কামরুজ্জামানের বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে। দুই বছর আগে যখন এক দল লোক তাঁর কাছে এসে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তখন তাঁর চোখে ভেসে উঠেছিল ইউরোপের ঝকঝকে জীবনের ছবি। পনেরো লাখ টাকার বিনিময়ে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল তা ছিল দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়াবহ। মিসর হয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়, যেখানে তাঁকে জিম্মি করে আরও দশ লাখ টাকা আদায় করা হয়। শেষ পর্যন্ত পঁচিশ লাখ টাকা খোয়ানোর পরও তাঁর ইতালি পৌঁছানো হয়নি।
নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের ইমরান হোসেনের গল্পটাও প্রায় একই রকম, কিন্তু আরও নির্মম। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিমানে তাঁকে প্রথমে কুয়েত, তারপর মিসর হয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। শুরুতে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার পরও লিবিয়ায় পৌঁছে তাঁকে জিম্মি করা হয়, আর তখন তাঁর ওপর চালানো হয় এমন এক নির্যাতন যা কল্পনাতীত—পা ফুটো করে দেওয়া হয় ড্রিল মেশিন দিয়ে। এই নির্মমতার বিনিময়ে আদায় করা হয় আরও উনিশ লাখ টাকা। প্রায় এক বছর জিম্মি দশায় কাটানোর পর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার সহায়তায় গত বছর দেশে ফিরতে পারেন তিনি।
কামরুজ্জামান বা ইমরান একা নন। প্রতি বছর গড়ে ত্রিশ হাজার তরুণকে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই সংখ্যাটা শুনতে পরিসংখ্যান মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো পরিবারের ভাঙা স্বপ্ন, নিঃস্ব হয়ে যাওয়া সংসার আর ঋণের বোঝা। ইতালি নেওয়ার নামে প্রাথমিক চুক্তি হয় পনেরো থেকে ষোলো লাখ টাকায়। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। জিম্মি করে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের বাড়তি অর্থ। এভাবে বছরে পাচারকারী চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে সাড়ে চার হাজার কোটি থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা, যার সিংহভাগ চলে যায় দেশের বাইরে থাকা চক্রের সদস্যদের পকেটে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জার্মানির একটি ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এই গবেষণা করেছে মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টার নামের একটি সংস্থা, যার নেতৃত্বে ছিলেন একজন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সমুদ্রপথে প্রায় চৌদ্দ হাজার বাংলাদেশি ইতালিতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও অনেক বড় এক ট্র্যাজেডি। পাচারকারীদের আদায় করা অর্থের হিসাব কষে গবেষকরা জানাচ্ছেন, চক্রের সদস্যরা প্রত্যক্ষভাবে অন্তত ষোলো থেকে উনিশ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় দুই হাজার তিনশ কোটি টাকার সমান, নিজেদের পকেটে ভরছে। বাকি অর্থ যাচ্ছে দালাল চক্র, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি আর ট্রানজিট রুটের নানা খরচ মেটাতে।
মানবপাচার নিয়ে কাজ করা একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার বাংলাদেশ প্রধানের ভাষ্যমতে, প্রতিবছর গড়ে পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার মানুষ ইতালি যাওয়ার আশায় বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় পাড়ি জমান। এদের মধ্যে সীমিত একটি অংশ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছাতে সক্ষম হন। বাকিদের হয় দেশে ফিরে আসতে হয়, নয়তো লিবিয়ার জিম্মিদশায় আটকে থাকতে হয় দীর্ঘদিন। এই তথ্যের সত্যতা মেলে সরকারি এক ঘোষণাতেও। গত ৭ জুলাই লিবিয়ার দুটি বন্দিশিবির থেকে ১৭৪ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়, যা প্রমাণ করে সমস্যাটা কতটা বিস্তৃত ও গভীর।
পাচারকারী চক্রগুলো আজ আর আগের মতো বিক্ষিপ্ত নয়। তারা এখন অনেক বেশি সংগঠিত ও কৌশলী। স্থানীয় চায়ের দোকান, ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা সামাজিক জমায়েতে টার্গেট করা মানুষের সঙ্গে ধীরে ধীরে সখ্য গড়ে তোলে তারা। এরপর সেই সম্পর্কের সুযোগে বুনে ফেলে প্রতারণার জাল। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে তাদের প্রধান হাতিয়ার। ইমো আর ফেসবুকের মতো মাধ্যম ব্যবহার করে তারা ইতালি যাওয়ার সাফল্যের গল্প ছড়ায়—অনেক সময় যেগুলো সম্পূর্ণ সাজানো, ভুয়া। ইতালি পৌঁছানো কারও ভিডিও দেখিয়ে বা মিথ্যা সাফল্যগাথা রচনা করে তরুণদের প্রলুব্ধ করা হয়। টাকা লেনদেনের হিসাব রাখা থেকে শুরু করে যাত্রার প্রতিটি ধাপের আপডেট—সবই চলে এসব অ্যাপের মাধ্যমে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষও এই পাচার-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বৈধ পথ আর পাচারকারীর ফাঁদের মধ্যে পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশযাত্রায় ইচ্ছুক মানুষদের আকৃষ্ট করতে চক্রগুলো বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ অফার করে। একটি সাধারণ মানের প্যাকেজের দাম দশ হাজার মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় বারো লাখ। এই অর্থ দুই কিস্তিতে নেওয়া হয়—দেশ ছাড়ার আগে তিন হাজার ডলার আর লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর সাত হাজার ডলার। এর বাইরে আছে আরও ব্যয়বহুল একটি প্যাকেজ, যার দাম চৌদ্দ হাজার ডলার বা প্রায় সতেরো লাখ টাকা। এই প্যাকেজে চক্রের সদস্যরা দাবি করে, লিবিয়া থেকে ইতালি পর্যন্ত সব ঝুঁকি তাদের। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চুক্তির পুরো অর্থ পরিশোধ করার পরও লিবিয়ায় পৌঁছানো মাত্রই অনেককে জিম্মি করা হয়। তখন নিরাপত্তা ফি, উপকূল পার হওয়ার ছাড়পত্র বা ভালো মানের নৌকা জোগাড়ের অজুহাতে আরও পনেরো থেকে সতেরো হাজার ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এই দাবি মেটাতে না পারলে নেমে আসে অকল্পনীয় নির্যাতন।
সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্যটি হলো, যে তরুণরা বুক ভরা আশা নিয়ে দেশ ছাড়েন, তাঁদের মাত্র ত্রিশ শতাংশ শেষ পর্যন্ত ইতালিতে পৌঁছাতে সক্ষম হন। বাকি সত্তর শতাংশ ভয়াবহ পরিণতির শিকার হন—কেউ ভূমধ্যসাগরের অতলে হারিয়ে যান, কেউবা লিবিয়ার গোপন বন্দিশিবিরে মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হন। যাঁরা কোনোমতে বেঁচে দেশে ফেরেন, তাঁদের জন্য অপেক্ষা করে আরেক লড়াই—ঋণের বোঝা মেটানোর তাড়া।
গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশও করা হয়েছে। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স অপব্যবহার করে পাচার চালানো হচ্ছে, সেগুলোর লাইসেন্স বাতিল ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা পাচারের বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে আরও সক্রিয় করার সুপারিশও এসেছে। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগে জড়িয়ে থাকা সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং লিবিয়া-ইতালি রুটের ভয়াবহতা নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর প্রস্তাবও রয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত হয়েছে—অভিবাসীরা সাধারণত বৈধ পাসপোর্ট আর ভিজিট ভিসা নিয়েই ঢাকা ছাড়েন। বিমানবন্দরে সক্রিয় থাকা পাচারকারীদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে আগে থেকেই ব্যবস্থাপনায় নিয়ে বিশেষ সংকেত ব্যবহার করে অভিবাসীদের পার করিয়ে দেয়। কখনো কখনো বাড়তি টাকার বিনিময়ে বৈধ শ্রমিকের পরিচয়পত্রও জোগাড় করা হয়, যাতে গোটা যাত্রাটা বৈধ মনে হয়।
সরাসরি লিবিয়া যাওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ায় পাচারকারীরা দুবাই, মিসর, তুরস্ক বা শ্রীলঙ্কাকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। অনেককে বলা হয় তাঁরা কুয়েত বা মালয়েশিয়া যাচ্ছেন, কিন্তু মাঝপথে পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে জোর করে লিবিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই প্রতারণার কৌশল এতটাই সূক্ষ্ম যে ভুক্তভোগীরা নিজেরাও বুঝে ওঠার আগেই ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন।
এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মানবপাচার রোধে চেষ্টা অব্যাহত আছে। অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে আইন সংশোধন করে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যার বিধি তৈরির কাজ এখন চলমান। সরকারি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ইতালিমুখী মানবপাচার ইতিমধ্যে কিছুটা কমেছে এবং তা আরও কমানোর চেষ্টা চলছে।
তবে বাস্তবতা হলো, যতক্ষণ না দারিদ্র্য, বেকারত্ব আর বিদেশে ভালো থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তরুণদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দেওয়া বন্ধ না হচ্ছে, ততক্ষণ পাচারকারীরা নতুন নতুন কৌশলে তাদের ফাঁদ পাতবেই। কামরুজ্জামান বা ইমরানের মতো মানুষদের গল্প শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের বিবরণ নয়, বরং একটি সামাজিক ব্যাধির প্রতিচ্ছবি—যেখানে স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা মানুষের আশাকে পুঁজি করে গড়ে তুলেছে পাঁচ হাজার কোটি টাকার এক নিষ্ঠুর বাণিজ্য। এই চক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন কেবল আইনি সংস্কার নয়, বরং গ্রামে গ্রামে সচেতনতা তৈরি, বিমানবন্দরের দুর্নীতিগ্রস্ত নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা প্রতারণার বিজ্ঞাপন বন্ধ করার মতো সমন্বিত উদ্যোগ। ততদিন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরের ঢেউয়ে হারিয়ে যাওয়া বা লিবিয়ার বন্দিশিবিরে জিম্মি হওয়া তরুণদের সংখ্যা কেবল বাড়তেই থাকবে, আর তাদের পরিবারগুলো বহন করে যাবে এক না-মেটা ঋণ আর না-ফেরা প্রিয়জনের অপেক্ষা।
আপনার মতামত জানানঃ