চায়ের কাপ হাতে নেওয়ার আগে একবার চাঁদপুর ১৯২১-এর কথা মনে করুন। মনে করুন সেই হাজারো চা-শ্রমিকের কথা, যারা এক শতাব্দীরও বেশি আগে ঘর ফেরার স্বপ্নে পথে নেমেছিল। তারা বিদ্রোহ করতে চায়নি, রাষ্ট্র উল্টে দিতে চায়নি, কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধও ঘোষণা করেনি। তারা শুধু বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসক তাদের সেই মানবিক আকাঙ্ক্ষাকেও ভয় পেয়েছিল। তাই চাঁদপুর স্টিমারঘাটে গুলি চালানো হয়েছিল নিরস্ত্র শ্রমিকদের ওপর। রক্তে লাল হয়েছিল নদীর পানি। ইতিহাস একে মনে রাখেনি যতটা রাখা উচিত ছিল, কিন্তু চা-বাগানের মানুষের স্মৃতিতে সেই ক্ষত আজও জীবন্ত।
১৯২১ সালের ২০ মে। ব্রিটিশ ভারতের শাসন চলছে তখন। সিলেট ও চট্টগ্রামের চা-বাগান থেকে হাজার হাজার শ্রমিক বেরিয়ে আসে “মুল্লুকে চলো” স্লোগান নিয়ে। “মুল্লুক” মানে তাদের জন্মভূমি, ফেলে আসা গ্রাম, সেই ঘর যেখান থেকে প্রতারণা করে তাদের নিয়ে আসা হয়েছিল চা-বাগানে। তারা বিশ্বাস করেছিল, এবার হয়তো ফিরে যাওয়া যাবে। কিন্তু ইতিহাস তাদের জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
চা-শ্রমিকদের ইতিহাস শুরু হয়েছিল প্রতারণার মধ্য দিয়ে। ১৮৩০-এর দশকে ব্রিটিশরা আসাম ও পূর্ববঙ্গে চা-শিল্প গড়ে তোলে। বিশাল এই শিল্পের জন্য দরকার ছিল সস্তা, অনুগত এবং নিয়ন্ত্রিত শ্রমশক্তি। তখন ভারতের দরিদ্র অঞ্চলগুলো— ওড়িশা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্র ও মাদ্রাজ থেকে দলিত, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে আসা হয়। বলা হয়েছিল ভালো মজুরি, জমি ও উন্নত জীবনের কথা। কিন্তু বাস্তবে তারা এসে পড়ে এক বন্দি জীবনে।
মুন্ডা, ওরাঁও, সাঁওতাল, মাহাতো, কুরমি— এমন বহু জনগোষ্ঠীর মানুষকে চা-বাগানে আনা হয়েছিল। ১৮৫৩ সালে ব্রিটিশরা “ওয়ার্কম্যানস ব্রিচ অব কন্ট্রাক্ট অ্যাক্ট” নামে আইন করে। এই আইনের মাধ্যমে শ্রমিকদের কার্যত বাগানের সাথে বেঁধে ফেলা হয়। মালিকের অনুমতি ছাড়া বাগান ছেড়ে যাওয়া অপরাধে পরিণত হয়। পালানোর চেষ্টা করলে জেল, জরিমানা কিংবা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো। ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৬ সালের মধ্যেই আসামের চা-বাগানে প্রায় ৮৫ হাজার শ্রমিক মারা যায় রোগ, অপুষ্টি ও নির্যাতনে। তারা শ্রমিক ছিল না, ছিল বন্দি।
চা-বাগানগুলোকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল যাতে বাইরের পৃথিবীর সাথে শ্রমিকদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই বাগানে থেকে তারা নিজেদের মূল শেকড় হারাতে থাকে। ধীরে ধীরে চা-বাগানই হয়ে ওঠে তাদের পৃথিবী। কিন্তু সেই পৃথিবীতে ছিল না স্বাধীনতা, ছিল না মর্যাদা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পুরো ভারতজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছে যায় চা-বাগানেও। চা-শ্রমিকরা বুঝতে শুরু করে, তারা শুধু শ্রমিক নয়, তারা মানুষ। তাদেরও অধিকার আছে। তাদের দাবি ছিল খুব সাধারণ— ন্যায্য মজুরি, মানবিক জীবন এবং বাগান ছেড়ে চলে যাওয়ার স্বাধীনতা।
১৯২১ সালের মে মাসে হাজার হাজার শ্রমিক চাঁদপুর স্টিমারঘাটে জড়ো হয়। পুরুষ, নারী, শিশু— সবাই। তারা স্টিমারে উঠে নিজ নিজ জন্মভূমিতে ফিরতে চেয়েছিল। কিন্তু স্টিমার কোম্পানিগুলো টিকিট বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানায়। শ্রমিকরা দিনকে দিন ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত ও অসহায় হয়ে পড়ে। তারপর আসে সেই ভয়ংকর মুহূর্ত। গুর্খা সৈন্যরা হামলা চালায়। গুলি ছোড়া হয়, লাঠিপেটা করা হয়। আতঙ্কে অনেকে মেঘনা নদীতে ঝাঁপ দেয়। কেউ গুলিতে মারা যায়, কেউ ডুবে যায়। কতজন নিহত হয়েছিল তার সঠিক হিসাব কখনো প্রকাশ করা হয়নি। ইতিহাসের পাতায় এই হত্যাকাণ্ডকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।
তবুও আন্দোলন থামেনি। যারা বেঁচে ছিল তারা পায়ে হেঁটে ঢাকার দিকে রওনা হয়। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় তাদের আটকানো হয়, মারধর করা হয়, আবার বাগানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। “মুল্লুকে চলো” আন্দোলন হয়তো দমন করা হয়েছিল, কিন্তু তার স্মৃতি মুছে যায়নি। এটি উপমহাদেশের প্রথম বড় শ্রমিক বিদ্রোহগুলোর একটি হিসেবে আজও ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালে। ব্রিটিশরা চলে গেছে। কিন্তু চা-বাগানের শ্রমিকদের জীবন কতটা বদলেছে? এই প্রশ্ন এখনও তীব্রভাবে সামনে আসে। আজ বাংলাদেশে ১৬৬টি চা-বাগানে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার নিবন্ধিত শ্রমিক কাজ করেন। পরিবারসহ এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ। তারা প্রতিদিন ভোরে উঠে চা-পাতা সংগ্রহ করে, যেই চা শহরের মানুষ আরাম করে পান করে। কিন্তু সেই শ্রমিকের নিজের জীবন আজও বঞ্চনার প্রতীক।
