ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে বিচার মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা। দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, শেখ হাসিনা সরাসরি দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান এবং ইতোমধ্যে তার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই খবর নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, শেখ হাসিনা আত্মগোপনে বা নির্বাসনে থাকতে চান না। বরং তিনি দেশে ফিরে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের জবাব দিতে আগ্রহী। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, শেখ হাসিনা যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরতে চান এবং তার ফেরাকে ঘিরে বড় ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, তিনি যেভাবে দেশ ছেড়েছিলেন, সেভাবেই “বীরের বেশে” ফিরে আসবেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে এই ঘোষণাকে বাস্তব পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, চরম চাপে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ রাখতেই এমন বক্তব্য সামনে আনা হচ্ছে। কারণ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান বড় ধরনের সংকটে পড়ে। সেই আন্দোলনের মুখেই শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আদালতের রায়ে তাকে গণহত্যা, হত্যার নির্দেশ ও উসকানির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দুর্নীতি, গুম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পূর্বাচল প্লট কেলেঙ্কারিসহ আরও একাধিক মামলার মুখোমুখি তিনি।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ভারত সরকারকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানানো হয়েছে। এমনকি প্রয়োজনে তিনি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে ট্রাভেল পাসের আবেদনও করতে পারেন। সম্প্রতি এক ভার্চুয়াল বৈঠকে শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, “এই বয়সে আর কতদিন বাঁচবো? দেশের গণতন্ত্রের জন্য ফাঁসির মঞ্চে উঠতেও আমার আফসোস থাকবে না।”
২০২৪ সালের পাঁচ আগস্ট সেনা তত্ত্বাবধানে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। এরপর আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা দেশ ছেড়ে যান কিংবা আত্মগোপনে চলে যান। পরে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে। চলতি বছরের এপ্রিলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনের মাধ্যমে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার আইনি ভিত্তিও তৈরি হয়। ফলে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের বড় অংশ এখন মামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক ও আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ভারত থেকে শেখ হাসিনা নিয়মিত দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে। তিনি নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজও শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানককে তৃণমূল পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও দলীয় সূত্রে জানা যায়।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সরকার শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়। ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের অনুরোধও জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমেই দলকে সক্রিয় রেখেছেন এবং এখনও সেই কৌশলই অনুসরণ করছেন। তার মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো সরকার তাকে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করতে পারে কি না।
তবে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, শেখ হাসিনা শুধুমাত্র নিরাপত্তার কারণে দেশ ছেড়েছিলেন। এখন যদি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়, তাহলে তিনি দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেবেন। একই সঙ্গে তারা বিশ্বাস করেন, বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের অসন্তোষ বাড়লে আওয়ামী লীগ আবারও রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের এই আলোচনা নতুন করে উত্তেজনা ও কৌতূহল তৈরি করেছে। তিনি সত্যিই দেশে ফিরবেন, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক বার্তা— সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি এখনও তীব্রভাবে আবর্তিত হচ্ছে।
আপনার মতামত জানানঃ