
একটি মুখ কখন ইতিহাসের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে? কালো বেরেট, তার মাঝখানে ছোট একটি তারা, দাড়ি এবং দূরের দিকে তাকিয়ে থাকা দৃঢ় চোখ—চে গুয়েভারার প্রতিকৃতি দেখলে অনেকেই মানুষটির নাম চিনতে পারেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, রাষ্ট্র পরিচালনার ভূমিকা কিংবা শেষ গেরিলা অভিযানের ইতিহাস সম্পর্কে তাঁদের জানা সমান গভীর নাও হতে পারে। এখানেই চের বিশেষত্ব: তিনি একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ব্যক্তি, রাজনৈতিক স্মৃতি এবং এমন এক দৃশ্যমান প্রতীক, যার অর্থ ব্যবহারকারীভেদে বদলে যায়।
১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর বলিভিয়ায় বন্দী হন চে। পরদিন, ৯ অক্টোবর তাঁকে হত্যা করা হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত সমসাময়িক নথিতে বন্দী করার পর বলিভিয়ার সামরিক সদর দপ্তর থেকে তাঁকে হত্যার নির্দেশ আসার বিবরণ রয়েছে। ২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর সেই মৃত্যুর ৫৯ বছর পূর্ণ হচ্ছে। একজন মানুষের জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর মুখের এত দীর্ঘ দ্বিতীয় জীবন কীভাবে তৈরি হলো—সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু বিপ্লবের ইতিহাসে নেই। রয়েছে ছবি, মুদ্রণ, আন্দোলন, স্মৃতি ও বাজারের সম্পর্কেও।
চিকিৎসক থেকে বিপ্লবী
১৯২৮ সালে আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া এর্নেস্তো গুয়েভারা চিকিৎসাশিক্ষা গ্রহণ করেন। দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণে দেখা দারিদ্র্য ও বৈষম্য তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা রাখে। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় হাকোবো আরবেন্স সরকারের বিরুদ্ধে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থান তাঁর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে। ১৯৫৫ সালে মেক্সিকোয় ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে পরিচয় হয়; পরে তিনি কিউবার গেরিলা আন্দোলনে যোগ দেন।
১৯৫৮ সালের শেষ দিকে সান্তা ক্লারার যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা এবং ১৯৫৯ সালে বাতিস্তার শাসনের পতন তাঁকে বিজয়ী বিপ্লবের অন্যতম মুখে পরিণত করে। পরবর্তী সময়ে তিনি কিউবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ও শিল্পমন্ত্রী হন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পদে স্থায়ী জীবন বেছে নেওয়ার বদলে কঙ্গো এবং পরে বলিভিয়ায় বিপ্লবী অভিযান চালান; সেখানে কিউবার সাফল্য পুনরাবৃত্তি করতে পারেননি।
এই জীবনপথ তাঁর প্রতীকী গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। জন্মভূমির বাইরে লড়াই, ব্যক্তিগত ঝুঁকি এবং রাষ্ট্রীয় পদ ছেড়ে নতুন অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সমর্থকেরা আন্তর্জাতিক সংহতি ও আত্মত্যাগের ছবি নির্মাণ করেছেন। এর অর্থ অবশ্য তাঁর রাজনৈতিক কৌশল কার্যকর ছিল কিংবা সব সিদ্ধান্ত ন্যায্য ছিল—এমন নয়। আত্মত্যাগ একটি মূল্যায়নের বিষয়; রাজনৈতিক ফলাফল আরেকটি।
চের ভাবনায় সমাজ বদলের জন্য মানুষের নৈতিক প্রেরণার ওপর জোর ছিল। বিপ্লবী মানুষকে শুধু ব্যক্তিগত লাভের হিসাব ছাড়িয়ে সমষ্টির জন্য কাজ করতে হবে—এই আকাঙ্ক্ষা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ। কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থনীতি, উৎপাদন ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জটিলতা বিপ্লবী দৃঢ়তা দিয়ে কতটা সামলানো যায়, তা তাঁর জীবন নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করেছে।
