ঢাকার অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোর মধ্যে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই আলাদা এক পরিচিতি বহন করে আসছে। প্রশস্ত রাস্তা, নিয়ন্ত্রিত প্রবেশব্যবস্থা, নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও পরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে অনেকের কাছে এটি রাজধানীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় আবাসন প্রকল্পগুলোর একটি। তবে এই পরিচয়ের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে জমেছে আরেক বাস্তবতা—একটি বেসরকারি আবাসন প্রকল্প কীভাবে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সমান্তরাল এক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, সেই প্রশ্ন এখন প্রকাশ্যে উঠে এসেছে। সম্প্রতি সরকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে পুরোপুরি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেকের ভাষায়, এটি শুধু একটি আবাসিক প্রকল্প নয়, বরং “রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র” হয়ে উঠেছিল।
১৯৮৭ সালে যাত্রা শুরু করা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিস্তৃত হয়ে এখন বিশাল নগর কাঠামোয় রূপ নিয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার একরের এই প্রকল্পে বর্তমানে ২০টির বেশি ব্লক রয়েছে এবং এখানে বসবাস করে প্রায় ৫০ হাজার পরিবার। জনসংখ্যার হিসাবে তা দুই লাখেরও বেশি। এত বড় একটি আবাসিক এলাকা কার্যত নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়েছে বছরের পর বছর। রাস্তাঘাট, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, সার্ভিস চার্জ, এমনকি অনেক নাগরিক সুবিধাও পরিচালিত হয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে। অথচ ২০১৬ সালেই সরকারি গেজেটের মাধ্যমে এলাকাটিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু কাগজে-কলমে অন্তর্ভুক্ত হলেও বাস্তবে সেখানে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পেছনে মূল প্রশ্ন হচ্ছে—একটি বেসরকারি আবাসন কোম্পানি কতটা ক্ষমতা নিয়ে একটি বিশাল জনবসতিপূর্ণ এলাকা পরিচালনা করতে পারে? বসুন্ধরায় বসবাসকারী অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এখানে বসুন্ধরা গ্রুপ নিজেদের মতো নিয়ম তৈরি করে এবং বাসিন্দাদের তা মেনে চলতে হয়। কেউ ব্যক্তিমালিকের কাছ থেকে জমি কিনলে সরকারি করের বাইরেও কাঠাপ্রতি অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। আগে যেখানে এই পরিমাণ ছিল ১০ লাখ টাকা, এখন তা ৫ লাখে নেমেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের ফি দিতে হয়। আবার ফ্ল্যাটমালিকদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়, যা কার্যত গৃহকরের বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। এসব অর্থ আদায় করে বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, যাকে অনেক বাসিন্দা বসুন্ধরা গ্রুপের নিয়ন্ত্রিত সংগঠন বলেই মনে করেন।
একটি আবাসিক এলাকায় নাগরিক সেবার বিনিময়ে কিছু অর্থ আদায় করা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব কার্যক্রমের বৈধতা ও জবাবদিহি কোথায়? বসুন্ধরার ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, এখানে বসবাসকারী মানুষদের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বসুন্ধরার নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণ প্রায়ই হয়রানিমূলক হয়ে ওঠে। রাতের পর নির্দিষ্ট গেট বন্ধ হয়ে যায়, বিভিন্ন সময়ে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, এমনকি মালিকপক্ষের গাড়ি চলাচলের সময় সাধারণ মানুষের পথ আটকে দেওয়া হয়। এসব কারণে অনেকের কাছে এটি একটি নিয়ন্ত্রিত বদ্ধ অঞ্চল বলে মনে হয়।
অন্যদিকে বসুন্ধরা গ্রুপ নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছে, তারা উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থ নেয়। রাস্তাঘাট, সেতু, সড়কবাতি, বৃক্ষরোপণ ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজের জন্য এই অর্থ ব্যয় করা হয়। তাদের দাবি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বর্তমান পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ এ ব্যবস্থাপনার ফল। বসুন্ধরার সমর্থক অনেক বাসিন্দাও মনে করেন, সিটি করপোরেশনের হাতে গেলে এলাকার সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে। তারা বলেন, এখানে মানুষ দরজা খুলে ঘুমাতে পারে, চুরি-ডাকাতির ভয় নেই, রাস্তা দখল হয়ে যায়নি, পরিবেশ পরিকল্পিত রয়েছে। ফলে অনেকেই বর্তমান ব্যবস্থাকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখেন।
কিন্তু নগর পরিকল্পনাবিদেরা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাঁদের মতে, একটি বেসরকারি আবাসন প্রকল্প কখনোই স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে থাকতে পারে না। আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, আবাসিক প্রকল্পের উন্নয়নকাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করে রাস্তা, মাঠ, ড্রেনেজ, নাগরিক সুবিধার জমি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু বসুন্ধরা বছরের পর বছর ধরে সংশোধিত লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন নিয়ে প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কীভাবে এত দিন ধরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এ পরিস্থিতি মেনে নিয়েছিল?
এখানেই রাজনীতি ও ক্ষমতার বিষয়টি সামনে আসে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপের রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই প্রকল্প কার্যত স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়েছে বলে সমালোচকেরা অভিযোগ করেন। এখন সরকার পরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সিটি করপোরেশনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, রাষ্ট্র এখন নিজেদের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নগর নাগরিকত্বের প্রশ্ন। একটি শহরের নাগরিক কি সমান অধিকার ও সেবা পাবেন, নাকি কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসের কারণে আলাদা নিয়মের অধীন হবেন? বসুন্ধরার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে কার্যত একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সেখানে সিটি করপোরেশনের কর আদায় হয়নি, সরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল না, এমনকি পুলিশেরও আলাদা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে নাগরিক সেবার বদলে এক ধরনের করপোরেট শাসনব্যবস্থা কার্যকর ছিল।
তবে বসুন্ধরার বর্তমান অবস্থা শুধু সমালোচনার জায়গা নয়, এটি বাংলাদেশের নগরায়ণের একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবিও। রাজধানী ঢাকায় যেখানে পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, দখল, অপরাধ ও নাগরিক বিশৃঙ্খলা নিত্যদিনের বাস্তবতা, সেখানে বসুন্ধরার মতো একটি সুশৃঙ্খল এলাকা অনেকের কাছে স্বস্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফলে মানুষ প্রশ্ন তুলছেন—রাষ্ট্র যদি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বেসরকারি ব্যবস্থাপনার প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়বে না কেন?
তবু শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায়—রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র কি থাকতে পারে? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন, কর, নিরাপত্তা ও নাগরিক সেবার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের হাতেই থাকতে হয়। কোনো বেসরকারি গোষ্ঠী সেই কর্তৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের হাতে ধরে রাখলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় বৈষম্য ও জবাবদিহিহীনতার জন্ম দিতে পারে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ঘটনাটি তাই শুধু একটি আবাসন প্রকল্পের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের নগর শাসন, করপোরেট প্রভাব, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও নাগরিক অধিকারের জটিল বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
সরকার এখন যদি সত্যিই বসুন্ধরাকে পূর্ণভাবে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনতে পারে, তাহলে সেটি হবে একটি বড় প্রশাসনিক পরিবর্তন। তবে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নাগরিকদের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও পরিকল্পিত পরিবেশও ধরে রাখতে হবে। কারণ শুধু রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই যথেষ্ট নয়, মানুষ চায় কার্যকর ও মানসম্মত নগরজীবন। বসুন্ধরার অভিজ্ঞতা হয়তো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্যান্য বেসরকারি আবাসন প্রকল্প নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে রাষ্ট্রকে।
আপনার মতামত জানানঃ