
দুই বছর ধরে যেন নীরব ছিল কলকাতার নিউ মার্কেট-সদর স্ট্রিটের গলিগলি। বাংলাদেশি পর্যটকদের কোলাহল, কেনাকাটার উৎসাহ আর চিকিৎসা নিয়ে আসা আত্মীয়ের উদ্বিগ্ন চোখ—এই দৃশ্যগুলো মিলিয়ে গিয়েছিল রাজনৈতিক উত্তাপ আর কঠোর ভিসা নীতির আড়ালে। কিন্তু সেই বন্ধ দরজা আবার খুলছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে কলকাতার ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে হোটেল, পরিবহন ও চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষ।
ভারতের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু হয়েছে। কলকাতার ব্যবসায়ী নেতারা এটিকে কেবল একটি প্রশাসনিক আদেশ হিসেবে দেখছেন না; তাঁরা দেখছেন দীর্ঘদিনের আত্মীয়তা ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন হিসেবে। স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি মনতোষ সাহা স্পষ্ট করে বলেছেন, “কলকাতা সব সময়ই বাংলাদেশের মানুষকে স্বাগত জানিয়েছে। এখন তাঁদের নিরাপত্তায় আমরা ৩৫টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছি, পুলিশ ও পুরসভার সঙ্গে কাজ করছি, যাতে অতিথিরা আগের চেয়েও বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।”
ঠিক সেই সময়েই, যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অবৈধ অভিবাসন ইস্যুতে তুমুল বিতর্ক চলছিল, বাংলাদেশি পর্যটকেরা একপ্রকার অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। বিজেপি যেমন ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তেমনই তৃণমূল কংগ্রেস বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিকদের হয়রানির কথা তুলেছে। এমনকি গুজরাট, কর্ণাটকের মতো দূরের রাজ্যেও বাংলাভাষী শ্রমিকদের বাংলাদেশি সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের খবর এসেছে। আর ঠিক এই আবহেই ভিসা বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকাতার অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়।
কিন্তু রাজনৈতিক বাক্যবাণ শেষে প্রশাসনিক বাস্তবতা নতুন বার্তা দিচ্ছে। ভিসা চালু হওয়ার এই সিদ্ধান্তে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি পরিপক্ব রূপ ফুটে উঠেছে, যেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সম্পর্ক একে অপরের পরিপূরক। জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সুনীল মুখার্জির মতে, নির্বাচনী প্রচারণার গরম ভাষা আর রাষ্ট্রপরিচালনার ভাষা এক নয়। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, “ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি হলো অভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, চিকিৎসা ও শিক্ষা—এই বন্ধন সাময়িক রাজনীতির চেয়ে অনেক গভীর।”
পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের মুখপাত্র সুমন রায় চৌধুরীও সেই সুরেই বলেন, “দুই বাংলার সম্পর্ক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের। রাজনৈতিক পার্থক্য কখনোই এই মানবিক বন্ধনকে দুর্বল করতে পারে না।”
বর্তমানে নয়াদিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গে একই রাজনৈতিক জোট ক্ষমতায় থাকায় ব্যবসায়ীরা আরও আশাবাদী। তাঁদের বিশ্বাস, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বৈধ কাগজপত্র নিয়ে আসা পর্যটকদের জন্য যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
শুধু নিউ মার্কেট নয়, এই সিদ্ধান্তের সুফল পৌঁছবে মুকুন্দপুর, সল্ট লেক ও নিউ টাউনের হাসপাতাল, পূর্ব ভারতের হোটেল-রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতেও। বাংলাদেশি পর্যটকদের ফেরা মানে শুধু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নয়, এটি যেন দুই প্রতিবেশীর মধ্যে আস্থা ও সৌহার্দ্যের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
ভৌগোলিকভাবে যত দূরেই থাকুক না কেন, কলকাতার ব্যবসায়ীদের বার্তা স্পষ্ট—ভিসার জট কাটিয়ে আবারও খুলে গেছে আত্মীয়তার দোকান। আর এই দোকানে লেনদেন হয় শুধু পণ্যের বিনিময়ে নয়, বরং দুই বাংলার মানুষের হৃদয়ের সম্পর্ক।
আপনার মতামত জানানঃ