
বাগেরহাটের রাজনীতিতে ডিসেম্বর মাসটি যেন নতুন করে অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়া নিয়ে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি বাগেরহাটে বিএনপির মনোনয়ন ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। কারণ, চারটি আসনের মধ্যে দুটিতেই মনোনয়ন পেয়েছেন এমন দুই ব্যক্তি, যাঁদের রাজনৈতিক অতীত দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই বাস্তবতা শুধু প্রতিপক্ষের সমালোচনার খোরাক হয়নি, বরং বিএনপির ভেতরেই তৈরি করেছে ক্ষোভ, হতাশা ও ভাঙনের আশঙ্কা।
বাগেরহাট-১ ও বাগেরহাট-৪ আসনের প্রার্থী ঘোষণা হতেই স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা যেন নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। যাঁদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন, মামলা-হামলা ও রাজনৈতিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলে লড়াই করেছেন, সেই আওয়ামী লীগের সাবেক নেতারাই এখন ধানের শীষের প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে নামতে যাচ্ছেন—এই বাস্তবতা অনেকের কাছে অসহনীয় ঠেকছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভের ভাষা তাই শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ নেই; সেখানে রয়েছে আত্মপরিচয়ের সংকট ও ত্যাগের অবমূল্যায়নের বেদনা।
বাগেরহাট-১ আসনে মনোনয়ন পাওয়া কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলের পরিচয় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন নয়। তিনি চিতলমারী উপজেলার কলাতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন—এই তথ্য স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে অজানা নয়। একই সঙ্গে তিনি মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বাংলাদেশের মহাসচিব এবং বাংলাদেশ অশ্বিনী সেবা আশ্রমের সভাপতি। এই বহুমুখী পরিচয় তাঁকে একটি বিশেষ সামাজিক ও ধর্মীয় বলয়ের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরে। তবে বিএনপির তৃণমূলের প্রশ্ন—এই সামাজিক পরিচয় কি রাজনৈতিক অতীতকে মুছে দিতে পারে?
অন্যদিকে বাগেরহাট-৪ আসনের প্রার্থী সোমনাথ দে’র রাজনৈতিক জীবন আরও জটিল ও বর্ণিল। জাতীয় পার্টি দিয়ে রাজনীতিতে শুরু, পরে আওয়ামী লীগে যোগদান, উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটিতে সদস্যপদ—সব মিলিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। যদিও তিনি গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নেন, কিন্তু স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মতে, এই অব্যাহতি সময়ের হিসেবে খুব বেশি পুরোনো নয়। তাঁদের প্রশ্ন—দীর্ঘদিন যে দল ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে মাত্র এক বছরের মধ্যে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া কতটা নৈতিক?
এই দুই প্রার্থীকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—রাজনৈতিক দায়মুক্তি ও সুবিধাবাদ। বিএনপির তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী মনে করছেন, আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে যারা দল ছেড়ে এসেছে, তারা মূলত সুবিধার রাজনীতি করেছে। ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনা তৈরি হতেই তারা নতুন আশ্রয় খুঁজেছে। এই ধারণা যতই ব্যক্তিগত বক্তব্যে অস্বীকার করা হোক না কেন, রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্নের ওজন কম নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের প্রকাশ হয়েছে ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপের ভাষায়। সোমনাথ দে’র ছবি শেয়ার করে ‘জয় বাংলা, ধানের শীষে ভোট দিন’—এই মন্তব্য শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং রাজনৈতিক আদর্শের অস্পষ্টতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। আরেকজন মন্তব্য করেছেন, ‘সাথে জাতীয় পার্টির স্লোগান যুক্ত করে দিন।’ এই বাক্যগুলোতে ফুটে উঠেছে স্থানীয় রাজনীতির তিক্ত বাস্তবতা—দল বদলের ইতিহাস এতটাই প্রকাশ্য যে তা আর গোপন রাখা যায় না।
এই ক্ষোভের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে দলীয় কাঠামোর ভেতরেও। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ টি এম আকরাম হোসেন তালিম স্বীকার করেছেন, স্থানীয় নেতা-কর্মীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা ও নির্যাতন সহ্য করে যারা দল আঁকড়ে ধরে রেখেছেন, তাদের চোখের সামনে অন্য দল থেকে আসা ব্যক্তিদের মনোনয়ন পাওয়াটা মানসিকভাবে বড় আঘাত। যদিও তিনি এটাও বলেছেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে স্থানীয় পর্যায়ে করার তেমন কিছু নেই—এই বক্তব্যই দেখিয়ে দেয়, তৃণমূল ও কেন্দ্রের মধ্যে দূরত্ব কতটা প্রকট।
জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ সালামের বক্তব্য আরও কঠোর। তাঁর ভাষায়, আওয়ামী লীগের পদধারী নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া তৃণমূল কীভাবে মেনে নেবে? তিনি সরাসরি এই দুই প্রার্থীকে ‘সুবিধাবাদী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং শেখ হেলালের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়; এটি বাগেরহাটের স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ধরনের সাক্ষ্যও বহন করে।
তবে এই সমালোচনার বিপরীতে কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল ও সোমনাথ দে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পিছপা নন। কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল দাবি করেছেন, তিনি কখনো অন্য কোনো দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং এটিই তাঁর প্রথম রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া। যদিও এই বক্তব্য স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়। কারণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতির পদ কোনোভাবেই অরাজনৈতিক পরিচয় নয়।
সোমনাথ দে’র বক্তব্য আরও আক্রমণাত্মক। তিনি বলেন, তাঁর মনোনয়নে যারা চাঁদাবাজি, জুলুম ও নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের গাত্রদাহ হচ্ছে। তিনি নিজের রাজনৈতিক জীবনকে ‘সংগ্রামের ইতিহাস’ হিসেবে তুলে ধরতে চান—জাতীয় পার্টি করা, আওয়ামী লীগ করা, জেল খাটা—সবই তাঁর বর্ণনায় এক ধরনের বৈধতার গল্প। তাঁর যুক্তি, দলের হাইকমান্ড তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে, সুতরাং এই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ভেতর দিয়ে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তা হলো—বিএনপি আসলে কোন রাজনীতির দিকে হাঁটছে? দীর্ঘদিন ধরে দলটি নিজেদের ‘নির্যাতিত ও বঞ্চিত’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। আন্দোলন, কারাবরণ, ত্যাগ—এসবই ছিল দলীয় পরিচয়ের মূল উপাদান। কিন্তু এখন যদি সেই পরিচয়ের জায়গায় সুবিধাজনক সমীকরণ ও নির্বাচনী কৌশল প্রাধান্য পায়, তাহলে দলের আদর্শিক অবস্থান কোথায় দাঁড়াবে?
বাগেরহাটের এই ঘটনা আসলে শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়। এটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। দল বদল, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা, আদর্শের চেয়ে নির্বাচনী জয়ের হিসাব—এসব মিলিয়ে রাজনীতি অনেক সময় নৈতিকতার জায়গা থেকে সরে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে দলকে শক্তিশালী করে, নাকি ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়?
তৃণমূলের ক্ষোভ উপেক্ষা করে দেওয়া সিদ্ধান্ত নির্বাচনের মাঠে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। বিএনপির স্থানীয় অনেক কর্মী ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানাচ্ছেন। কেউ কেউ নীরবে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কেউ হয়তো ভেতরে ভেতরে বিরূপ মনোভাব পোষণ করবেন। এই নীরব বিরোধিতা নির্বাচনের সময় বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে—যা কাগজে-কলমে ধরা পড়ে না, কিন্তু ভোটের ফলাফলে তার ছাপ পড়ে।
আরেকটি দিক হলো সংখ্যালঘু রাজনীতির সমীকরণ। কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল ও সোমনাথ দে দুজনেই সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং মতুয়া ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত। বিএনপির কৌশল হয়তো সংখ্যালঘু ভোটব্যাংককে নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা। কিন্তু এই কৌশল যদি তৃণমূলের বড় অংশকে বিমুখ করে তোলে, তাহলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাগেরহাটের রাজনীতি তাই এখন এক ধরনের পরীক্ষার মুখে। এই পরীক্ষায় শুধু দুই প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নয়, বরং দলের ভেতরের সংহতি, আদর্শিক অবস্থান এবং ত্যাগের মূল্যায়ন—সবকিছুই যাচাই হবে। বিএনপি যদি সত্যিই জনগণের আস্থা ফেরাতে চায়, তাহলে এই ক্ষোভকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়; প্রশ্নটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির। আওয়ামী লীগ থেকে আসা দুই নেতার বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া হয়তো কেন্দ্রীয়ভাবে একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের সামাজিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া যে কতটা গভীর, বাগেরহাটের ঘটনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এই ক্ষত উপেক্ষা করলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।
বাগেরহাটের রাজনীতিতে এখন তাই শুধু নির্বাচনের হিসাব নয়, চলছে আত্মসমালোচনার সময়। তৃণমূলের ক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিদ্রূপ, দলের ভেতরের প্রকাশ্য অসন্তোষ—সব মিলিয়ে একটি প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে: আদর্শ ও সুবিধার এই দোলাচলে শেষ পর্যন্ত কার জয় হবে? সেই উত্তর দেবে সময়, আর ভোটের রায়।
আপনার মতামত জানানঃ