
বাড়ির পাশেই আবু সাঈদের কবর। প্রায় প্রতিদিন সেখানে যান তার বাবা মকবুল হোসেন। সন্তানের জন্য দোয়া করেন, কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর ফিরে আসেন এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে প্রতিটি দিনই অসমাপ্ত স্বপ্নের হিসাব কষে কাটে। তিনি ভাবেন, ছেলে বেঁচে থাকলে হয়তো পড়াশোনা শেষ করত, একটি ভালো চাকরি পেত, সংসার করত, নাতি-নাতনির হাসিতে ভরে উঠত বাড়ি। একজন বাবা হিসেবে যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা এক বিকেলের গুলিতে থেমে গেছে। তাই আজও তিনি বলেন, সন্তানের শোকের আগুন নিভে যায়নি। সময় অনেক কিছু বদলে দেয়, কিন্তু সন্তান হারানোর বেদনা বদলায় না।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনের উত্তপ্ত এক দিনে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। সেই দিনটি কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার শেষ মুহূর্তের দৃশ্য মুহূর্তেই মানুষের আবেগকে নাড়িয়ে দেয়। অনেকেই মনে করেন, ওই ঘটনার পর আন্দোলন নতুন গতি পায়। যারা দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তারাও আরও সরব হয়ে ওঠেন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতে শুরু করেন।
আবু সাঈদ তখন কেবল একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ছিলেন না। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তার নাম উচ্চারিত হতে থাকে সমাবেশে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, দেয়াললিখনে এবং স্মরণসভায়। অনেকের কাছে তিনি সাহসের প্রতীক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক এবং তরুণদের আত্মত্যাগের একটি স্মরণীয় নাম। তার মৃত্যু এমন এক আবেগের জন্ম দেয়, যা আন্দোলনের বিস্তার ও জনসমর্থন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
তবে ইতিহাসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, যে ঐক্য সংকটের মুহূর্তে গড়ে ওঠে, তা সব সময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আন্দোলনের ভেতরে থাকা বিভিন্ন মত, লক্ষ্য ও প্রত্যাশার পার্থক্য ধীরে ধীরে সামনে আসে। আন্দোলনের নেতৃত্ব, কৃতিত্বের প্রশ্ন, ভবিষ্যৎ নির্বাচন, রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও মতভেদ তৈরি হয়। যে ঐক্য একসময় একটি অভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে দৃশ্যমান হয়েছিল, পরে সেটি নানা বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।
এমন পরিবর্তন রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন নয়। কোনো গণআন্দোলনের সময় সাধারণত একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য মানুষকে একত্র করে। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণের পর ভবিষ্যতের পথ নিয়ে ভিন্নমত তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। আন্দোলনের সময় একসঙ্গে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠী পরবর্তী সময়ে নিজেদের অবস্থান, অগ্রাধিকার এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে আলাদা পথে হাঁটতে শুরু করে। ফলে আন্দোলনের সময়কার আবেগের জায়গা দখল করে বাস্তব রাজনীতি।
কিন্তু এসব রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—যাদের আত্মত্যাগ আন্দোলনের ইতিহাসে জায়গা করে দিয়েছে, তাদের পরিবারের জীবন কতটা বদলেছে? মনোয়ারা বেগমের প্রতিদিনের জীবন কিংবা মকবুল হোসেনের নীরব দীর্ঘশ্বাস সেই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজে। জাতীয় পর্যায়ে আবু সাঈদের নাম নিয়ে আলোচনা হয়, তার ছবি নিয়ে পোস্টার তৈরি হয়, তাকে স্মরণ করে নানা অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু একটি পরিবারের কাছে তিনি কোনো প্রতীক নন; তিনি তাদের সন্তান। একজন মা আজও রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে হয়তো ভাবেন, ছেলে থাকলে কী খেতে চাইত। একজন বাবা আজও বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে কল্পনা করেন, হয়তো এই পথ দিয়েই ছেলে ফিরে আসবে।
