বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বহুদিন ধরেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ সেই সংকটকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু এই তালিকা উপস্থাপন করার পর স্পষ্ট হয়ে যায় যে দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরে গভীর অসামঞ্জস্য ও দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরে জমে আছে। এটি কেবল কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি বৃহত্তর আর্থিক সংকটের প্রতিফলন, যা রাষ্ট্রের অর্থনীতি, সুশাসন এবং জনগণের আস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল অঙ্ক কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এক গভীর চাপের প্রতীক। যখন এত বড় অঙ্কের ঋণ ফেরত আসে না, তখন ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায় এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এই তালিকার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, শীর্ষ ২০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টিই একটি নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যাংক খাতে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। এই গোষ্ঠীর কর্ণধার মোহাম্মদ সাইফুল আলম এর নেতৃত্বে বিভিন্ন ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
শুধু এই গোষ্ঠীই নয়, তালিকায় আরও রয়েছে দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হলো সালমান এফ রহমান, যিনি দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও এই খেলাপি তালিকায় স্থান পেয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানের নামও তালিকায় উঠে এসেছে, যা এই সংকটের গভীরতা ও বিস্তৃতির ইঙ্গিত দেয়।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ জনগণের ওপর। ব্যাংকগুলোর মূল পুঁজি আসে আমানতকারীদের কাছ থেকে, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের সঞ্চিত অর্থ থেকেই এই ঋণ দেওয়া হয়। যখন বড় বড় প্রতিষ্ঠান সেই ঋণ পরিশোধ করে না, তখন ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে ঋণপ্রাপ্তিতে জটিলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—কেন এত বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপি হয়ে যাচ্ছে? এর পেছনে রয়েছে নানা কারণ। প্রথমত, ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই না করা। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে নিয়ম না মেনেই ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, তদারকির অভাব। ঋণ দেওয়ার পর তা কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে এবং সময়মতো পরিশোধ হচ্ছে কি না, তা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় না। তৃতীয়ত, আইনি দুর্বলতা। খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য কার্যকর ও দ্রুত ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই সহজেই দায় এড়িয়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। যখন একটি গোষ্ঠী একাধিক ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তখন স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি হয়। এতে করে একই গোষ্ঠী নিজের প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে তা ফেরত না দেওয়ার সুযোগ পায়। এই ধরনের পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট করে দেয়।
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, এই খেলাপি ঋণের বড় অংশই নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। বিশেষ করে কিছু ইসলামী ব্যাংক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর এর প্রভাব বেশি পড়েছে। এসব ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়া হলেও তা ফেরত না আসায় তাদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে বিভিন্ন সময় সহায়তা দিতে হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ থেকেই আসে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ। প্রথমত, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে এবং কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একাধিক প্রতিষ্ঠানের ওপর অযৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ এই সমস্যার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জড়িত থাকে, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ নয়। কিন্তু যদি এই সমস্যার সমাধান না করা হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কারণ এর মাধ্যমে অন্তত সমস্যাটি দৃশ্যমান হয়েছে। তবে শুধু তালিকা প্রকাশ করলেই হবে না; এর সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় এই সংকট আরও গভীর হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। ব্যাংক খাত একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড—এই মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোই ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই এখনই সময় কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করার।
আপনার মতামত জানানঃ