বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণ কোনো নতুন খবর নয়, কিন্তু এটি যে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আকারের গণ–বিষক্রিয়াগুলোর একটি, সেই উপলব্ধি আজও অনেকের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। গ্রামবাংলার নলকূপকে একসময় নিরাপদ পানির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। নদী–নালার দূষিত পানির বিকল্প হিসেবে ভূগর্ভস্থ পানিই ছিল আশার ভরসা। কিন্তু সেই আশার উৎসেই যে নীরবে বিষ জমে আছে, তা ধরা পড়ে নব্বইয়ের দশকে। এরপর কেটে গেছে তিন দশকেরও বেশি সময়। তবু আর্সেনিক আজও বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড়, দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সংকটগুলোর একটি।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে টানা ২০ বছর ধরে পরিচালিত একটি বড় গবেষণা নতুন করে আলো ফেলেছে আর্সেনিক দূষণের ভয়াবহতা যেমন দেখিয়েছে, তেমনি দেখিয়েছে আশার জানালাও। গবেষণাটি প্রমাণ করেছে—দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করার পরও যদি মানুষ নিরাপদ পানির উৎসে ফিরে আসে, তাহলে হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ নানা দীর্ঘস্থায়ী রোগে মৃত্যুঝুঁকি নাটকীয়ভাবে কমে যায়। শুধু কমে যায় না, অনেক ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি নেমে আসে তাদের সমান, যারা শুরু থেকেই আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করছিলেন। এটি জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় প্রায় ১১ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে নিয়ে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। অংশগ্রহণকারীদের নিয়মিত মূত্র পরীক্ষা করে শরীরে আর্সেনিকের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে, এত বড় জনগোষ্ঠীর ওপর এমন ধারাবাহিক নজরদারি বিশ্বে খুব বেশি নেই। তাই গবেষকেরা একে আর্সেনিক সংস্পর্শ ও মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
গবেষণার ফল বলছে, যেসব মানুষ একসময় উচ্চমাত্রার আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলেও পরে নিরাপদ পানির উৎসে ফিরে গেছেন, তাঁদের মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। বিশেষ করে হৃদ্রোগ ও ক্যানসারে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিপরীতে, যারা আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করা চালিয়ে গেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ ক্ষতি থেমে থাকে না, যদি ঝুঁকির উৎস থেকে সরে না আসা যায়।
এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি কেবল ভবিষ্যতের ক্ষতি কমানোর কথা বলছে না, বরং অতীতের ক্ষতির প্রভাব থেকেও অনেকটা ফিরে আসার সম্ভাবনার কথা বলছে। দীর্ঘদিন ধরে আর্সেনিক শরীরে জমে নানা অঙ্গ–প্রত্যঙ্গে যে ক্ষত তৈরি করে, নিরাপদ পানি পানের মাধ্যমে সেগুলোর কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব—এমন ইঙ্গিত মিলেছে গবেষণায়। গবেষকেরা এই প্রক্রিয়াকে ধূমপান ছাড়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ধূমপান ছেড়ে দিলে যেমন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কিছুটা হলেও ফিরে আসে, তেমনি আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করলে শরীরের ভেতরের ক্ষতিগুলো ধীরে ধীরে সেরে ওঠার সুযোগ পায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ ১০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি লিটারের বেশি আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে। এই মাত্রা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরাপদ সীমার ওপরে। ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রাকৃতিকভাবে আর্সেনিকের উপস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই আছে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একদিকে ভূতাত্ত্বিক কারণ, অন্যদিকে ব্যাপক হারে অগভীর নলকূপ স্থাপন—এই দুই মিলেই তৈরি হয়েছে ইতিহাসের বৃহত্তম গণ–বিষক্রিয়া।
আর্সেনিক দূষণের প্রভাব ধীরে ধীরে দেখা দেয় বলে এটি আরও বিপজ্জনক। অনেক সময় ত্বকে কালো দাগ, ঘা বা শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। কিন্তু তার আগেই শরীরের ভেতরে শুরু হয়ে যায় ক্ষয়—হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস, লিভার, কিডনি সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীই এই ঝুঁকির মুখে সবচেয়ে বেশি। ফলে এটি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি সামাজিক বৈষম্য ও ন্যায্যতার প্রশ্নও।
এই গবেষণা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—আর্সেনিক সমস্যা সমাধানযোগ্য, এবং সমাধান করলে তার সুফল দ্রুত ও দৃশ্যমান। শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, বর্তমান প্রজন্মের জীবনও বাঁচানো সম্ভব। তাই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি জরুরি জনস্বাস্থ্য বিনিয়োগ।
এই লক্ষ্যে গবেষক দলটি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। আর্সেনিক–সংক্রান্ত তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে দিতে তারা ‘নলকূপ’ নামে একটি বিনা মূল্যের মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেছে। এই অ্যাপটি ৬০ লাখের বেশি টিউবওয়েলের পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর মাধ্যমে মানুষ জানতে পারবে কোন নলকূপ নিরাপদ, কোনটি ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তারাও এটি ব্যবহার করে বুঝতে পারবেন কোন এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে নতুন বা গভীর নলকূপ স্থাপন প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কাজী মতিন আহমেদ এই গবেষণাকে বাংলাদেশের জন্য একটি মোড় ঘোরানো প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, এই ফলাফল শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য আর্সেনিক–ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদেরও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করবে। কারণ এটি দেখিয়েছে—সমস্যা যত পুরোনোই হোক, সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে তার ফল পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে আর্সেনিক সংকটের ইতিহাস মূলত এক ভুল উন্নয়ন ধারণার গল্পও বটে। নিরাপদ পানির নামে যে নলকূপ বিপ্লব হয়েছিল, তা তখনকার বাস্তবতায় যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি বোঝা গেছে। এখন প্রয়োজন দ্বিতীয় প্রজন্মের সমাধান—গভীর নলকূপ, পাইপলাইনে সরবরাহকৃত নিরাপদ পানি, নিয়মিত পরীক্ষা ও তথ্যের স্বচ্ছতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের আস্থা ও সচেতনতা।
এই গবেষণা আমাদের সেই আস্থার জায়গাটাই শক্ত করে। এটি বলে—এখনো সময় আছে। যারা বছরের পর বছর আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করেছেন, তারাও যদি আজ নিরাপদ পানির দিকে ফিরে যান, তাহলে তাঁদের জীবন বাঁচতে পারে, দীর্ঘ হতে পারে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণ–বিষক্রিয়া হয়তো পুরোপুরি মুছে ফেলা যাবে না, কিন্তু তার ক্ষত অনেকটাই সারিয়ে তোলা সম্ভব। আর সেটাই এই গবেষণার সবচেয়ে বড় বার্তা—ভয়ের পাশাপাশি আশা।
আপনার মতামত জানানঃ