বাংলাদেশে হাম একসময় প্রায় নির্মূলের পথে থাকা একটি রোগ হিসেবে বিবেচিত হতো। টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য ছিল দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে, উন্নয়ন সহযোগীরা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিকে। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, সিদ্ধান্তহীনতা, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, বিদেশি ঋণের ওপর অযৌক্তিক নির্ভরতা এবং একের পর এক সতর্কবার্তা উপেক্ষার ফলে সেই সাফল্যের গল্প আজ পরিণত হয়েছে জাতীয় ট্র্যাজেডিতে।
সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭৫ জনে। এর মধ্যে ৯০ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামে হয়েছে। আরও ৪৮৫ জন মারা গেছে হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে। আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ৬৮ হাজার ৫৭৯ জনে, যার মধ্যে ৮ হাজার ৯৪৩ জনের ক্ষেত্রে হাম নিশ্চিত হয়েছে। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; এগুলো শত শত পরিবারের শোক, অসংখ্য শিশুর অপূর্ণ জীবন এবং একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নির্মম সাক্ষ্য।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই মৃত্যুগুলো কি অনিবার্য ছিল?
উপলব্ধ নথিপত্র, সরকারি চিঠি, বৈঠকের কার্যবিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে যে চিত্র সামনে আসে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেখা যায়, সংকটটি কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। এটি গড়ে উঠেছে মাসের পর মাস ধরে। সতর্কবার্তা ছিল, পূর্বাভাস ছিল, বিকল্প পথও ছিল। কিন্তু ছিল না সময়মতো সিদ্ধান্ত।
২০২৫ সালের ২১ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডা. আফরিনা মাহমুদ ইউনিসেফকে একটি জরুরি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি সতর্ক করেন যে বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিশুটিকার মজুত মাত্র ৩৯ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। নতুন টিকা কেনার অর্থ সরকারের হাতে নেই। এমনকি পরবর্তী অর্থবছরের আগে অর্থ ছাড়ও সম্ভব নয়। তাই তিনি ইউনিসেফকে জরুরি ভিত্তিতে টিকা সরবরাহের অনুরোধ জানান।
কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। যখন মাত্র ৩৯ দিনের মজুত অবশিষ্ট ছিল, তখন কেন এই সতর্কবার্তা পাঠানো হলো? টিকা সংগ্রহের মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার জন্য কেন তার অনেক আগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
ইউনিসেফ জানিয়ে দেয়, জরুরি চালান প্রস্তুত করে পাঠাতে তাদের অন্তত ১৬ সপ্তাহ সময় প্রয়োজন। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য প্রশাসন যখন সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়েছে, তখন বাস্তবে সংকট প্রায় দরজায় কড়া নাড়ছিল। ফলাফল ছিল ভয়াবহ। প্রথম জরুরি চালান দেশে পৌঁছায় নির্ধারিত সময়ের ৫৭ দিন পরে।
এই ৫৭ দিনের ব্যবধানই ছিল আসন্ন বিপর্যয়ের সূচনা।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির বাজেটই চূড়ান্ত করা হয়নি নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত। ১ জুলাই অর্থবছর শুরু হলেও ৯ জুলাই গিয়ে কর্মকর্তারা বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নেন যে টিকা কেনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে হবে।
অর্থাৎ যে কর্মসূচির সঙ্গে কোটি কোটি শিশুর স্বাস্থ্য জড়িয়ে, সেই কর্মসূচির অর্থায়ন পরিকল্পনা সম্পন্ন হয়েছে অর্থবছর শুরু হওয়ার পর।
এখানেই সামনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত পরিচালিত হতো একটি সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায়। টিকা কেনার অর্থও সেখান থেকেই আসত। কিন্তু সেই কাঠামো বাতিল করে টিকা সংগ্রহকে সাধারণ রাজস্ব বাজেটের আওতায় আনা হয়। ফলে অর্থ ছাড়ের পুরো প্রক্রিয়া আরও ধীর, আরও জটিল এবং আরও আমলাতান্ত্রিক হয়ে ওঠে।
স্বাস্থ্য খাতের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছিল। আর সেই ব্যর্থতার মূল্য পরিশোধ করেছে দেশের শিশুরা। কিন্তু সংকটের মূল কেন্দ্র ছিল আরেকটি সিদ্ধান্ত।
জুলাই মাসে বাজেট চূড়ান্ত করার সময় কর্মকর্তারা ধরে নেন যে প্রয়োজনীয় অর্থের প্রায় অর্ধেক আসবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একটি অব্যবহৃত ঋণ থেকে। মূলত কোভিড-১৯ টিকা কেনার জন্য নেওয়া ঋণের অবশিষ্ট অর্থ নিয়মিত শিশু টিকা কেনার কাজে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হয়। সমস্যা হলো, সেই অর্থ তখনও অনুমোদিত ছিল না।
সরকার ধরে নিয়েছিল অনুমোদন পাওয়া সহজ হবে। ইউনিসেফও একই ধারণা পোষণ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে এডিবি প্রায় চার মাস সময় নেয় জবাব দিতে। পরে তারা জানায়, অর্থ সরাসরি ব্যবহার করা যাবে না। প্রথমে অর্থ ফেরত দিতে হবে, নতুন চুক্তি করতে হবে, তারপর নতুন করে অর্থ ছাড় হবে।
ফলে যে টিকা জুলাই ২০২৫-এ দেশে পৌঁছানোর কথা ছিল, তা মার্চ ২০২৬-এর আগে পাওয়ার সম্ভাবনাই শেষ হয়ে যায়।
প্রশ্ন হলো, একটি জাতীয় জীবনরক্ষাকারী কর্মসূচিকে কেন এমন অর্থের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছিল, যার অনুমোদন তখনও নিশ্চিত ছিল না?
