
ছয় দশকের পুরোনো এক স্বপ্ন আবারও ফিরে এসেছে আলোচনায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঢাকা–কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। এটি বাস্তবায়িত হলে ট্রেনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগবে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টা—বর্তমান পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার তুলনায় প্রায় দুই ঘণ্টা কম।
ভালো খবর হলেও, রেল খাতের বিশ্লেষকরা একইসঙ্গে সতর্ক করছেন: লাইন বসানো একটি কাজের শুরু, সমাপ্তি নয়। বাজেট বক্তৃতায় প্রকল্পের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ, সম্ভাব্য ব্যয় বা বাস্তবায়নের সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি—যা এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কেন কর্ড লাইন এত গুরুত্বপূর্ণ?
দূরত্ব ও সময় সাশ্রয়
বর্তমানে সড়কপথে ঢাকা-চট্টগ্রামের দূরত্ব ২৪৮ কিলোমিটার হলেও রেলপথে তা ৩২০ কিলোমিটার। ট্রেনগুলোকে টঙ্গী, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আখাউড়া ঘুরে যেতে হয়, যা প্রায় ৭০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ। প্রস্তাবিত কর্ড লাইন নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুর থেকে কুমিল্লার লালমাই পর্যন্ত সরাসরি সংযোগ তৈরি করবে, যার ফলে দূরত্ব কমবে ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার।
পণ্য পরিবহনে সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকল্পটির আসল গুরুত্ব যাত্রী পরিবহনে নয়, পণ্য পরিবহনে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ বাণিজ্য সম্পন্ন হয়। বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে এই চাপ আরও বাড়বে। কর্ড লাইন চালু হলে বন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রেন সরাসরি ধীরাশ্রম আইসিডির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে—যা একটি সুনির্দিষ্ট পণ্য করিডোর তৈরি করবে。
পুরোনো স্বপ্নের নতুন মোড়ক
ছয় দশকের ইতিহাস
ঢাকা–চট্টগ্রাম কর্ড লাইনের ধারণা নতুন নয়। এটি প্রথম দাপ্তরিক রূপ পায় ১৯৬৮-৬৯ সালে, তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় প্রকল্পটি চাপা পড়ে যায়।
এরপর:
-
১৯৭৫-৭৬ সালে ট্রাফিক জরিপ করা হয়
-
১৯৮০-এর দশকে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়, কিন্তু স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে স্থগিত
-
১৯৯৮-৯৯ সালে ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দের সুপারিশ
-
২০০৬ সালে আরেকটি জরিপে ব্যয় ধরা হয় ২৫,৮০০ কোটি টাকা
-
২০১৮ সালে উচ্চগতির বুলেট ট্রেনের স্বপ্ন দেখানো হয়, পরে বাদ দেওয়া হয়
-
২০২১ ও ২০২৩ সালেও আলোচনা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি
এবারের বাজেট ঘোষণা এই দীর্ঘ ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায়।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
১. ভূ-প্রকৃতি ও মেঘনা নদী
প্রস্তাবিত পথটি নারায়ণগঞ্জ, গজারিয়া ও দাউদকান্দির নরম পলিমাটির ওপর দিয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় বাধা মেঘনা নদী—যার তলদেশ প্রতিবছর সরে যায়, ফলে পাইলিং করতে হয় অনেক গভীরে। প্রকল্পের খরচের সিংহভাগই লুকিয়ে আছে এই নদী পারাপারের লড়াইয়ে।
২. জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন
এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ ও উর্বর কৃষিজমিতে ভরা। জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন জটিলতা বাংলাদেশের বড় প্রকল্প পিছিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। নকশা যতই নিখুঁত হোক, এই ধাপে আটকে গেলে বছরের পর বছর কেটে যায়।
৩. ইঞ্জিন ও ওয়াগন সংকট
সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা সম্ভবত এটিই: কর্ড লাইন নতুন পথ দেবে, কিন্তু সেই পথে চালানোর মতো ইঞ্জিন ও ওয়াগন না থাকলে নতুন লাইনও খালি পড়ে থাকবে।
রেলওয়ের পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক:
-
পণ্য পরিবহন থেকে আয় গত বছর ৭২ কোটি টাকা থেকে কমে ৬৫ কোটিতে নেমেছে, অথচ লক্ষ্য ছিল ২২৭ কোটি টাকা
-
পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা এক বছরে প্রায় অর্ধেক (১,৮৩৮ থেকে ৯৮৫) কমেছে
-
প্রতিদিন গড়ে ১৩টি ইঞ্জিন প্রয়োজন, কিন্তু পাওয়া যায় তিন-চারটি
রেলের কর্মকর্তারাই বলছেন, ইঞ্জিন নেই বলে পণ্য পড়ে থাকে, ব্যবসায়ীরা আস্থা হারিয়ে ফের সড়কে ফিরে যান।
ডিপিপিতেই আসল উত্তর
বাজেট ঘোষণায় দুটো ফাঁকা ঘর রয়েছে:
১. আলাদা কোনো বরাদ্দ, সম্ভাব্য খরচ বা সময়সীমা বলা হয়নি—আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এসব না থাকলে প্রকল্প বছরের পর বছর সম্ভাব্যতা যাচাই আর নকশার ঘরেই ঘুরপাক খায়। আগামী বছরের জুনের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। সেটাই আসল পরীক্ষা।
২. রেল ও সড়ক—প্রতিযোগী নাকি সহযোগী? পাশের মহাসড়কে ১০ লেনের এক্সপ্রেসওয়ের দাবি উঠেছে। দুটোতেই একসঙ্গে বিপুল টাকা ঢাললে দুটোই অর্ধেক ভরা থাকবে। ভারী পণ্য ও কনটেইনার যাক রেলে, দ্রুত ও ছড়ানো পণ্য যাক সড়কে।
উপসংহার: স্বপ্ন সফল হবে?
কর্ড লাইন একটি যুক্তিসংগত প্রকল্প, অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। সময় বাঁচবে, পথ ছোট হবে, পুরোনো লাইনের চাপ কমবে, বন্দরের পণ্য রেলে তোলার পরিষ্কার রাস্তা তৈরি হবে। কিন্তু সাফল্যের জন্য তিনটি জিনিস দরকার:
১. পরিচালন সংস্কার—ইঞ্জিন ও ওয়াগনের সংকট না মিটলে নতুন লাইন খালি পড়ে থাকবে
২. নির্ভরযোগ্য খরচ-সুবিধা যাচাই—মেঘনা সেতু ও জমির খরচ ধরে প্রকল্পটি সত্যিই লাভজনক কি না
৩. জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন আগেভাগে গুছিয়ে নেওয়া
ছয় দশক আগে যে ফাইল খোলা হয়েছিল, এবার তা সত্যিই মাটিতে নামলে এটি হবে বাংলাদেশের পরিবহন ইতিহাসের এক বড় অধ্যায়। আর যদি আবার সুন্দর নকশা আর বক্তৃতায় আটকে থাকে, তবে এটি হবে পুরোনো এক স্বপ্নের আরেকটা নতুন মোড়ক। উত্তর থাকুক ডিপিপিতে, খরচের অঙ্কে, আর প্রথম দিন যে ইঞ্জিন পণ্যবাহী ট্রেন টেনে নেবে তার নিশ্চয়তায়।
আপনার মতামত জানানঃ