মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বহুবার বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি যেন আরও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য। সাম্প্রতিক সংঘাত, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার পর, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব এসে পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে পেট্রল ও অকটেন সংকটের লক্ষণ দেখা গেছে, কোথাও কোথাও ফিলিং স্টেশনে ‘তেল নেই’ লেখা ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। এই চিত্র শুধু সরবরাহ ঘাটতির নয়, বরং একটি সম্ভাব্য বড় সংকটের পূর্বাভাসও বহন করছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত মূলত আমদানিনির্ভর। বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়, যার একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এই নির্ভরতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য অস্থিরতাও দেশের জ্বালানি সরবরাহে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। এবারের সংঘাতে সেই ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো দেশে পৌঁছাতে পারছে না, ফলে সরবরাহের ধারাবাহিকতা ভেঙে যাচ্ছে। সরকার বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে, কিন্তু সেই প্রচেষ্টাও পুরোপুরি নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।
বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা পূরণে সক্ষম। এটি শুনতে আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি সতর্ক সংকেত। কারণ জ্বালানির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে দুই সপ্তাহের মজুত খুবই সীমিত। ডিজেল দেশের কৃষি, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এই মজুত কমে গেলে তার প্রভাব দ্রুত অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়বে। অকটেন ও পেট্রলের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব বেশি স্বস্তিদায়ক নয়; অকটেনের মজুত প্রায় ৯ দিনের এবং পেট্রলের মজুত প্রায় ১১ দিনের চাহিদা মেটাতে পারবে। অর্থাৎ কয়েকটি জাহাজ সময়মতো না এলেই এই সময়সীমা আরও কমে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে মানুষের আচরণও একটি বড় ভূমিকা রাখছে। বাজারে সম্ভাব্য সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়তেই অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনে মজুত করতে শুরু করেছেন। এতে স্বাভাবিক সরবরাহব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা—এসব দৃশ্য এখন অনেক জায়গায় নিয়মিত হয়ে উঠছে। অর্থাৎ প্রকৃত সংকটের আগে আতঙ্কজনিত চাহিদাই একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে এখনো বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হয়নি এবং সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। কিছু জাহাজ ইতিমধ্যে এসেছে এবং আরও কয়েকটি আসার কথা রয়েছে। এপ্রিল মাসের আমদানিসূচিও চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজনে খোলাবাজার থেকেও তেল কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই আশ্বাসের মধ্যেও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং সরবরাহকারী দেশগুলোর পক্ষ থেকেও সময়মতো সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না।
জ্বালানি আমদানির সূচিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। চলতি মাসে ১৭টি জাহাজ আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৮টি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে। বাকি জাহাজগুলোর বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। এর ফলে প্রায় দেড় লাখ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তারা নির্ধারিত সময় মেনে তেল সরবরাহ করতে পারছে না। অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে; নির্ধারিত চালান আটকে গেছে এবং কিছু চুক্তি বাতিল হয়েছে। ফলে দেশের রিফাইনারিগুলোর উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংরক্ষণ সক্ষমতা। ডিজেলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে তার একটি অংশই ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় আছে। অর্থাৎ মজুত বাড়ানোর সক্ষমতা থাকলেও সরবরাহ না থাকায় সেই সুবিধা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। একইভাবে অকটেন, পেট্রল, ফার্নেস তেল ও জেট ফুয়েলের ক্ষেত্রেও সীমিত মজুত পরিস্থিতি বিদ্যমান। যদিও কেরোসিন ও মেরিন ফুয়েলের ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি দিনের মজুত রয়েছে, কিন্তু এগুলো সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদার তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ।
এই সংকটের প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব পণ্যদ্রব্যের দামে পড়ে। কৃষি খাতে সেচ ব্যয় বাড়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়—সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অর্থাৎ একটি জ্বালানি সংকট পুরো অর্থনীতিকে একটি চেইন রিঅ্যাকশনের মধ্যে ফেলে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা বলছেন, এখনই যদি যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যেতে পারে। প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে জ্বালানির সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মজুত বা কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতা বন্ধে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কারণ অনেক সময় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই ধরনের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিরতা বাড়ায়।
সরকার ইতিমধ্যে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। ভারত থেকে পাইপলাইনে কিছু তেল আনা হয়েছে এবং আরও আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সৌদি আরবের অন্য একটি বন্দর থেকে অতিরিক্ত খরচে তেল আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ সাময়িক সমাধান দিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্য আনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
এপ্রিল ও মে মাসের জন্য প্রাথমিক আমদানি পরিকল্পনা করা হলেও সেটিও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। নির্ধারিত জাহাজগুলোর অনেকগুলোর ক্ষেত্রেই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো চূড়ান্ত মত দেয়নি। ফলে ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা শুধু সরকারের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলছে। মানুষ জানে না আগামী দিনে জ্বালানির দাম বাড়বে কি না, সরবরাহ ঠিক থাকবে কি না—এই অনিশ্চয়তাই বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে।
ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাপ বাড়ার পেছনে আরেকটি কারণ হলো সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। ডিপো থেকে নির্ধারিত পরিমাণ তেল এলেও হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় তা পর্যাপ্ত হচ্ছে না। আবার ব্যাংকিং জটিলতার কারণেও অনেক ফিলিং স্টেশন সময়মতো তেল তুলতে পারছে না। এসব ছোট ছোট সমস্যাই মিলিত হয়ে বড় ধরনের সংকটের রূপ নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি এখন একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আপাতদৃষ্টিতে বড় কোনো সংকট না থাকলেও ভেতরে ভেতরে চাপ জমে উঠছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, সীমিত মজুত এবং মানুষের আতঙ্কজনিত আচরণ—এই চারটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে যেকোনো একটি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত সংকটময় হয়ে উঠতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি হলো সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং জনসাধারণকে সচেতন রাখা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তাই সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব হলো বাস্তব চিত্র তুলে ধরা এবং মানুষকে অপ্রয়োজনীয় মজুত থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথ খুঁজতে হবে। কারণ বিশ্ব রাজনীতির এই অনিশ্চিত বাস্তবতায় শুধুমাত্র আমদানিনির্ভর হয়ে থাকা একটি বড় ঝুঁকি, যা বারবার বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে সংকটে ফেলতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