রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার অন্যতম বড় প্রভাব পড়েছে আন্তঃদেশীয় আর্থিক লেনদেনে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বহু ব্যাংক আন্তর্জাতিক আর্থিক বার্তা আদান-প্রদানের প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ায় দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনা করা অনেক দেশের জন্যই জটিল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের অর্থ পরিশোধ এবং সার ও গম আমদানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে ঢাকা। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতীয় রুপিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ঢাকায় একটি রুশ ব্যাংকের শাখা চালুর বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই প্রস্তাব শুধু দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন দিকের ইঙ্গিত বহন করছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন, নিষেধাজ্ঞা এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে অনেক দেশ বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্যের পথ খুঁজছে। রাশিয়া, চীন, ভারত, ব্রাজিলসহ একাধিক দেশ ইতোমধ্যে নিজস্ব মুদ্রা বা অংশীদার দেশের মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। রাশিয়ার নতুন প্রস্তাবকে তাই শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। এটি মূলত ডলারনির্ভর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা তৈরির বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
বাংলাদেশ ও রাশিয়ার সম্পর্কের অন্যতম বড় ভিত্তি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প। এই প্রকল্পে রাশিয়ার দেওয়া বিপুল অঙ্কের ঋণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার কারণে দুই দেশের আর্থিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ঋণের কিস্তির অর্থ রাশিয়ায় পাঠাতে পারছে না। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ স্থানান্তর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। প্রথমদিকে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে অর্থ পরিশোধের একটি সম্ভাবনা বিবেচনায় এলেও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক ঝুঁকির কারণে সেই পথও বাস্তবায়ন করা যায়নি। ফলে আপাতত সোনালী ব্যাংকে রাশিয়ার নামে একটি হিসাবে অর্থ জমা রাখা হলেও তা রাশিয়ার ব্যাংকে পাঠানো সম্ভব হয়নি। এই অচলাবস্থা দীর্ঘমেয়াদে উভয় দেশের জন্যই অস্বস্তিকর।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় রুপিকে মধ্যবর্তী লেনদেনের মুদ্রা হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ভারতের সঙ্গে সীমিত পরিসরে রুপিতে বাণিজ্য পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। আবার ভারত ও রাশিয়াও তাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের একটি অংশ ভারতীয় রুপিতে সম্পন্ন করছে। ফলে বিদ্যমান সেই কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ-রাশিয়া বাণিজ্যেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
তবে শুধু মুদ্রা পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে সেই অর্থ নিরাপদে, দ্রুত এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বিধিনিষেধ মেনে স্থানান্তর করা যাবে। এ কারণেই রাশিয়া একটি স্বতন্ত্র পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে। এমন একটি ব্যবস্থা চালু হলে প্রচলিত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং নিষেধাজ্ঞাজনিত ঝুঁকিও অনেকাংশে হ্রাস পেতে পারে। তবে এ ধরনের অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রয়োজন হবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক আইনগত বিষয়গুলোর সতর্ক মূল্যায়ন।
ঢাকায় একটি রুশ ব্যাংকের শাখা চালুর প্রস্তাবও এই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিষয়টি আলোচনায় এলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক সে সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছিল, কিন্তু বিভিন্ন কূটনৈতিক ও আর্থিক বিবেচনায় উদ্যোগটি থেমে যায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। যদি একটি রুশ ব্যাংক বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে পারে, তাহলে দুই দেশের ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য অর্থ লেনদেন তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক সম্পর্ক এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য রাশিয়া শুধু একটি আমদানির উৎস নয়, বরং সম্ভাবনাময় রপ্তানি বাজারও। যুদ্ধের আগে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় বছরে ৫০ কোটিরও বেশি ডলারের পণ্য রপ্তানি হতো। তৈরি পোশাক ছিল এর প্রধান অংশ। কিন্তু অর্থ পরিশোধের জটিলতা এবং ব্যাংকিং সংকটের কারণে সেই রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই থেকে মে পর্যন্ত রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো রাশিয়া থেকে ইউরিয়া সার, গমসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য আমদানি করছে। অর্থাৎ বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, কিন্তু লেনদেনের জটিলতা এর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে।
রাশিয়ার নতুন প্রস্তাবে শুধু অর্থ লেনদেন নয়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল গঠন, নির্ভরযোগ্য বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের তালিকা তৈরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সহায়তার মতো উদ্যোগ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ যখন নতুন বাজার খুঁজছে এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিচ্ছে, তখন রাশিয়ার বাজারে পুনরায় শক্ত অবস্থান তৈরি করা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশও আসন্ন বৈঠকে নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। প্রযুক্তি হস্তান্তর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, ই-কমার্স, উদ্ভাবন, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, কানেক্টিভিটি ও লজিস্টিকস খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ক্ষেত্র শুধু বাণিজ্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় প্রতি টনে ১০ ডলার কম মূল্যে প্রায় দুই লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সার সরবরাহে রাশিয়ার আগ্রহ বাংলাদেশের কৃষিখাতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। পাশাপাশি সূর্যমুখী তেল, গম, ছোলা, হলুদ মটরশুঁটি এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল সরবরাহ বাড়ানোর আগ্রহ খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে মূল্য অস্থিরতার সময়ে এমন উদ্যোগ বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভারসাম্য রক্ষা করা। একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, চীনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশের সঙ্গে সম্পর্কও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই যেকোনো নতুন আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহণের আগে সম্ভাব্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
বিশ্ব অর্থনীতি এখন দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডলারনির্ভর একমুখী কাঠামো ধীরে ধীরে বহুমুদ্রাভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। যদিও ডলারের আধিপত্য এখনো অটুট, তবু বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনার উদ্যোগ ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সেই পরিবর্তনের একটি বাস্তব পরীক্ষা হতে পারে ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্যের এই প্রস্তাব।
শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সমন্বয়, আন্তর্জাতিক আর্থিক বিধিনিষেধ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প খোঁজার প্রবণতা আরও বাড়বে। বাংলাদেশের জন্যও এটি শুধু একটি লেনদেন পদ্ধতির পরিবর্তন নয়; বরং বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কৌশল, বাণিজ্য বৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