২০২২ সালে দীর্ঘ আন্দোলনের পর চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা হয়। অনেকেই এটিকে বিজয় হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে ১৭০ টাকা দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাপন সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ডের সাথে এর কোনো মিল নেই। চা-বাগানের শ্রমিকরা এখনও এমন মজুরি পান যা দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা অসম্ভব।
শিক্ষাব্যবস্থা এখনও ভয়াবহভাবে দুর্বল। অধিকাংশ চা-বাগানের স্কুলে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোর অভাব এবং শিক্ষার নিম্নমান প্রকট। খুব কম শিশু মাধ্যমিক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। উচ্চশিক্ষা এখনও ব্যতিক্রমী ঘটনা। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই দারিদ্র্যের চক্রে আটকে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও করুণ। আইন অনুযায়ী বাগানে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশই অকার্যকর। পর্যাপ্ত ওষুধ নেই, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক নেই। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। অথচ এই মানুষগুলোর শ্রমেই দেশের চা-শিল্প টিকে আছে।
সবচেয়ে বড় সংকট জমির মালিকানা নিয়ে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চা-বাগানের জমিতে বাস করলেও শ্রমিকদের নিজের নামে এক ইঞ্চি জমিও নেই। তারা ঘর বানিয়েছে, পরিবার গড়েছে, প্রিয়জনকে কবর দিয়েছে— কিন্তু সেই জমির ওপর তাদের কোনো আইনি অধিকার নেই। ফলে তারা সবসময় অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করে।
বাংলাদেশের সংবিধান জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু বাস্তবে চা-বাগানের নির্ভরশীলতার কাঠামো শ্রমিকদের অন্য কোথাও কাজ খুঁজতে বাধা দেয়। বাসস্থান, রেশন, চিকিৎসা— সবকিছু বাগান ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণে। ফলে বাগান ছেড়ে গেলে শ্রমিকদের সব হারানোর ভয় থাকে। এটি আধুনিক যুগের এক অদৃশ্য শৃঙ্খল।
চা-শ্রমিকদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ও দীর্ঘদিন অবহেলিত। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, উৎসব এবং ইতিহাস মূলধারার রাষ্ট্রীয় নীতিতে খুব কম জায়গা পেয়েছে। অথচ তারা বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আজ যখন বাংলাদেশ উন্নয়নের গল্প বলে, মেগাপ্রকল্পের কথা বলে, তখন প্রশ্ন জাগে— এই উন্নয়নের ভেতরে চা-শ্রমিক কোথায়? যে মানুষগুলো প্রতিদিন দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, তারা কেন এখনও নাগরিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত? কেন তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত?
চাঁদপুরের সেই শ্রমিকরা শুধু ঘরে ফিরতে চেয়েছিল। তারা স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছিল। ১০৫ বছর পরও তাদের উত্তরসূরিদের জীবনে সেই স্বাধীনতা পুরোপুরি আসেনি। আজও তারা সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্র তাদের শ্রম চায়, কিন্তু মর্যাদা দিতে কুণ্ঠাবোধ করে।
২০ মে শুধু শোকের দিন নয়, এটি আত্মসমালোচনার দিনও। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের অন্যায় যদি সংশোধন না করা হয়, তবে তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলে। চা-শ্রমিকদের আন্দোলন এখনও শেষ হয়নি। তাদের ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জমির অধিকার এবং সামাজিক মর্যাদার দাবি এখনও পূরণ হয়নি।
একটি রাষ্ট্রের অগ্রগতি শুধু উঁচু ভবন বা বড় অর্থনীতিতে মাপা যায় না। প্রকৃত অগ্রগতি তখনই হয়, যখন সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটিও মর্যাদার সাথে বাঁচতে পারে। যে হাতগুলো প্রতিদিন চা-পাতা তোলে, সেই হাত যদি নিজের সন্তানের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে না পারে, তাহলে উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তাই চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার আগে একবার চাঁদপুর ১৯২১-এর কথা মনে করুন। মনে করুন সেই মানুষগুলোর কথা, যারা রক্ত দিয়ে ইতিহাস লিখেছিল। কারণ তাদের গল্প কেবল অতীত নয়; এটি আজও চলমান এক সংগ্রামের নাম।
আপনার মতামত জানানঃ