পশ্চিমা বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশের চোখে আজ ইরান এমন এক রাষ্ট্র, যার শাসনব্যবস্থা নড়বড়ে, অর্থনীতি চাপে এবং রাজপথে ক্ষোভ জমে উঠছে। বাইরে থেকে তাকালে মনে হয়, সামান্য ধাক্কাই হয়তো এই কাঠামোকে ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু এই দৃশ্যপটের ভেতরে ঢুকে, বিশেষ করে ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও কৌশলগত মহলের সাম্প্রতিক মূল্যায়নগুলো পড়লে বোঝা যায়—বাস্তবতা এতটা সরল নয়। ইরান আজ এমন এক মাঝামাঝি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দেশটি পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়, আবার এখনই পতনের দিকেও এগোচ্ছে না। এই ‘না ভাঙা, না দাঁড়ানো’ অবস্থাই ধীরে ধীরে তেহরানের জন্য একটি অপ্রত্যাশিত কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে।
এই বাস্তবতাকে অনেক বিশ্লেষক ‘গ্রে সিকিউরিটি জোন’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন—একটি নিরাপত্তা ধূসর অঞ্চল, যেখানে স্পষ্ট শত্রুতা আছে, কিন্তু স্পষ্ট যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেই। এই অঞ্চলে দাঁড়িয়ে ইরান সময় কিনছে। সময় শুধু দিন বা মাসের হিসেবে নয়, কৌশলগত সময়—যার ভেতরে পুনর্গঠন, হিসাব-নিকাশ এবং প্রতিপক্ষকে দ্বিধায় রাখার সুযোগ থাকে। এই দ্বিধাই আজ তেল আবিবের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলি দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হলে তাকাতে হয় ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (আইএনএসএস)-এর সাম্প্রতিক নথির দিকে। সেখানে বারবার বলা হয়েছে, ইরান যেন কোনোভাবেই আগের অবস্থায় ফিরে যেতে না পারে। চুক্তিহীন কূটনৈতিক অচলাবস্থা, সীমিত আন্তর্জাতিক নজরদারি এবং নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনার পরিবেশ—এই তিনটি একসঙ্গে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে। কারণ এই ফাঁকে ইরান ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত করতে পারে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং সামরিক প্রস্তুতির নতুন স্তরে পৌঁছাতে পারে।
কিন্তু এখানেই একটি জটিলতা আছে। প্রচলিত সামরিক যুক্তি বলছে, এমন পরিস্থিতিতে আগাম হামলাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিক্রিয়া। প্রতিপক্ষকে সময় না দিয়ে আঘাত করা, যাতে সে নিজের শক্তি পুনর্গঠন করতে না পারে। অথচ ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজপথের বাস্তবতা এই হিসাবকে উল্টো করে দিচ্ছে। বিক্ষোভ আছে, ক্ষোভ আছে, কিন্তু তা এখনো এমন কোনো ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়নি, যা শাসনব্যবস্থাকে সরাসরি উৎখাত করতে পারে। ফলে বিদেশি হামলা হলে সেই হামলাই উল্টো শাসনব্যবস্থার জন্য একটি সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে—জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিয়ে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ঢেকে ফেলার সুযোগ।
এই যুক্তি তুলে ধরেছেন ইসরায়েলের প্রখ্যাত সামরিক বিশ্লেষক রন বেন ইশাই। তাঁর মতে, তেহরানের রাজপথে যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তা বিদেশি আক্রমণের বিরুদ্ধে একধরনের মানসিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। মানুষ অসন্তুষ্ট হলেও, বাইরের শত্রুর আঘাত সেই অসন্তোষকে সহজেই ‘জাতির বিরুদ্ধে হামলা’ হিসেবে ফ্রেম করা যায়। ফলে বিক্ষোভের গতি মুহূর্তেই পাল্টে যেতে পারে।
ইতিহাস এই আশঙ্কাকে অমূলক বলে না। আট বছরব্যাপী ইরান–ইরাক যুদ্ধ দেখিয়েছে, বড় ধরনের বিদেশি হামলা কীভাবে সমাজের ভেতরের সব ক্ষতচিহ্ন সাময়িকভাবে চাপা দিয়ে জাতীয় ঐক্যের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। এই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মার্কিন সাময়িকী দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট সতর্ক করেছে—একটি সামরিক হামলা ইরানের বর্তমান বিক্ষোভের গতিপথ উল্টে দিতে পারে। বিভাজন গভীর হওয়ার বদলে, সরকার তখন যেকোনো ভিন্নমতকে দমন করার জন্য ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’-এর বৈধ অজুহাত পাবে।
এই কারণেই তেল আবিবের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা আজ এক দ্বিমুখী সংকটে আটকে আছেন। আক্রমণ করলে অনিচ্ছাকৃতভাবে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে শ্বাস নেওয়ার জায়গা করে দেওয়া হতে পারে। আবার আক্রমণ না করলে ইরান এই অবকাশকে ব্যবহার করে নিজেকে আরও সুসংগঠিত করার সময় পায়। এই দোটানার ফলেই ইসরায়েল ধীরে ধীরে উদ্যোগী অবস্থান থেকে হিসাবি অপেক্ষার অবস্থানে চলে যাচ্ছে।
