নোবেলজয়ী একটি প্রতিষ্ঠানের নাম শুনলেই সাধারণত মানুষের মনে সততা, দক্ষতা এবং মানবকল্যাণের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে; তবে বাস্তবতা সব সময় সেই প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। গ্রামীণ ব্যাংক বাংলাদেশের জন্য গর্বের একটি প্রতিষ্ঠান, কারণ এটি ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনেছে; তবুও উত্তরবঙ্গের সেচ কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ততা একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ১৯৮৭ সালে উত্তরবঙ্গের কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে গভীর নলকূপ স্থাপনের একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, এবং এই প্রকল্পে বাংলাদেশ ও সৌদি সরকারের যৌথ উদ্যোগ ছিল। তখনকার রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই অঞ্চলের উন্নয়নে আগ্রহী ছিলেন, তাই তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই প্রকল্পটিকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখেন, কারণ এর মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে পারতেন। যদিও গ্রামীণ ব্যাংকের সেচ কার্যক্রমে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, তবুও তারা এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। এরশাদের সহায়তায় বিষয়টি দ্রুত এগিয়ে যায়, এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১৫০০ গভীর নলকূপ গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে একটি ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে একটি বড় কৃষি প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়ে যায়, যা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল।
চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি নলকূপের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক ডাউন পেমেন্ট হিসেবে মাত্র ৬ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করে। এর ফলে ১৫০০ নলকূপের বিপরীতে তারা অল্প পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করেই মালিকানা লাভ করে। তবে বাস্তবে তারা সব নলকূপ গ্রহণ করেনি; বরং তারা মাত্র ৫৭৩টি নলকূপ গ্রহণ করে এবং বাকিগুলো নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এই সিদ্ধান্ত প্রকল্পের ভবিষ্যতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, কারণ পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি।
এরশাদ সরকারের পতনের আগে গ্রামীণ ব্যাংক চুক্তি ভঙ্গ করে সরে দাঁড়ায়, তাই প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। সরকার বারবার তাদের কাছে পাওনা অর্থ পরিশোধের জন্য তাগিদ দেয়, কিন্তু তারা সেই অর্থ পরিশোধ করেনি। ফলে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে একটি অডিট আপত্তি ঝুলে থাকে। পাশাপাশি নলকূপগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা না থাকায় অনেক নলকূপ অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ গ্রামীণ ব্যাংকের অধীনে থাকা নলকূপগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছিল না। তাই সরকার বাধ্য হয়ে কিছু নলকূপ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। যদিও কিছু নলকূপ সচল রাখা সম্ভব হয়েছিল, অনেক নলকূপ স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষকরা প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, এবং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
২০১১ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, কারণ তারা চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করেনি। পরবর্তীতে আদালতের রায় করপোরেশনের পক্ষে যায়, কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক সেই রায়ের বিরুদ্ধেও আপিল করে। এদিকে বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে এবং কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয় না। এই দীর্ঘসূত্রিতা প্রশাসনিক দুর্বলতারও একটি উদাহরণ, কারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্প বছরের পর বছর ধরে অনিশ্চয়তায় পড়ে থাকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় আসে, এবং একটি ত্রিপক্ষীয় জরিপ পরিচালনা করা হয়। এই জরিপে দেখা যায়, ৫৭৩টি নলকূপের মধ্যে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিভাজন ঘটেছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—কোন নলকূপের মূল্য কে পরিশোধ করবে এবং কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে। অবশেষে একটি সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যেখানে গ্রামীণ ব্যাংক শুধুমাত্র তাদের অধীনে থাকা ১৭৯টি নলকূপের মূল্য পরিশোধ করবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, কারণ এটি সরকারের স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করে না। আন্তর্জাতিক চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী, ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার পর যদি সম্পূর্ণ পণ্য গ্রহণ না করা হয়, তাহলে সেই ডাউন পেমেন্ট বাতিল হওয়ার কথা এবং ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। কিন্তু এখানে সেই নিয়ম পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সামনে আসে এবং সিদ্ধান্তের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল, এবং এতে করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকরাও প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কারণ তারা পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা পাননি। অন্যদিকে গ্রামীণ ব্যাংক তাদের মূল কাজের বাইরে গিয়ে এমন একটি প্রকল্পে যুক্ত হয়েছিল, যা তাদের দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—একটি সফল প্রতিষ্ঠান কেন এমন একটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করবে যেখানে তাদের অভিজ্ঞতা নেই? সম্ভবত এটি ছিল সম্প্রসারণের একটি চেষ্টা, কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা এবং দক্ষতার অভাবে সেটি ব্যর্থতায় পরিণত হয়। তাই এটি একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ যে, কোনো প্রতিষ্ঠানের উচিত নিজের দক্ষতার সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকা।
এই ঘটনার আরেকটি দিক হলো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুর্বলতা। যদিও প্রকল্পটি দেশের কৃষি উন্নয়নের জন্য নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবায়নের পর্যায়ে অনেক ত্রুটি ছিল। ফলে একটি সম্ভাবনাময় প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় জনগণের আস্থা কমে যায়।
সবশেষে বলা যায়, গ্রামীণ ব্যাংকের এই ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। সাফল্য একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় গড়ে তুলতে পারে, কিন্তু একটি ভুল সিদ্ধান্ত সেই পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথ পরিকল্পনা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। নচেৎ একই ধরনের সমস্যা পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
এই পুরো ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, উন্নয়নমূলক প্রকল্প শুধু পরিকল্পনা করলেই হয় না; বরং তা বাস্তবায়নের জন্য দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং রাষ্ট্র এবং প্রতিষ্ঠান উভয়েরই উচিত অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
আপনার মতামত জানানঃ