প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছর আগে এক ভয়ংকর সংঘর্ষে জন্ম হয়েছিল চাঁদের। তরুণ পৃথিবীর গায়ে মঙ্গলগ্রহের সমান এক মহাজাগতিক পাথর আছড়ে পড়েছিল, আর সেই আঘাতের অভিঘাতে পৃথিবীরই একাংশ ছিটকে গিয়ে আজকের চাঁদ। সেই থেকে পৃথিবীর চারপাশে নীরবে ঘুরে চলেছে এই উপগ্রহ—দূরত্বে কাছের, রহস্যে আরও কাছের। মানুষের চোখে চাঁদ মানে শূন্যতা, ধূসর ভূমি, বায়ুহীন এক জগৎ। অথচ সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই ধারণা অসম্পূর্ণ। চাঁদের বুকের গভীরে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ, নীরব ইতিহাস—যার বড় অংশই লেখা হয়েছে পৃথিবী থেকে আসা কণায় কণায়।
চাঁদের সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্ক শুধুই মাধ্যাকর্ষণের নয়, শুধুই জোয়ার-ভাটার নয়। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবী নিজেই তার বায়ুমণ্ডলের অংশ চাঁদের দিকে পাঠিয়ে চলেছে। কোনও ঘোষণা ছাড়াই, কোনও দৃশ্যমান চিহ্ন না রেখে। সৌরবায়ুর স্রোতে ভেসে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অতি সূক্ষ্ম কণাগুলি ধীরে ধীরে পৌঁছে যাচ্ছে চাঁদের মাটিতে। সেখানে তারা জমছে, সংরক্ষিত হচ্ছে, তৈরি করছে এমন এক রাসায়নিক ভাণ্ডার যা ভবিষ্যতে মানুষের চাঁদে বসবাসের সম্ভাবনাকে বাস্তবের আরও কাছাকাছি এনে দিচ্ছে।
সত্তরের দশকে অ্যাপোলো অভিযানের সময় চাঁদ থেকে আনা মাটি ও পাথরের নমুনা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রথম বুঝতে পারেন, চাঁদের মাটি আদৌ ‘শূন্য’ নয়। সেখানে জল, কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন, হিলিয়াম, আর্গন—এমন বহু উপাদানের অস্তিত্ব রয়েছে। বিস্ময়ের বিষয় হল, এই উপাদানগুলির বড় অংশের উৎস চাঁদ নিজে নয়, পৃথিবী। এত দিন পর্যন্ত ধারণা ছিল, সৌরবায়ু কিছু কণা পৃথিবী থেকে তুলে নিয়ে চাঁদের দিকে ঠেলে দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই পরিমাণ খুব সীমিত। বিশেষ করে নাইট্রোজেনের মতো ভারী উপাদান এত বেশি পরিমাণে চাঁদে পৌঁছনো সৌরবায়ুর পক্ষে সম্ভব নয় বলেই মনে করা হত।
এই প্রশ্নের এক সময়কার ব্যাখ্যা ছিল পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর ইতিহাসের একেবারে শুরুর দিকে, যখন শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র গড়ে ওঠেনি, তখন বায়ুমণ্ডলের কণাগুলি তুলনামূলক সহজেই মহাশূন্যে বেরিয়ে যেতে পারত। সেই সময়েই নাকি প্রচুর নাইট্রোজেন সৌরবায়ুর সঙ্গে ভেসে চাঁদে পৌঁছেছিল। পরে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র শক্তিশালী হয়ে ওঠায় বায়ুমণ্ডল অনেকটাই সুরক্ষিত হয়, কণার বহির্গমন কমে যায়—এমনটাই ছিল প্রচলিত ধারণা।
কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি আর উন্নত কম্পিউটার মডেলিং এই ছবিটা বদলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র বায়ুমণ্ডলীয় কণার বহির্গমন পুরোপুরি আটকায় না। বরং বিশেষ পরিস্থিতিতে তা এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল ও কার্যকর করে তুলতে পারে। সৌরবায়ু যখন পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়া করে, তখন এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে বায়ুমণ্ডলের কিছু কণা সহজেই মহাশূন্যে ছিটকে যেতে পারে। আর সেই কণাগুলির গন্তব্য বহু সময়েই হয় চাঁদ।
