রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগও। একটি সন্তানের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এখন অনেক পরিবারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এ চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। সরকারি বিদ্যালয়ের সীমিত উপস্থিতি, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চ ব্যয় এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচের কারণে বহু পরিবার এখন বিকল্প পথ খুঁজছে। সেই বিকল্পের অন্যতম প্রধান নাম হয়ে উঠেছে মাদরাসা।
একসময় মাদরাসা শিক্ষা মূলত ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ঢাকার বহু মাদরাসা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিষয়ও পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করছে। ফলে অনেক অভিভাবক মনে করছেন, তুলনামূলক কম খরচে সন্তানকে ধর্মীয় ও সাধারণ—দুই ধরনের শিক্ষাই দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মো. আহসানুল কবিরের অভিজ্ঞতা অনেক পরিবারের বাস্তবতার প্রতিফলন। তিনি তার ছয় বছর বয়সী সন্তানকে একটি স্থানীয় মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বাসার আশপাশে সরকারি বিদ্যালয়ের অভাব এবং বেসরকারি বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত খরচ। মাসে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করে সন্তানকে কিন্ডারগার্টেনে পড়ানোর সামর্থ্য তার মতো বহু চাকরিজীবী পরিবারের নেই। ফলে কম ব্যয়ে শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ থাকায় মাদরাসা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ কিংবা উত্তরার কিছু অংশে অল্প দূরত্বের মধ্যে একাধিক মাদরাসা পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট বা ভাড়া করা ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে একই এলাকায় একটি সরকারি বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এটি অনেক অভিভাবকের জন্য বড় সমস্যা।
নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সবজি বিক্রেতা, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস কর্মী কিংবা দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে মাসে কয়েক হাজার টাকা বেতন, পরিবহন ব্যয় এবং অতিরিক্ত কোচিং খরচ বহন করা কঠিন। ফলে তারা এমন প্রতিষ্ঠান খোঁজেন যেখানে ব্যয় কম, বাড়ির কাছাকাছি এবং শিক্ষার পরিবেশ মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। অনেকের মতে, মাদরাসা তাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে।
ঢাকার শিক্ষা বাস্তবতায় সরকারি বিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। রাজধানীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ হলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা সেই তুলনায় অনেক কম। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, শহরের বিস্তৃত জনসংখ্যার তুলনায় সরকারি শিক্ষা অবকাঠামো প্রয়োজনীয় হারে বৃদ্ধি পায়নি। নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠলেও অনেক জায়গায় সরকারি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এগুলোর মধ্যে ব্যয়ের ক্ষেত্রে বড় বৈচিত্র্য রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের মধ্যে থাকলেও অনেক বিদ্যালয়ের খরচ সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব। ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, বই, ইউনিফর্ম, পরিবহন এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থীর জন্য মাসে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হয়।
মাদরাসাগুলোর আরেকটি আকর্ষণ হলো ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ। বাংলাদেশের সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক অভিভাবক চান সন্তান আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াত, ইসলামি নৈতিকতা এবং ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করুক। মাদরাসাগুলো এই চাহিদা পূরণে সচেষ্ট। ফলে ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত ধারণা অভিভাবকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় শিক্ষাক্রমে একাধিক পরিবর্তনও অভিভাবকদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। পাঠ্যবই, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষানীতির ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে কিছু অভিভাবকের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তারা এমন প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে আগ্রহী যেখানে শিক্ষার ধরন তুলনামূলক স্থিতিশীল এবং মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়। মাদরাসাগুলোর একটি অংশ এই সুযোগটি কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে।
তবে মাদরাসার সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে কেবল অভিভাবকদের চাহিদাই কাজ করছে না। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় দানশীল ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের অনুদানের মাধ্যমেও এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। ফলে কম খরচে শিক্ষা প্রদান সম্ভব হচ্ছে। একটি বেসরকারি বিদ্যালয় পরিচালনায় যেখানে বিপুল ব্যয় প্রয়োজন হয়, সেখানে অনুদাননির্ভর মাদরাসাগুলো তুলনামূলক কম ব্যয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
তবে এই প্রবণতার ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও রয়েছে। শিক্ষাবিদদের একটি অংশ মনে করেন, দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধির কারণে সব প্রতিষ্ঠানে সমমানের শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার কিংবা প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশও নিশ্চিত করা হয় না। ফলে শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু মাদরাসা নয়, সব ধরনের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। কারণ শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুর সামগ্রিক বিকাশ। একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হলে তার জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক সক্ষমতা সমানভাবে উন্নত করতে হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো ও মানসম্পন্ন শিক্ষক অপরিহার্য।
অন্যদিকে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোও জরুরি। অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে দক্ষ শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, শিক্ষার্থীসংখ্যার চাপ এবং আধুনিক সুবিধার ঘাটতির কারণে অভিভাবকরা সেগুলোকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচনা করেন না। যদি বিদ্যালয়গুলোর সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা যায় এবং শিক্ষার মান আরও উন্নত করা সম্ভব হয়, তাহলে অনেক পরিবার আবার সরকারি শিক্ষার দিকে ঝুঁকতে পারে।
ঢাকার দ্রুত নগরায়ণের ফলে নতুন নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠছে। এসব এলাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা অনেক সময় জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোয় না। ফলে একটি এলাকায় হাজার হাজার পরিবার বসবাস করলেও সেখানে পর্যাপ্ত সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকে না। এই শূন্যস্থান পূরণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং মাদরাসাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শিক্ষা নির্বাচন এখন কেবল একাডেমিক বিষয় নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি পরিবার তার আয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা বিবেচনা করে সন্তানের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করে। ফলে মাদরাসামুখী হওয়ার প্রবণতাকে শুধুমাত্র ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করলে বাস্তব চিত্র পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে অর্থনৈতিক সামর্থ্য, অবকাঠামোগত সংকট এবং সামাজিক প্রত্যাশা।
বর্তমান পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—রাজধানীর মতো একটি মহানগরে সবার জন্য মানসম্মত এবং সহজলভ্য প্রাথমিক শিক্ষা কতটা নিশ্চিত করা গেছে? যখন বিপুলসংখ্যক পরিবার শুধুমাত্র কম খরচের কারণে একটি নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন সেটি শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতারও ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য কমানো। একটি শিশুর পরিবার ধনী না দরিদ্র, সে কোন এলাকায় বসবাস করে কিংবা তার অভিভাবকের আয় কত—এসব বিষয় যেন তার শিক্ষার মান নির্ধারণ না করে। এজন্য প্রয়োজন আরও বেশি সরকারি বিদ্যালয়, উন্নত অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা।
ঢাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাদরাসামুখী হওয়ার প্রবণতা তাই কেবল একটি শিক্ষাগত পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি নগর জীবনের অর্থনৈতিক চাপ, সরকারি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের গুরুত্ব এবং অভিভাবকদের বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তের সম্মিলিত প্রতিফলন। যতদিন না রাজধানীর প্রতিটি শিশুর জন্য সহজলভ্য, মানসম্মত এবং সাশ্রয়ী শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, ততদিন মাদরাসা অনেক পরিবারের কাছে শুধু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং শিক্ষার একটি প্রয়োজনীয় আশ্রয় হিসেবেই থেকে যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