একটি ছবির নতুন জীবন
বিশ্বজোড়া পরিচিত চের মুখটির উৎস আলোকচিত্রী আলবের্তো কোর্দার তোলা একটি ছবি। ১৯৬০ সালের ৫ মার্চ হাভানায় বিস্ফোরণে নিহতদের স্মরণানুষ্ঠানে ছবিটি তোলা হয়। নাম দেওয়া হয় ‘গেরিয়েরো এরোইকো’—সাধারণভাবে ‘বীর গেরিলা’ হিসেবে অনূদিত। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব ফটোগ্রাফির বিবরণ অনুযায়ী, মূল ফ্রেমের পাশের মানুষ ও পামগাছের অংশ বাদ দিয়ে কোর্দা চের মুখটি আলাদা করেন।
ছবির সেই বিন্যাসে একটি বিশেষ শক্তি রয়েছে। সেখানে বক্তৃতার দীর্ঘ বক্তব্য নেই, যুদ্ধের বিশদ দৃশ্য নেই, নেই কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। রয়েছে একটি মুখ ও দৃষ্টি। দর্শক তার মধ্যে প্রত্যয়, বেদনা কিংবা প্রতিবাদের অর্থ খুঁজে নিতে পারেন। ছবিটি তাই নির্দিষ্ট মুহূর্তের দলিল থেকেও বৃহত্তর আবেগের বাহন হওয়ার সুযোগ পায়।
আয়ারল্যান্ডের শিল্পী জিম ফিটজপ্যাট্রিকের ১৯৬৮ সালের লাল-কালো পোস্টাররূপ এই প্রতিকৃতির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নিজস্ব প্রকাশনা ও ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামের বিবরণে সেই গ্রাফিক রূপান্তরের ইতিহাস পাওয়া যায়। সরল রঙ, স্পষ্ট রেখা ও চেনা মুখের কাঠামো প্রতিকৃতিটিকে পুনর্মুদ্রণের উপযোগী করে তোলে।
কোর্দার আলোকচিত্র ও ফিটজপ্যাট্রিকের পোস্টার একই সৃষ্টিকর্ম নয়। প্রথমটি ক্যামেরায় ধরা একটি মুহূর্ত; দ্বিতীয়টি তার শিল্পিত গ্রাফিক রূপ। তবে জনপ্রিয় ব্যবহারে এই পার্থক্য প্রায়ই আড়াল হয়ে যায়। আমরা যে ‘চের ছবি’ বলি, তার পেছনে একাধিক স্রষ্টা ও প্রচারের ইতিহাস আছে।
কিউবার আন্তর্জাতিক সংহতি সংগঠন ওসপাআলও পোস্টার ও প্রকাশনার মাধ্যমে বিপ্লবী দৃশ্যভাষা ছড়িয়ে দেয়। ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়াম এই সংগঠনের নকশা, বহু ভাষায় বার্তা ও আন্তর্জাতিক প্রচারের ভূমিকা তুলে ধরেছে। ফলে প্রতিকৃতির বিস্তারকে শুধু বাজারের ঘটনা হিসেবে দেখলে আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের অবদান বাদ পড়ে যায়।
মৃত্যু থেকে স্মৃতি, স্মৃতি থেকে প্রতীক
চে বলিভিয়ায় জয়ী হননি। তাঁর অভিযান পরাজিত হয় এবং বন্দী অবস্থায় জীবন শেষ হয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরাজয় সব সময় স্মৃতির পরাজয়ে পরিণত হয় না। নিহত বিপ্লবীর জীবনকে সমর্থকেরা অসমাপ্ত সংগ্রামের প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখতে পারেন। শেষ পরিণতি তখন ব্যর্থ কৌশলের পাশাপাশি আত্মত্যাগের গল্পও হয়ে ওঠে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব ফটোগ্রাফি চের প্রতিকৃতির বিশ্বব্যাপী বিস্তারকে ১৯৬৮ সালের ছাত্রবিদ্রোহসহ নানা প্রতিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও দেখিয়েছে, তাঁর নির্দিষ্ট মতাদর্শের বাইরে ছবিটি সাধারণ বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
এই বদল বোঝা জরুরি। ঐতিহাসিক চে ছিলেন নির্দিষ্ট মার্কসবাদী বিশ্বাস ও সশস্ত্র বিপ্লবের কৌশলের অনুসারী। জনপ্রিয় প্রতীকের চে কখনো কেবল অবাধ্যতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বা তরুণের প্রতিবাদী পরিচয় প্রকাশ করেন। একই মুখ ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসের মানুষের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।
এটি প্রতীকের শক্তি এবং সীমাবদ্ধতা দুটোই। বহু মানুষের কাছে পৌঁছাতে গিয়ে অর্থ বিস্তৃত হয়। সেই সঙ্গে মানুষটির নির্দিষ্ট বিশ্বাস, সিদ্ধান্ত ও দায় ঝাপসা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