এই প্রক্রিয়া নতুন নয়। কোটি কোটি বছর ধরে এটি ঘটেই চলেছে। এত দিন মানুষের চোখে ধরা পড়েনি, কারণ এই স্থানান্তর অত্যন্ত ধীর, অত্যন্ত সূক্ষ্ম। কিন্তু সময়ের পাল্লায় এর প্রভাব বিপুল। চাঁদের মাটিতে জমে উঠেছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের এক দীর্ঘ রাসায়নিক স্মৃতি। গবেষকদের মতে, এই মাটির স্তর বিশ্লেষণ করলে শুধু চাঁদের ইতিহাস নয়, পৃথিবীর জলবায়ু, সমুদ্রের বিকাশ এমনকি প্রাণের বিবর্তন সম্পর্কেও নতুন সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিকটি অবশ্য ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে। মানুষের চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি এত দিন ছিল প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক দিক থেকে অত্যন্ত কঠিন এক স্বপ্ন। জল, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন—এই মৌলিক উপাদানগুলি পৃথিবী থেকে বহন করে নিয়ে যেতে হত, যা ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু যদি চাঁদের মাটিতেই জল ও নাইট্রোজেনের মতো উপাদান স্থায়ী ভাবে উপস্থিত থাকে, তাহলে সেই সমীকরণটাই বদলে যায়। চাঁদের মাটি থেকেই ভবিষ্যতে শ্বাসযোগ্য বাতাস, জ্বালানি বা কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে চাঁদ হঠাৎ করে পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। সেখানে এখনও নেই ঘন বায়ুমণ্ডল, নেই তরল জলভরা নদী বা সাগর। কিন্তু মানুষের স্থায়ী গবেষণা ঘাঁটি, দীর্ঘমেয়াদি অভিযান কিংবা মহাকাশ অনুসন্ধানের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে চাঁদের ভূমিকা যে আরও শক্তিশালী হচ্ছে, তা বলাই যায়। পৃথিবী যেন নিজেই তার উপগ্রহকে একটু একটু করে প্রস্তুত করে দিচ্ছে—একেবারে নীরবে, ধৈর্যের সঙ্গে।
এই গবেষণা আমাদের ভাবনাকেও নতুন করে নাড়িয়ে দেয়। পৃথিবী ও চাঁদকে আমরা প্রায়ই আলাদা সত্তা হিসেবে দেখি—একটি প্রাণে ভরা, অন্যটি প্রাণহীন। অথচ বাস্তবে তারা এক গভীর আদান–প্রদানের সম্পর্কে জড়িত। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কণা চাঁদে জমছে, আবার চাঁদের ইতিহাস বুঝে আমরা পৃথিবীর অতীত জানতে পারছি। এই দ্বিমুখী সম্পর্ক সৌরজগতের অন্য গ্রহ–উপগ্রহ সম্পর্কগুলিকেও নতুন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ করে দেয়।
চাঁদের মাটি হয়তো ভবিষ্যতে মানুষের জন্য শুধু বসবাসের জায়গাই হবে না, হয়ে উঠতে পারে এক মহাজাগতিক আর্কাইভ। সেখানে সংরক্ষিত থাকবে পৃথিবীর আদিম বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক স্বাক্ষর, জলবায়ুর বিবর্তনের চিহ্ন, এমনকি জীবনের উত্থানের ইঙ্গিতও। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবী যা হারিয়েছে বা বদলে ফেলেছে, তার কিছু অংশ হয়তো চাঁদ আগলে রেখেছে নিখুঁত নিষ্ঠায়।
সব মিলিয়ে এই আবিষ্কার আমাদের শেখায় ধৈর্যের মূল্য। যে প্রক্রিয়া চোখে দেখা যায় না, যা মানুষের জীবনের সময়সীমার বাইরে ঘটে, তা-ই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে তোলে। পৃথিবী আর চাঁদের এই নীরব লেনদেন তারই এক অনন্য উদাহরণ। হয়তো ভবিষ্যতে, কোনও এক চাঁদের রাতে, মানুষ চাঁদের মাটিতে দাঁড়িয়ে শ্বাস নেবে এমন বাতাসে, যার একাংশের জন্ম হয়েছিল বহু কোটি বছর আগে পৃথিবীর আকাশে। তখন বুঝতে আরও সহজ হবে—এই দুই জগত আসলে কতটা গভীরভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে।
আপনার মতামত জানানঃ