একসময় চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন একটি বাক্য ছিল, যা হাজারো দম্পতির স্বপ্নকে মুহূর্তেই ভেঙে দিত— “আপনার কোনো শুক্রাণু নেই।” এই একটি বাক্যের ভেতর লুকিয়ে থাকত হতাশা, মানসিক ভেঙে পড়া, পারিবারিক চাপ এবং অপূর্ণ থেকে যাওয়া পিতৃত্ব–মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির যুগে সেই অসম্ভবকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, যাদের একসময় সম্পূর্ণ বন্ধ্যা মনে করা হতো, তাদের শরীরেও হয়তো লুকিয়ে আছে একটি বা দুটি শুক্রাণু— আর সেই শুক্রাণুকেই খুঁজে বের করতে সক্ষম হচ্ছে এআই।
বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ বন্ধ্যত্ব সমস্যায় ভুগছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সন্তান জন্মদানের বয়সে থাকা প্রতি ছয়জন মানুষের মধ্যে একজন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে গর্ভধারণে সমস্যার মুখোমুখি হন। এর পেছনে পুরুষ ও নারী— উভয়ের কারণই থাকে। তবে দীর্ঘদিন ধরে সমাজে বন্ধ্যত্বের দায় অনেকটাই নারীদের ওপর চাপানো হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই পুরুষের প্রজনন সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পুরুষদের এমনই একটি জটিল অবস্থা হলো অ্যাজোস্পার্মিয়া। এই অবস্থায় বীর্যে কোনো শুক্রাণু পাওয়া যায় না অথবা শুক্রাণুর পরিমাণ এতটাই কম থাকে যে সাধারণ পরীক্ষায় তা ধরা পড়ে না। অনেক পুরুষকে চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, তাদের নিজের জৈবিক সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এমন সংবাদ শুধু একটি চিকিৎসা প্রতিবেদন নয়; এটি অনেকের কাছে ব্যক্তিগত ভাঙনের মুহূর্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের এক দম্পতি পেনেলোপ ও স্যামুয়েলের জীবনেও সেই অন্ধকার নেমে এসেছিল। দীর্ঘ দুই বছর ছয় মাস চেষ্টা করার পর তারা জানতে পারেন, স্যামুয়েলের ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম রয়েছে। এটি একটি জিনগত অবস্থা, যেখানে একজন পুরুষ অতিরিক্ত একটি এক্স ক্রোমোজোম নিয়ে জন্মান। এর ফলে শরীরে শুক্রাণু উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। চিকিৎসকরা স্যামুয়েলকে বলেছিলেন, তার নিজের সন্তানের বাবা হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ২০ শতাংশ।
এই সংবাদ তাদের জীবনকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তবুও তারা হাল ছাড়েননি। একের পর এক পরীক্ষা, চিকিৎসা, হরমোন থেরাপি এবং মানসিক লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। শেষ পর্যন্ত তারা আশার আলো দেখতে পান একটি নতুন প্রযুক্তিতে— যার নাম স্টার সিস্টেম বা “স্পার্ম ট্র্যাক অ্যান্ড রিকভারি”।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকদের তৈরি এই প্রযুক্তি মূলত এআই ব্যবহার করে শুক্রাণু শনাক্ত করে। সাধারণত অ্যাজোস্পার্মিক পুরুষদের নমুনায় যদি একটি মাত্র শুক্রাণুও থাকে, সেটি খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ বীর্যের ভেতরে অসংখ্য কোষ, আবর্জনা ও খণ্ডাংশের মধ্যে শুক্রাণুকে আলাদা করা মানুষের জন্য সময়সাপেক্ষ এবং প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। কিন্তু মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম সেই কাজ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই করতে পারে।
এই প্রযুক্তির ধারণা এসেছে একেবারেই ভিন্ন একটি ক্ষেত্র থেকে— মহাকাশ গবেষণা। নতুন তারা খুঁজে বের করতে যেভাবে এআই বিপুল পরিমাণ মহাকাশ তথ্য বিশ্লেষণ করে, ঠিক সেভাবেই বিজ্ঞানীরা ভাবেন শুক্রাণুও কি খুঁজে বের করা যায় না? রাতের আকাশে অজানা একটি তারাকে যেমন শনাক্ত করা হয়, তেমনি বীর্যের বিশাল তথ্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিরল শুক্রাণুকেও কি শনাক্ত করা সম্ভব নয়? সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় স্টার সিস্টেম।
এই প্রযুক্তিতে মাইক্রোফ্লুইড চিপ ব্যবহার করা হয়। মানুষের চুলের মতো সরু চ্যানেলের মধ্য দিয়ে বীর্যের নমুনা প্রবাহিত হয়। অত্যন্ত শক্তিশালী ইমেজিং প্রযুক্তি প্রতি সেকেন্ডে শত শত ছবি ধারণ করে। এরপর এআই অ্যালগরিদম সেই ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য শুক্রাণু শনাক্ত করে। শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি রোবোটিক সিস্টেম মিলিসেকেন্ডের মধ্যে সেই শুক্রাণুকে আলাদা করে সংগ্রহ করে।
শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, নমুনায় যদি একটি মাত্র শুক্রাণুও থাকে, স্টার সেটি শনাক্ত করতে সক্ষম। অর্থাৎ যাদের একসময় বলা হয়েছিল তাদের শরীরে কোনো শুক্রাণু নেই, তাদের ক্ষেত্রেও নতুন করে আশা তৈরি হচ্ছে।
স্যামুয়েলের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। কারণ তার বীর্যে কোনো শুক্রাণু পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই চিকিৎসকদের অণ্ডকোষ থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হয়। দীর্ঘ হরমোন থেরাপির পর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সংগৃহীত টিস্যু স্টার সিস্টেমে পরীক্ষা করা হয়। শেষ পর্যন্ত সেখানে আটটি শুক্রাণু শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
এই আটটি শুক্রাণুর প্রতিটিই ছিল একেকটি সম্ভাবনা, একেকটি স্বপ্ন। সেগুলো ব্যবহার করে পেনেলোপের ডিম্বাণু নিষিক্ত করা হয়। এর মধ্যে একটি সফলভাবে পূর্ণাঙ্গ ভ্রূণে পরিণত হয়। পরে সেই ভ্রূণ গর্ভে স্থাপন করা হলে পেনেলোপ অন্তঃসত্ত্বা হন।
যে দম্পতিকে একসময় বলা হয়েছিল তাদের নিজের সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তারা এখন সন্তানের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। পেনেলোপ বলছেন, যখন তিনি প্রথম সন্তানের নড়াচড়া অনুভব করেন, তখন বিষয়টি সত্যি বলে মনে হতে শুরু করে। তাদের কাছে এটি শুধু চিকিৎসার সাফল্য নয়; এটি দীর্ঘ অন্ধকারের পর ফিরে পাওয়া আলো।
স্টার প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। গবেষকদের দাবি, প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদদের তুলনায় এই সিস্টেম প্রায় ৪০ গুণ বেশি শুক্রাণু শনাক্ত করতে পারে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে শতাধিক দম্পতি এই প্রযুক্তির জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্কও করছেন। তারা বলছেন, একটি প্রযুক্তি আশার আলো দেখালেও সেটিকে অলৌকিক সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। আরও বড় পরিসরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন। কারণ যেকোনো নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে সময় লাগে।
এছাড়া এআই-নির্ভর চিকিৎসার সঙ্গে কিছু নৈতিক প্রশ্নও জড়িত। রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে? সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআইয়ের ভূমিকা কতটুকু হবে? চিকিৎসা ব্যর্থ হলে দায় কার? এসব প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো বাণিজ্যিকীকরণ। বন্ধ্যত্বে ভোগা দম্পতিরা সন্তানের আশায় অনেক সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত আশাবাদী দাবি করে ব্যয়বহুল চিকিৎসা বিক্রি করতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া কোনো প্রযুক্তিকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে প্রচার করা বিপজ্জনক।
তবুও অস্বীকার করার উপায় নেই, এআই চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। একসময় যেসব সমস্যাকে প্রায় অমীমাংসিত মনে করা হতো, এখন সেগুলোরও সম্ভাব্য সমাধান দেখা যাচ্ছে। শুধু শুক্রাণু শনাক্ত নয়, আইভিএফ চিকিৎসায় ডিম্বাণু নির্বাচন, ভ্রূণের মান নির্ধারণ, হরমোন ডোজ ঠিক করা— সবক্ষেত্রেই এআই ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, চিকিৎসাও তত ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। হয়তো ভবিষ্যতে এমন এক সময় আসবে, যখন বন্ধ্যত্ব আর আজকের মতো ভয়াবহ মানসিক আঘাত হয়ে থাকবে না। মানুষ আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং কার্যকর চিকিৎসা পাবে।
তবে এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রযুক্তি নয়, আশা। কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় শক্তি কেবল রোগ সারানো নয়; মানুষের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নকে আবারও বাঁচিয়ে তোলা। স্টার সিস্টেম হয়তো সেই আশারই নতুন নাম।
যেখানে একসময় ছিল শুধু “অসম্ভব” শব্দটি, সেখানে এখন অন্তত একটি দরজা খুলেছে। আর সেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে হাজারো দম্পতির বহুদিনের অপেক্ষা— নিজের সন্তানের মুখ দেখার স্বপ্ন।
আপনার মতামত জানানঃ