ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসার মরদেহ যেদিন উদ্ধার করা হলো, সেদিন পুরো দেশ আবারও এক ভয়ংকর বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে গেল। একটি শিশুর জুতা দরজার বাইরে পড়ে ছিল, আর ঘরের ভেতরে পড়ে ছিল তার নিথর দেহ। এই নির্মমতা শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়নি, বরং বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার গভীর সংকটকেও সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ এ দেশে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা যতটা ভয়াবহ, তার চেয়েও ভয়াবহ হলো বিচার না পাওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস। প্রতিটি আলোচিত ঘটনার পর মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ ওঠে, প্রশাসন দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেয়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ মামলাই হারিয়ে যায় দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত ও রাজনৈতিক প্রভাবের অন্ধকারে।
রামিসার ঘটনাটি নতুন নয়। এর আগেও নেত্রকোনায় ১১ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় পাওয়া যায়। সীতাকুণ্ড, মাধবদী কিংবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিশু ও নারী নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা মানুষের মনে ক্ষণিকের ক্ষোভ তৈরি করলেও বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি সেই ক্ষোভকে ধীরে ধীরে হতাশায় পরিণত করেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই দেশে ধর্ষণের বিচার আদৌ কতটা কার্যকর?
বাংলাদেশের আইনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন রয়েছে। সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি সরকার বিচার শেষের সময়সীমা ১৮০ দিন থেকে কমিয়ে ৯০ দিন করার কথাও বলেছে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ৩০ হাজারের বেশি মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বলছে, দেশে লাখ লাখ মামলা বিচারাধীন, যার মধ্যে হাজার হাজার ধর্ষণ মামলা বছরের পর বছর ধরে আটকে আছে। ফলে আইনের ভাষা যতই কঠোর হোক, বাস্তবে বিচারব্যবস্থা ভুক্তভোগীদের জন্য প্রায় অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
সমস্যার শুরু হয় মামলার তদন্ত থেকেই। ধর্ষণের মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত ও নির্ভুল প্রমাণ সংগ্রহ। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত প্রক্রিয়াই দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক থানায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নেই, অনেক হাসপাতালে নেই সঠিক ফরেনসিক সুবিধা। চিকিৎসা পরীক্ষার সময় প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়, ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণে গাফিলতি হয়, আবার অনেক সময় ক্ষমতাবান অভিযুক্তদের প্রভাবে তদন্তের গতি বদলে যায়। ফলে আদালতে পৌঁছানোর আগেই মামলার ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
ধর্ষণের মামলায় ভুক্তভোগীকে যে মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, সেটিও কম ভয়াবহ নয়। একজন নারী বা শিশু যখন আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা বলতে বাধ্য হয়, তখন সেই পরিবেশ অনেক সময় দ্বিতীয়বার নির্যাতনের মতো হয়ে দাঁড়ায়। ভরা আদালতে অভিযুক্তের সামনে দাঁড়িয়ে ঘটনা বর্ণনা করতে হয়। অনেক আইনজীবী ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেন। চরিত্রহননমূলক প্রশ্ন, অপমানজনক মন্তব্য কিংবা সামাজিক চাপ অনেক ভুক্তভোগীকেই নীরব করে দেয়। ফলে অনেকে মামলা করতেই ভয় পান, আবার কেউ মামলা করলেও মাঝপথে আপস করতে বাধ্য হন।
গ্রামাঞ্চলে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে স্থানীয় সালিশ বা আপসের সংস্কৃতি ধর্ষণের বিচারকে প্রায় অকার্যকর করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহল ভুক্তভোগীর পরিবারকে টাকা বা ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে। কারণ সবাই জানে, আদালতে গেলে বছরের পর বছর মামলা চলবে। দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে সেই লড়াই চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে অপরাধীরা অনেক সময় শাস্তি ছাড়াই পার পেয়ে যায়।
