ঢাকার হাজারিবাগের এক লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে গত সপ্তাহে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা যেকোনো মানুষকে থমকে দেবে। এক কিশোরী, বয়স মোটে তেরো বছর চার মাস, কোলে নিয়ে বসে আছে সাত মাস বয়সী এক শিশুকে—যে কিনা তারই সন্তান। মেয়েটির বয়স যখন বারো বছর চার মাস, তখনই সে জন্ম দিয়েছিল এই সন্তানের। ঘটনার সূত্রপাত টিকটকে পরিচয় থেকে, যেখানে বাইশ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, এবং পরে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করিয়ে একটি “বিয়ে” সম্পন্ন করা হয়—যার আদতে কোনো আইনি স্বীকৃতিই নেই। মাস তিনেক আগে সন্তানকে রেখে মেয়েটিকে পরিবার থেকে বের করে দেওয়া হলে সে নিজের সন্তান ফিরে পেতে আইনি পথে হাঁটে, এবং লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের হস্তক্ষেপে অবশেষে শিশুটিকে উদ্ধার করে তার কিশোরী মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে বটে, কিন্তু এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। বরং এটি বাংলাদেশের এক গভীর, দীর্ঘস্থায়ী ও ক্রমাগত পুনরুৎপাদিত হতে থাকা সামাজিক সংকটের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনামাত্র। বাল্যবিবাহ—যাকে আমরা প্রায়ই দূরবর্তী গ্রামীণ সমাজের সমস্যা বলে ভেবে নিই—আসলে রাজধানী ঢাকার অলিগলিতেও, স্মার্টফোন আর সামাজিক মাধ্যমের যুগেও, সমান তীব্রতায় বেঁচে আছে।
পরিসংখ্যান যা বলছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ বাল্যবিবাহের হারযুক্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ এশিয়ায় শীর্ষে এবং বিশ্বে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে বলে ইউনিসেফ, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও ইউএন উইমেনের যৌথ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্য বলছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে যাদের বিয়ে আঠারো বছরের আগেই হয়ে গেছে, তাদের হার ২০১৯ সালের ৫১.৪ শতাংশ থেকে কমে এ বছর দাঁড়িয়েছে ৪৭.২ শতাংশে। প্রথম দেখায় এটি অগ্রগতির লক্ষণ মনে হতে পারে। কিন্তু একই সমীক্ষার আরেকটি সংখ্যা এই আশাবাদে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দেয়—১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে বর্তমানে বিবাহিতদের হার ২০১৯ সালের ৩২.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৮.৯ শতাংশ। অর্থাৎ পুরোনো প্রজন্মের তুলনায় সামগ্রিক বাল্যবিবাহ কিছুটা কমলেও, আজকের কিশোরীদের মধ্যে এটি আবার নতুন করে বাড়ছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, সমাজের গভীরে থাকা মানসিকতা ও কাঠামোগত কারণগুলো এখনো অক্ষত রয়ে গেছে—শুধু পরিসংখ্যানের ওঠানামা দিয়ে বাস্তব চিত্র বোঝা যায় না।
অর্থনৈতিক হিসাবটাও কম চমকপ্রদ নয়। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, বাল্যবিবাহের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর হারাচ্ছে প্রায় সাত থেকে আট বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদ সম্ভাবনা। অথচ বিপরীতে, শিশু সুরক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য এক শতাংশ—যাকে ইউনিসেফ নিজেই “আশ্চর্যজনকভাবে কম” বলে বর্ণনা করেছে। এই বৈসাদৃশ্য একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: সমস্যাটির ভয়াবহতা সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় সচেতনতা আছে, কিন্তু তার সমাধানে বিনিয়োগ নেই কেন?
আইনি কাঠামোর দিক থেকে দেখলে, বাংলাদেশের আইন এ বিষয়ে যথেষ্ট স্পষ্ট। বিয়ের জন্য ন্যূনতম বয়স মেয়েদের ক্ষেত্রে আঠারো এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে একুশ বছর। এর নিচে যেকোনো বিয়েই বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয় এবং তা আইনত অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তদুপরি, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করিয়ে “বিয়ে” সম্পন্ন করার প্রবণতা—যা হাজারিবাগের এই ঘটনাতেও দেখা গেছে—আইনের চোখে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আইনজীবীরা বারবার স্পষ্ট করে বলছেন, নোটারি এফিডেভিটের মাধ্যমে কোনো বিয়ে বৈধ হয় না, এবং পরবর্তীতে দেনমোহর, উত্তরাধিকার বা খোরপোষের মতো কোনো আইনি অধিকারও দাবি করা যায় না। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে কেবল নিবন্ধিত কাজীর মাধ্যমে সম্পাদিত বিয়েই আইনসম্মত, এবং অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট ধর্মীয় আইন ও রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এই বাস্তবতা সত্ত্বেও, বয়স গোপন করে বা জাল জন্মনিবন্ধন দেখিয়ে নোটারির আশ্রয়ে বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করার ঘটনা থামছে না—এমনকি আইন মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালেই নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও।
সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তনও লক্ষণীয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এ ২০২৬ সালে আনা সংশোধনী অনুযায়ী, ষোলো বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সঙ্গে তার সম্মতিতে বা সম্মতি ছাড়া কেউ যৌনকর্মে লিপ্ত হলে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে—বয়স বা তথাকথিত “বিয়ে” কোনো অজুহাত হিসেবে বিবেচিত হবে না। এই সংশোধনী অনুযায়ী আঠারো বছরের নিচের ভুক্তভোগীর কোনো জবানবন্দিও গ্রহণযোগ্য নয়, এবং প্রমাণসাপেক্ষে সাজা হতে পারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত। আইনটি স্পষ্টভাবে বলছে, এমন মামলায় কোনো আপসের সুযোগ নেই। এই কঠোরতা তাত্ত্বিকভাবে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করলেও, বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়—বিশেষত যখন থানা পর্যায়ে অভিযোগ নিয়ে সহযোগিতা না পাওয়ার অভিজ্ঞতা এখনো অহরহ শোনা যায়, যেমনটা হাজারিবাগের এই মেয়েটির পরিবারের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল।
বাল্যবিবাহের কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এটি কোনো একক সমস্যা নয়—বরং দারিদ্র্য, শিক্ষার অপ্রতুলতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, লিঙ্গবৈষম্যমূলক মূল্যবোধ এবং সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব—এসব উপাদানের এক জটিল সমন্বয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শিক্ষার অভাব বাল্যবিবাহের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, এবং এই সংকট মোকাবিলায় সারাদেশে প্রায় সাড়ে চারশ উপজেলায় শিশু কল্যাণ বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে অভিভাবকদের সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে বিচারিক ব্যবস্থার জটও একটি বড় বাধা—দেশে বর্তমানে প্রায় পঁয়তাল্লিশ লাখ মামলা বিচারাধীন থাকায়, বাল্যবিবাহ-সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় লিগ্যাল এইড কার্যালয়গুলোর মধ্যস্থতা কার্যক্রম—যা রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পরিচালিত হয়—অনেক পরিবারের জন্য একমাত্র বাস্তবসম্মত আশ্রয় হয়ে উঠেছে, যেমনটা হাজারিবাগের এই কিশোরীর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।
বাল্যবিবাহের পরিণতি শুধু আইনি জটিলতায় সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি একজন কিশোরীর সমগ্র জীবনকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি মেয়ের শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে, কারণ নতুন সংসারের দায়িত্ব ও অপরিচিত পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার চাপ তাকে আর বিদ্যালয়ে ফিরতে দেয় না। স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও ঝুঁকি ভয়াবহ—আঠারো বছরের নিচে সন্তান জন্মদানকারী নারীদের ক্ষেত্রে অপরিণত বা কম ওজনের শিশু জন্মের সম্ভাবনা পঁয়ত্রিশ থেকে পঞ্চান্ন শতাংশ পর্যন্ত বেশি, এবং এসব শিশুর মৃত্যুহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকে। কম বয়সে গর্ভধারণের ফলে মায়ের শারীরিক জটিলতা, মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি এবং মানসিক ট্রমাও সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। হাজারিবাগের ঘটনায় খোদ ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনজীবী উভয়েই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে বারো বছরের একটি শিশু কীভাবে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিতে পারল—এই বিস্ময়ই আসলে প্রমাণ করে যে বিষয়টি কতটা অস্বাভাবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ, যদিও বাস্তবে এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সংকটে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। টিকটক বা ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয়, তারপর প্রলুব্ধ করে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া বা পালিয়ে যেতে বাধ্য করা—এমন প্যাটার্ন ইদানীং বারবার সামনে আসছে। এসব ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা প্রায়ই দাবি করেন যে সম্পর্কটি ছিল সম্মতিমূলক এবং বয়স সম্পর্কে তারা প্রতারিত হয়েছেন—ঠিক যেমনটা হাজারিবাগের ঘটনায় অভিযুক্ত যুবকও দাবি করেছেন যে জন্মনিবন্ধন সনদে মেয়েটির বয়স কুড়ি বছর লেখা ছিল। এই ধরনের দাবি প্রমাণ করে দেয়, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই চলবে না—জন্মনিবন্ধনের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা, বিয়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় বয়স যাচাইয়ের কড়াকড়ি বাড়ানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষামূলক সচেতনতা তৈরি করাও সমান জরুরি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই সমস্যা কোনো একরৈখিক প্রবণতায় কমছে না। এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য যেভাবে দেখায়, দীর্ঘমেয়াদী গড় হারে সামান্য উন্নতি সত্ত্বেও বর্তমান কিশোরী প্রজন্মের মধ্যে বাল্যবিবাহ পুনরায় বাড়ছে, তা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। আইন যত কঠোরই হোক না কেন, বাস্তবায়নের ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাব, এবং দারিদ্র্য-জর্জরিত পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প সামাজিক নিরাপত্তার অনুপস্থিতি—এই তিন সংকট একসঙ্গে কাজ না করলে পরিস্থিতির প্রকৃত পরিবর্তন কঠিন। হাজারিবাগের সেই তেরো বছর বয়সী মায়ের ছবি হয়তো কিছুদিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে হারিয়ে যাবে, কিন্তু যে কাঠামোগত সংকট তাকে এই পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে, তা প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে নতুন করে পুনরাবৃত্ত হচ্ছে—কেবল ক্যামেরার সামনে আসছে না বলেই আমরা তা দেখতে পাচ্ছি না।
আপনার মতামত জানানঃ