স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই ভুল হিসাবই পুরো সংকটকে ত্বরান্বিত করে।
এদিকে মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্য সহকারীরা বিভিন্ন দাবিতে বারবার কর্মবিরতিতে যান। জেলা পর্যায় থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একাধিক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয় যে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিশুদের একটি বড় অংশ নির্ধারিত সময়ে টিকা পাচ্ছে না।
অর্থাৎ একদিকে টিকার ঘাটতি, অন্যদিকে টিকাদান ব্যবস্থার অচলাবস্থা—দুই সংকট একসঙ্গে আঘাত হানতে শুরু করে।
হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি অনেককে সংক্রমিত করতে পারে। ফলে টিকাদান কর্মসূচিতে সামান্য ঘাটতিও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করতে পারে।
ইউনিসেফ আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে তিন দফায় জরুরি টিকা পাঠায়। কিন্তু সেই সরবরাহ দেশের মোট চাহিদার মাত্র আড়াই মাস পূরণ করতে সক্ষম হয়। ফলে ঘাটতি থেকেই যায়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। ইউনিসেফ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে দেশের টিকা মজুত কার্যত শেষ হয়ে গেছে এবং নতুন চালান এপ্রিলের আগে পৌঁছাবে না।
এরপর সংক্রমণ ও মৃত্যু দ্রুত বাড়তে থাকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যেসব শিশুর মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামে হয়েছে, তাদের বড় অংশের টিকা গ্রহণের সময়সূচি পড়েছিল সংকটকালীন পর্যায়ে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি। আবার অনেক শিশুর ক্ষেত্রে প্রথম বা দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি।
এ তথ্য সরাসরি প্রমাণ করে না যে প্রতিটি মৃত্যু টিকা সংকটের কারণেই ঘটেছে। কিন্তু এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে টিকার ঘাটতি, প্রশাসনিক বিলম্ব এবং শিশু মৃত্যুর মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দায় কার? এই সংকটের জন্য কি একজন ব্যক্তি দায়ী? উপলব্ধ তথ্য বলছে, না। এটি ছিল সম্মিলিত প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সময়মতো পরিকল্পনা করতে পারেনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সময়মতো অর্থ ছাড় নিশ্চিত করতে পারেনি। অর্থ মন্ত্রণালয় একটি অনিশ্চিত বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করেছে। এডিবির অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছে। সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা দ্রুত করা হয়নি। এমনকি জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ইউনিসেফ একাধিকবার লিখিতভাবে সতর্ক করার পরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংকট যখন গভীর হচ্ছিল, তখনও প্রশাসনের একটি অংশ টিকা কেনার পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কে ব্যস্ত ছিল। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনা হবে, নাকি ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি কেনা হবে—এই বিতর্কে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে। পরে সিদ্ধান্ত বদলানো হলেও ততদিনে সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে নির্মম দিক হলো, হামে মারা যাওয়া বহু শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।
হামের টিকা বহু দশক ধরে ব্যবহৃত, নিরাপদ এবং কার্যকর। বাংলাদেশ নিজেই একসময় এই রোগকে প্রায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু প্রশাসনিক গাফিলতি, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব সেই অর্জনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
একটি রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব তার নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। আর শিশুদের ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব আরও বড়। যখন জীবনরক্ষাকারী টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় না, যখন মাসের পর মাস সতর্কবার্তা উপেক্ষিত হয়, যখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা জনস্বাস্থ্য সংকটের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন সেটি শুধু স্বাস্থ্য খাতের ব্যর্থতা নয়; সেটি রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতা।
আজ প্রশ্ন একটাই—৫৭৫টি মৃত্যুর পর কি কেউ দায় স্বীকার করবে?
কে জবাব দেবে সেই বাবা-মায়ের কাছে, যারা একটি টিকা পেলে হয়তো সন্তানকে হারাতেন না?
কে ব্যাখ্যা করবে কেন সময়মতো অর্থ ছাড় হলো না?
কে বলবে কেন সতর্কবার্তাগুলো গুরুত্ব পেল না?
কে ব্যাখ্যা করবে কেন একটি সম্ভাব্য সংকটকে নিশ্চিত বিপর্যয়ে পরিণত হতে দেওয়া হলো?
কারণ এই শিশুদের মৃত্যু কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়। এটি ছিল ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। এখানে সতর্কবার্তা ছিল, তথ্য ছিল, পূর্বাভাস ছিল, বিকল্প ছিল। অনুপস্থিত ছিল শুধু সময়মতো সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর নেতৃত্ব।
আর কখনও কখনও, একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা পরিসংখ্যানে নয়, কবরস্থানে দৃশ্যমান হয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক হাম সংকট সেই নির্মম সত্যেরই আরেকটি স্মারক।
আপনার মতামত জানানঃ