্রস এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করেছিল। একটি রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রধানের মরদেহও তখন সামরিক অচলাবস্থার অংশ হয়ে উঠেছিল—যা জাতীয় ট্র্যাজেডিকে আরও গভীর করে তুলেছিল।
বিদ্রোহ দমন হওয়ার পর এবং চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হলে সংবাদপত্রের প্রতিবেদনেও পরিবর্তন আসে। সরকারি বিবৃতির পাশাপাশি প্রকাশ পেতে শুরু করে সেই রাতের প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা। সার্কিট হাউসে অবস্থান করা বিএনপির নেতা অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোরের দিকে রকেট হামলার শব্দে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। এরপর কয়েক মিনিট ধরে অবিরাম গুলিতে ভবনের দেয়াল ও জানালা ঝাঁঝরা হয়ে যায়। প্রাণ বাঁচাতে তারা কক্ষে আশ্রয় নিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় ছিলেন। হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর বাইরে এসে তারা দেখতে পান, রাষ্ট্রপতির কক্ষের দরজার কাছেই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে তাঁর নিথর দেহ। বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—গুলির শব্দ শুনে সম্ভবত কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন রাষ্ট্রপতি, আর তখনই তিনি হামলাকারীদের গুলির শিকার হন।
এসব ছিল না পরিপাটি বা পরিমার্জিত বিবরণ। এগুলো ছিল আতঙ্ক, বিভ্রান্তি এবং মৃত্যুভয়ের মধ্য দিয়ে বেঁচে ফেরা মানুষের তাৎক্ষণিক স্মৃতিচারণ। কিন্তু সংবাদপত্র যখন এসব বক্তব্য একত্রে প্রকাশ করল, তখন সাধারণ মানুষ শুধু সরকারি ঘোষণা নয়, সেই বিভীষিকাময় রাতের মানবিক অভিজ্ঞতারও একটি স্পষ্ট চিত্র পেল।
পরবর্তী সময়ে সরকারের গঠিত একটি বেসামরিক তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সংবাদপত্রগুলো আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশের সুযোগ পায়। তবু একটি প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে অনুত্তরিত থেকে যায়—এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত পরিকল্পনাকারী কে ছিলেন? দায় স্বীকার করেছিলেন যিনি, তিনিই কি এর মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন, নাকি ঘটনার পেছনে আরও জটিল বাস্তবতা ছিল? চার দশকেরও বেশি সময় পর প্রকাশিত স্মৃতিকথা, গবেষণা এবং ঐতিহাসিক আলোচনায় সেই প্রশ্ন আজও ফিরে আসে।
১৯৮১ সালের সেই কয়েকটি দিনের সংবাদপত্রের পাতাগুলো নিখুঁত ইতিহাস নয়; বরং ইতিহাসের প্রথম খসড়া। সেখানে যেমন ছিল সরকারি আশ্বাস, তেমনি ছিল অনিশ্চয়তা; যেমন ছিল প্রত্যক্ষদর্শীদের আতঙ্ক, তেমনি ছিল রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রতিফলন। সময়ের ব্যবধানে কাগজগুলো হলদে হয়ে গেলেও সেগুলো এখনো বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডকে বোঝার এক অনন্য দলিল। কারণ সেখানে কোনো ঘটনার পরবর্তী ব্যাখ্যা নয়, বরং একটি জাতি কীভাবে এক রাষ্ট্রপতির মৃত্যুসংবাদ গ্রহণ করেছিল—তারই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি সংরক্ষিত রয়েছে, এক একটি সংবাদপত্রের সংস্করণে।
আপনার মতামত জানানঃ