বিচারব্যবস্থার আরেকটি বড় সংকট হলো রাজনৈতিক প্রভাব। বাংলাদেশে পাবলিক প্রসিকিউটর বা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের নিয়োগ অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়। ফলে দক্ষতা বা অভিজ্ঞতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পায়। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় প্রসিকিউটরও বদলে যায়। এতে মামলার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। একজন ভুক্তভোগী শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি স্থিতিশীল আইনি সহায়তা পান না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি স্বাধীন ও পেশাদার প্রসিকিউশন সার্ভিস গড়ে তোলা ছাড়া এ সংকট দূর করা সম্ভব নয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সারা দেশে বিপুলসংখ্যক মামলা থাকলেও আদালত, বিচারক ও জনবলের সংকট রয়েছে। ফলে মামলার জট বাড়তেই থাকে। বিচারকরা একসঙ্গে এত মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শুনানি শেষ করতে পারেন না। আদালতের তারিখের পর তারিখ পড়ে, সাক্ষীরা অনুপস্থিত থাকে, তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হন, আর মামলার গতি থেমে যায়।
এ দেশের বিচারব্যবস্থায় সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক ভুক্তভোগী ও সাক্ষী হুমকির মুখে থাকেন। অভিযুক্ত প্রভাবশালী হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং অনেক সময় সাক্ষ্য দিতে ভয় পান। এর সুযোগ নেয় অপরাধীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন পরিবর্তন করলেই হবে না; পুরো বিচারব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। পুলিশ, চিকিৎসক, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের জন্য সংবেদনশীলতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ জরুরি। ধর্ষণ মামলার তদন্ত ও বিচারকে বিশেষায়িত পদ্ধতির আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি মেডিকেল কলেজে উন্নত ফরেনসিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আদালতে ভুক্তভোগীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে একজন শিশু বা নারী আবার মানসিকভাবে ভেঙে না পড়েন।
রামিসার মতো শিশুদের গল্প কেবল সংবাদপত্রের শিরোনাম নয়; এগুলো রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা যেমন ভয়ংকর, তেমনি তার বিচার নিশ্চিত করতে না পারাও রাষ্ট্রের জন্য বড় লজ্জা। সমাজে যখন মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে অপরাধের বিচার হবে, তখন অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে অসুস্থ করে তোলে।
বাংলাদেশে ধর্ষণের বিচার নিয়ে মানুষের হতাশার পেছনে আরেকটি কারণ হলো দীর্ঘদিন ধরে চলা বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বহু আলোচিত মামলার রায় বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। কখনো তদন্তের গাফিলতি, কখনো সাক্ষীর অনুপস্থিতি, কখনো রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে একটি মামলা শেষ হতে এক দশকও লেগে যায়। এর মধ্যে অনেক ভুক্তভোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, কেউ দেশ ছাড়েন, কেউ সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে যান। অথচ অপরাধীর জীবন অনেক সময় স্বাভাবিকভাবেই চলতে থাকে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও নৈতিক সংকটও। পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কথাও এখানে উঠে আসে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইনে সহিংসতা, পর্নোগ্রাফি ও বিকৃত মানসিকতার বিস্তার নিয়েও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যদি সরকার সত্যিই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে, তদন্ত ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে, সাক্ষী সুরক্ষা আইন কার্যকর করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রসিকিউশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন।
রামিসা হয়তো আর কখনো ফিরে আসবে না। নেত্রকোনার সেই শিশুটিও তার হারানো শৈশব ফিরে পাবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের জন্য রাষ্ট্র কী করবে? আমরা কি আবার কিছুদিন সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ দেখিয়ে সব ভুলে যাব, নাকি সত্যিই একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি তুলব? কারণ বিচার শুধু আদালতের রায় নয়; বিচার হলো মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আর সেই আস্থা ফিরে না এলে, প্রতিটি নতুন রামিসা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যর্থতার নতুন প্রতীক হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