এই অপেক্ষার রাজনীতিই তেহরানের জন্য সবচেয়ে লাভজনক। কারণ এই সময়ের ভেতরে ইরান শুধু টিকে থাকার কৌশলই নিচ্ছে না, বরং সংঘাতের মনস্তাত্ত্বিক গতি উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করছে। নিয়ন্ত্রিত মাত্রার বিশৃঙ্খলা বজায় রেখে তারা কার্যত নিষ্ক্রিয়তার ভার নিজেদের কাঁধ থেকে সরিয়ে প্রতিপক্ষের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে ইসরায়েল ছিল সর্বক্ষণ সতর্ক ও প্রস্তুত, সেখানে এখন তারা অনিশ্চয়তার ভেতরে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে।
এই কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বয়ান নির্মাণ। ইরানি কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জন্য মোসাদ-এর ষড়যন্ত্রের কথা তুলে ধরছেন। এই অভিযোগের ভেতরে দ্বিমুখী উদ্দেশ্য কাজ করে। দেশের ভেতরে এটি বিক্ষোভকে অবৈধ প্রমাণ করার হাতিয়ার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আগাম বা পাল্টা হামলার জন্য একধরনের নৈতিক বৈধতা তৈরি করে। অস্থিরতাকে বাইরের আগ্রাসনের ফল হিসেবে তুলে ধরে তেহরান যেকোনো সামরিক পদক্ষেপকে ‘জাতীয় আত্মরক্ষা’ হিসেবে উপস্থাপনের ভিত্তি গড়ে তোলে।
আইএনএসএসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরায়েলকে একসঙ্গে কূটনৈতিক চাপ ও সামরিক হুমকির কৌশল নিতে হবে। কিন্তু ইরানের ভেতরের এই ধূসর পরিস্থিতিতে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন। কোনো দেশ যখন দীর্ঘদিন এমন এক অবস্থায় থাকে, যা তাকে ভেঙে পড়তে দেয় না, আবার পুরোপুরি স্থিরও হতে দেয় না, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো শক্তিগুলোও সরাসরি হামলার সিদ্ধান্ত নিতে চায় না। তারা অপেক্ষা করে—পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা দেখার জন্য। এই অপেক্ষার প্রতিটি দিনই তেহরানের জন্য বাড়তি লাভ।
এই সময়কে কাজে লাগিয়ে ইরান এখন ‘অসম পুনর্গঠন’-এর কৌশলে এগোচ্ছে। আঞ্চলিক প্রক্সি শক্তিগুলো তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও, তেহরান মনোযোগ দিচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের পরিমাণ বাড়ানো এবং পারমাণবিক সীমারেখা নিয়ন্ত্রণে রাখার দিকে। কম তীব্রতার বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা নজরদারিকে রাজপথে ব্যস্ত রাখে, আর সেই আড়ালে প্রযুক্তিবিদেরা সরবরাহ লাইন মেরামত করেন, সেন্ট্রিফিউজ উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেন।
এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক ও কৌশলগত সহযোগিতার খবরগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এমন অংশীদারত্ব সর্বাত্মক যুদ্ধের পরিবেশে গড়ে তোলা কঠিন হতো। বর্তমান ধূসর পরিস্থিতিই এই সহযোগিতাকে বাস্তবসম্মত করেছে।
সব মিলিয়ে তেল আবিব ও ওয়াশিংটনে তৈরি কৌশলগত নথিগুলো একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এখন আর শুধু একটি ঘরোয়া রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সমীকরণে সময় তৈরি করে দেওয়ার একটি কার্যকর উপাদান। ইসরায়েল ইরানের সক্ষমতা ক্ষয় করতে চায়, কিন্তু সামরিক পদক্ষেপের অনিচ্ছাকৃত পরিণতি তাদের পিছু ছাড়ছে না।
এই দ্বিধার ভেতরেই তেহরান তার সবচেয়ে বড় সাফল্যটি অর্জন করেছে। তারা যুদ্ধকে নিশ্চিত ঘটনা থেকে সরিয়ে এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছে, যেখানে যুদ্ধ সম্ভব, কিন্তু তার ঝুঁকি এতটাই বেশি যে প্রতিপক্ষ বারবার থেমে যাচ্ছে। রাজপথের অস্থিরতা এখানে দুর্বলতা নয়, বরং একধরনের কৌশলগত ঢাল। এই ঢাল ভেদ করা কঠিন, কারণ এটি কেবল ট্যাংক বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তৈরি নয়; এটি তৈরি হয়েছে মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি এবং জাতীয় আত্মপরিচয়ের ভেতর দিয়ে।
এই বাস্তবতায় ইরান আজ পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো রাষ্ট্র নয়। আবার নিখুঁতভাবে স্থিতিশীল শক্তিও নয়। সে দাঁড়িয়ে আছে মাঝখানে—এমন এক জায়গায়, যেখানে অনিশ্চয়তাই তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আর এই অস্ত্র দিয়েই তেহরান সময় কিনছে, সমীকরণ বদলাচ্ছে এবং প্রতিপক্ষকে তার নিজের সিদ্ধান্তের ভারে ক্লান্ত করে তুলছে।
আপনার মতামত জানানঃ