বাংলাদেশে হঠাৎ করে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া এক গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই রোগের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, অভিভাবক এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যে রোগকে একসময় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছিল, সেটিই আবার নতুন করে ফিরে এসে শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক শিশু টিকাদান কর্মসূচির আওতায় টিকা গ্রহণ করার পরও হামে আক্রান্ত হচ্ছে, যা পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা একজন আক্রান্ত শিশুর কাছ থেকে খুব দ্রুত অন্য শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। চিকিৎসকদের মতে, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্তত ১৮ জন পর্যন্ত এই রোগে সংক্রমিত হতে পারে। ফলে একটি ছোট এলাকায় সংক্রমণ শুরু হলে তা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালগুলোতে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুদের ভর্তির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কোথাও কোথাও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। প্রথমত, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি একটি বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। দেশে শিশুদের জন্য নিয়মিত টিকা দেওয়ার একটি সুসংগঠিত কর্মসূচি থাকলেও বিভিন্ন সময়ে তা ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে করোনা মহামারি এবং পরবর্তী সময়ের নানা পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে টিকাদান কার্যক্রম পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এছাড়া প্রতি চার বছর পরপর যে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত টিকা দেওয়া হয়, সেটিও সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শিশুদের পুষ্টিগত অবস্থা। অপুষ্টি শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়, যার ফলে তারা সহজেই ভাইরাসের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে না, মায়ের বুকের দুধ ঠিকমতো পান করছে না, আবার নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধও পাচ্ছে না। এসব কারণে তাদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং হামের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
এছাড়া একটি নতুন উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক শিশু ৯ মাস বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রথম ডোজের টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে। ফলে এই বয়সের আগেই যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তারা টিকার সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না। এতে করে টিকাদান সময়সূচি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকার সময়সীমা আরও আগে নিয়ে আসার বিষয়ে ভাবা উচিত।
টিকার মান নিয়েও কিছু প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সরকারিভাবে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে কোনো বড় ধরনের সমস্যা স্বীকার করা হয়নি, তবে দীর্ঘদিন একই ধরনের টিকা ব্যবহার করার ফলে ভাইরাসের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, সে বিষয়টি নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন। কারণ ভাইরাসের প্রকৃতিতে পরিবর্তন এলে পূর্বের টিকা একইভাবে কার্যকর নাও থাকতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নতুন করে টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং একটি বড় পরিসরের টিকাদান কর্মসূচি চালুর প্রস্তুতি চলছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় বিপুল পরিমাণ সিরিঞ্জ ও ভ্যাকসিন আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে হামের রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড এবং আইসিইউ সুবিধা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলোতেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়।
তবে শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি করলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিরোধই এখানে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিভিন্ন ভুল ধারণা বা অবহেলার কারণে শিশুরা সময়মতো টিকা পায় না। আবার কেউ কেউ টিকা নেওয়ার পরেও যথাযথ যত্ন নেন না। ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থেকে যায়।
হামের লক্ষণগুলো সাধারণত প্রথমে সাধারণ জ্বর বা সর্দি-কাশির মতো মনে হয়। উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং আলো সহ্য করতে না পারা—এসব উপসর্গ দেখা যায়। পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এই রোগ থেকে নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে, যা শিশুর জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি শিশুকে নির্ধারিত সময়ে টিকা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং অসুস্থ শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। স্কুল, মাদ্রাসা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে, যাতে অভিভাবকরা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারেন।
বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে—কোনো রোগ একবার নিয়ন্ত্রণে এলেই সেটি চিরতরে চলে যায় না। নিয়মিত নজরদারি, টিকাদান এবং জনসচেতনতা বজায় না রাখলে সেই রোগ আবার ফিরে আসতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হাম তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। একসময় যে রোগ নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেটিই এখন নতুন করে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকট মোকাবেলায় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি আর সৃষ্টি না হয়।
সবশেষে বলা যায়, হামের এই নতুন করে বিস্তার আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি সতর্কবার্তা। এটি শুধু একটি রোগের বিষয় নয়, বরং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি প্রতিফলন। সঠিক পরিকল্পনা, সময়মতো পদক্ষেপ এবং সচেতনতার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এখন দেখার বিষয়, আমরা কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারি।
আপনার মতামত জানানঃ