২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে দেশের সামনে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুনভাবে গড়ে তোলার একটি বড় সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিও দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে, বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু দুই বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রত্যাশার অনেকটাই এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।
ক্ষমতার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও তারা এমন একটি অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছিল, যা দীর্ঘদিনের নানামুখী দুর্বলতায় আক্রান্ত ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, ব্যাংকিং খাতের সংকট, রাজস্ব আহরণে স্থবিরতা, বিনিয়োগের নিম্নগতি এবং পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতা অর্থনীতিকে আগেই দুর্বল করে তুলেছিল। পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়নি। বরং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন করে জ্বালানি সরবরাহ ও বৈদেশিক ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ আরও কঠিন করে তুলেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, দীর্ঘ সময়ের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসানের পর কোনো রাষ্ট্র খুব দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে না। কারণ এ ধরনের শাসনব্যবস্থা সাধারণত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, প্রশাসনিক দক্ষতা কমিয়ে দেয়, অর্থনীতিতে কাঠামোগত ক্ষতি সৃষ্টি করে এবং জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে। ফলে শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই অর্থনীতি বা রাজনীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থিতিশীল হয়ে ওঠে না। নতুন নেতৃত্বকে একই সঙ্গে অতীতের ক্ষতি সামাল দিতে এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে তুলতে হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্য পরিবারগুলোর ব্যয় বাড়িয়েছে, ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ও সংকুচিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে গড় মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও তা এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতিও সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ না হওয়ায় সরকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি পূরণে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ব্যাংকিং খাতের সংকটও অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে এসেছে। বছরের পর বছর খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের নিম্নগতি বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বৈদেশিক খাতেও পরিস্থিতি খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতিকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছে। সরকার বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়ানো, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করা এবং রপ্তানি আয় দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনো সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তনের ফলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই।
বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শিল্পের আধুনিকায়ন প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।
জ্বালানি সংকট বর্তমানে শিল্পখাতের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি। গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, এলএনজি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চ খরচ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, সিমেন্ট ও ইস্পাত শিল্পের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও দুর্বল হচ্ছে।
পুঁজিবাজারও এখনো আস্থার সংকট থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। অতীতের অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ বাজার থেকে দূরে সরে গেছে। তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের দুর্বল সুশাসন, নতুন মানসম্পন্ন কোম্পানির স্বল্প উপস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সীমিত অংশগ্রহণ বাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কার্যকর উৎস হিসেবে গড়ে উঠতে বাধা দিচ্ছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ রয়ে গেছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সে অনুপাতে নতুন চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে না। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে দেশের জনমিতিক সুবিধাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে বিপুলসংখ্যক কর্মহীন তরুণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
সরকারের সামনে আরেকটি বড় চাপ হলো ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ। উন্নয়ন ব্যয়, পুরোনো দেনা পরিশোধ এবং বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় ভবিষ্যতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে বরাদ্দের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকলে এটি ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং ঋণমান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধিকে তারা ভবিষ্যৎ সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেও বিভিন্ন মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক পুনর্গঠনও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপ ও সহাবস্থানের কিছু অগ্রগতি হলেও মৌলিক নীতিগত মতপার্থক্য রয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা না হলে অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফলও পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান শর্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা—এসব ক্ষেত্র একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। কোনো একটি খাতে অগ্রগতি হলেও অন্য খাতগুলো দুর্বল থাকলে সামগ্রিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না।
দুই বছর আগে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তা এখনো একটি চলমান প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ন্যায়ভিত্তিক প্রবৃদ্ধি এবং নাগরিকদের আস্থা পুনর্গঠনের ওপর। বাংলাদেশের সামনে সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও। আগামী কয়েক বছরে সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে দেশ ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তির দিকে এগোতে পারে। তবে সংস্কার বিলম্বিত হলে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সংকট এবং ঋণের চাপ অর্থনীতির ওপর আরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর নীতি, দক্ষ প্রশাসন এবং সামাজিক আস্থার সমন্বয়ই আগামী দিনের বাংলাদেশের পুনরুদ্ধারের মূল ভিত্তি হয়ে উঠবে।
আপনার মতামত জানানঃ