প্রতিকৃতির আড়ালে যে বিতর্ক
চেকে বুঝতে হলে তাঁর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন করতে হয়। বিপ্লবের পর লা কাবানিয়া দুর্গে তাঁর দায়িত্বের সঙ্গে বন্দীদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইতিহাস যুক্ত। কতজন, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কার প্রত্যক্ষ নির্দেশে নিহত হয়েছিলেন—এসব বিষয়ে বিভিন্ন বিবরণে পার্থক্য আছে; এখানে বিতর্কিত সংখ্যাকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে না।
কিন্তু সংখ্যার বিতর্ক থেকে নৈতিক প্রশ্নটি মুছে যায় না। একটি স্বৈরশাসনের পতনের পর অপরাধের বিচার কীভাবে হবে? অভিযুক্তের প্রতিরক্ষা ও ন্যায্য প্রক্রিয়া কতটা থাকবে? বিপ্লবী প্রয়োজনের যুক্তি রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে কত দূর বৈধতা দিতে পারে? এসব প্রশ্ন চের উত্তরাধিকারের অংশ।
তাঁর অর্থনৈতিক দায়িত্ব ও গেরিলা কৌশলের ব্যর্থতাও মূল্যায়নের বিষয়। একটি দেশে সফল সশস্ত্র সংগ্রামের অভিজ্ঞতা অন্য দেশের সামাজিক বাস্তবতায় সরাসরি প্রয়োগ করা যায় কি না, কঙ্গো ও বলিভিয়ার অভিযান সেই প্রশ্ন সামনে আনে। স্থানীয় সমর্থন, সংগঠন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছাড়া ব্যক্তিগত সাহস যথেষ্ট নয়।
চের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান অনুধাবন করা এবং তাঁর সব পদ্ধতি সমর্থন করা এক সিদ্ধান্ত নয়। আবার তাঁর সহিংসতার দায় আলোচনা করলেই দারিদ্র্য ও বৈষম্য সম্পর্কে তাঁর উদ্বেগ অস্বীকার করতে হয় না। ইতিহাসের মানুষকে বিচার করার জন্য এই জটিলতা বহন করা প্রয়োজন।
বাজার কেন বিপ্লবীর মুখ বিক্রি করে
চের প্রতিকৃতি টি-শার্ট, পোস্টার ও নানা পণ্যে ব্যবহৃত হয়েছে—ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব ফটোগ্রাফির প্রদর্শনী এই বিপ্লব ও বাণিজ্যের সম্পর্ক নিয়েই কাজ করেছে। যে রাজনৈতিক ভাবনা পুঁজিবাদী শোষণের বিরোধিতা করেছিল, তার একটি মুখ বাজারে বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হওয়া আপাতবিরোধ তৈরি করে।
এই বিরোধের একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, বাজার ছবিটির বহন করা বিদ্রোহী আবেগকে পণ্যের আকর্ষণে রূপ দেয়। ক্রেতা তখন একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি, কিংবা তার কোনো জ্ঞান ছাড়াই, নিজের পরিচয়ের ভাষা কিনতে পারেন। তবে প্রত্যেক ক্রেতার উদ্দেশ্য একই—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। কারও কাছে পোশাকটি রাজনৈতিক বিশ্বাস, কারও কাছে নকশা, কারও কাছে সাংস্কৃতিক পরিচয়।
বাণিজ্যিক ব্যবহার ছবিটির রাজনৈতিক অর্থ সম্পূর্ণ মুছে দেয়—এমন দাবিও অতিরঞ্জিত। একই প্রতিকৃতি দোকানে পণ্য এবং কোনো সমাবেশে প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে। তার অর্থ নির্ভর করে ব্যবহার, প্রেক্ষাপট ও দর্শকের ওপর।
চের বিশ্বজোড়া প্রতীক হয়ে ওঠার ইতিহাস তাই একজন বিপ্লবীর জনপ্রিয়তার চেয়েও বেশি কিছু শেখায়। ছবি কীভাবে জটিল মানুষকে কয়েকটি দৃশ্যমান চিহ্নে সংক্ষিপ্ত করে, মৃত্যু কীভাবে স্মৃতি নির্মাণে কাজ করে এবং বাজার কীভাবে প্রতিবাদের ভাষা গ্রহণ করে—সবই এখানে দেখা যায়।
চেকে স্মরণ করার দায়িত্ব তাঁর প্রতিকৃতির পাশে তাঁর ইতিহাসও রাখা। সেই ইতিহাসে রয়েছে সাহস ও আদর্শের আকর্ষণ, সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দায়, সফলতা ও ব্যর্থতা। বিশ্বজোড়া প্রতীকটি বুঝতে হলে মুখটির পেছনে মানুষটিকে ফিরে দেখতে হবে।
আপনার মতামত জানানঃ