একটি শিশু যখন স্কুলে যায়, তখন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে—সে নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করবে, নতুন কিছু শিখবে এবং সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে। কিন্তু যদি সেই স্কুলের পাশেই থাকে এমন একটি শিল্পকারখানা, যেখানে ব্যবহৃত সিসাযুক্ত ব্যাটারি (Used Lead-Acid Battery বা ULAB) ভেঙে গলানো হয়? যদি প্রতিদিন বাতাস, মাটি ও ধুলার সঙ্গে শিশুর শরীরে অজান্তেই প্রবেশ করে বিষাক্ত সিসা? তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরাপদ আশ্রয় না হয়ে পরিণত হতে পারে অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কেন্দ্রে।
বিশ্বজুড়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা বহু বছর ধরেই সিসা দূষণকে “নীরব মহামারি” হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছেন। কারণ এই দূষণের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি শিশুদের মস্তিষ্ক, শেখার ক্ষমতা, আচরণ এবং শারীরিক বিকাশের ওপর স্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশেও এই ঝুঁকি ক্রমেই আলোচনায় আসছে, বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার শিল্পের কারণে।
বাংলাদেশে গাড়ি, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এসব ব্যাটারির আয়ুষ্কাল শেষ হলে সেগুলো পুনর্ব্যবহার করা হয়। কিন্তু দেশের বহু এলাকায় এই পুনর্ব্যবহার হয় অনানুষ্ঠানিক ও অনিরাপদ উপায়ে। খোলা জায়গায় ব্যাটারি ভাঙা, সিসা গলানো এবং কোনো ধরনের পরিবেশ সুরক্ষা ছাড়াই বর্জ্য ফেলে দেওয়ার ফলে আশপাশের বাতাস, মাটি ও পানি দূষিত হয়।
এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন ক্ষুদ্র সিসা কণা বাতাসে ভেসে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরে সেগুলো মাটিতে জমা হয়, কৃষিজমিতে মিশে যায়, এমনকি শিশুদের খেলাধুলার স্থানেও পৌঁছে যায়। শিশুরা হাত-মুখে মাটি বা ধুলা লাগিয়ে কিংবা দূষিত বাতাস শ্বাসের মাধ্যমে সিসা গ্রহণ করতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। অল্প পরিমাণ সিসাও মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুর স্নায়ুতন্ত্র তখনও বিকাশমান থাকায় তারা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সিসা শরীরে প্রবেশ করলে তা রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্ক, কিডনি, হাড় এবং অন্যান্য অঙ্গে জমা হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, সিসা দূষণের কারণে শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা, ভাষা শেখা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা কমে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আচরণগত পরিবর্তন, অতিরিক্ত চঞ্চলতা, শেখার আগ্রহ কমে যাওয়া এবং বিদ্যালয়ের ফলাফলেও এর প্রভাব পড়ে।
শুধু স্বাস্থ্য নয়, সিসা দূষণ একটি অর্থনৈতিক সমস্যাও। গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে সিসার সংস্পর্শে আসা মানুষের কর্মক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ আয় কমে যেতে পারে। ফলে একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশে ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার শিল্পের বড় অংশই এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে পরিচালিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন বা আধুনিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়াই অনেক কারখানা পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে অদৃশ্য দূষণের মধ্যে বসবাস করেন।
পরিবেশবিদদের মতে, সমস্যার মূল কারণ শুধু শিল্পকারখানার অস্তিত্ব নয়; বরং সেগুলোর অনিয়ন্ত্রিত পরিচালনা। উন্নত দেশগুলোতেও ব্যবহৃত ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার করা হয়, তবে সেখানে কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড, নিরাপদ প্রযুক্তি, শ্রমিক সুরক্ষা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশেও যদি একই ধরনের মানদণ্ড কার্যকর করা যায়, তাহলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষায় নিয়মিত পরিবেশগত পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এলাকায় ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র থাকলে সেখানে মাটি, ধুলা ও পানিতে সিসার মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত। প্রয়োজন হলে আশপাশের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রাও পরীক্ষা করা যেতে পারে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, শিল্প এলাকা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে স্কুল, হাসপাতাল এবং আবাসিক এলাকার নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। নতুন কোনো ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প স্থাপনের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (Environmental Impact Assessment) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
সচেতনতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক শ্রমিক জানেন না সিসা কতটা ক্ষতিকর। অনেক পরিবারও বুঝতে পারেন না কেন তাদের সন্তান বারবার অসুস্থ হচ্ছে বা পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে। তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিদ্যালয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, হাত ধোয়ার অভ্যাস, ধুলাবালি এড়ানো এবং দূষণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিতে পারেন। যদিও এটি সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়, তবুও সচেতনতা ঝুঁকি কিছুটা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি বৃদ্ধি, ঝরে পড়ার হার কমানো এবং শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে দেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তবে শিক্ষার মান শুধু পাঠ্যবই, শিক্ষক বা ভবনের ওপর নির্ভর করে না। একটি শিশুর শেখার ক্ষমতা তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদি পরিবেশই বিষাক্ত হয়ে ওঠে, তাহলে শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফলও সীমিত হয়ে পড়বে।
আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ে উঠবে আজকের শিশুদের হাত ধরে। তাই তাদের জন্য নিরাপদ স্কুল, নির্মল বাতাস এবং দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু স্বাস্থ্যগত দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় উন্নয়ন কৌশলও। ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার শিল্পকে পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই, কিন্তু সেটিকে অবশ্যই নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত এবং পরিবেশবান্ধব করতে হবে।
কারণ একটি শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে গড়ে ওঠে না; গড়ে ওঠে সেই বাতাসে, যে বাতাস সে প্রতিদিন শ্বাস নেয়, সেই মাটিতে, যেখানে সে খেলাধুলা করে, এবং সেই পরিবেশে, যা তাকে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন প্রতিটি স্কুল হবে শুধু শিক্ষার নয়, নিরাপদ ভবিষ্যতেরও প্রতীক।
আপনার মতামত জানানঃ