আন্দোলনের ইতিহাস সাধারণত বড় বড় ঘটনাকে মনে রাখে। কিন্তু ইতিহাসের আড়ালে থেকে যায় ছোট ছোট ব্যক্তিগত গল্প। একটি খালি চেয়ার, একটি ব্যবহার না হওয়া বই, আলমারিতে ভাঁজ করে রাখা জামা কিংবা একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি—এসবই হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া মানুষের নীরব উপস্থিতি। রাষ্ট্র ও সমাজ যখন বড় পরিবর্তনের হিসাব কষে, তখন একটি পরিবার প্রতিদিন শূন্যতার সঙ্গে নতুন করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
আবু সাঈদের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের তরুণ সমাজে প্রতিবাদের ভাষাও নতুন মাত্রা পায়। অনেকে মনে করেন, তার ঘটনা দেখিয়েছে যে একটি মুহূর্ত কখনো কখনো পুরো রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বদলে দিতে পারে। আবার অনেকে বলেন, সেই পরিবর্তনকে অর্থবহ করতে হলে কেবল আবেগ নয়, প্রয়োজন জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি স্থায়ী অঙ্গীকার। কারণ কোনো আন্দোলনের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় কেবল তার তাৎক্ষণিক সাফল্যে নয়, বরং সেই আন্দোলন ভবিষ্যতের রাষ্ট্র ও সমাজকে কতটা ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তার ওপর।
আজও যখন জুলাই মাস ফিরে আসে, তখন আবু সাঈদের নাম নতুন করে উচ্চারিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার ছবি, মানুষ স্মরণ করে সেই উত্তাল দিনগুলো। কিন্তু এসব স্মরণের ভিড়ে সবচেয়ে নিঃশব্দ দৃশ্যটি হয়তো রংপুরের সেই বাড়িতে। একজন মা ফ্রেমে বাঁধানো ছোট্ট ছবিটি হাতে তুলে নেন। একজন বাবা সন্তানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে দোয়া করেন। তাদের কাছে জুলাই মানে কেবল একটি আন্দোলনের ইতিহাস নয়, একটি অপূরণীয় ব্যক্তিগত ক্ষতির মাস।
রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু মানুষ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতীকে পরিণত হন। কিন্তু প্রতিটি প্রতীকের পেছনে থাকে একজন বাস্তব মানুষ, একটি পরিবার এবং অসংখ্য অপূর্ণ স্বপ্ন। আবু সাঈদের জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি ছিলেন একজন তরুণ, যার সামনে ছিল ভবিষ্যতের অসংখ্য সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনার জায়গায় এখন রয়েছে একটি কবর, একটি ফ্রেমে বাঁধানো ছবি এবং বাবা-মায়ের না ফুরোনো অপেক্ষা।
সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্ক বদলাবে, নতুন ইস্যু আসবে, নতুন আন্দোলন হবে। ইতিহাস নতুন অধ্যায় লিখবে। কিন্তু যে মা প্রতিদিন ছবির ধুলো মুছে সন্তানের মুখ দেখেন এবং যে বাবা প্রতিদিন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের অসমাপ্ত হিসাব কষেন, তাদের কাছে সময় যেন থেমে আছে ১৬ জুলাইয়ের সেই বিকেলেই। দেশের মানুষ হয়তো আবু সাঈদকে একজন আন্দোলনের শহীদ হিসেবে মনে রাখবে, কিন্তু তার বাবা-মা তাকে মনে রাখবেন সেই ছেলেটি হিসেবে, যে একদিন বই হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিল এবং আর কোনো দিন ঘরে ফিরে আসেনি। হয়তো এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর সত্য—একটি জাতির সংগ্রামের গল্প শেষ পর্যন্ত এসে মিশে যায় একটি পরিবারের নীরব কান্নায়।
আপনার মতামত জানানঃ