একটু ভালো থাকার স্বপ্ন, পরিবারের অভাব ঘোচানোর প্রত্যাশা আর বিদেশে গিয়ে উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা—এই তিনটি বিষয়কে পুঁজি করে বাংলাদেশের একদল তরুণকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাদের বলা হয়েছিল, বিদেশে নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ করতে হবে, নিয়মিত বেতন পাওয়া যাবে, পরিবারের কাছে টাকা পাঠানো যাবে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে ইউক্রেনের ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে। হাতে কাজের সরঞ্জামের বদলে তুলে দেওয়া হয়েছে অস্ত্র, কর্মস্থলের বদলে যেতে হয়েছে সম্মুখসারিতে। আর দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য বিদেশযাত্রার সেই স্বপ্ন পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে।
সম্প্রতি ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দেশে ফিরে আসা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ২১ বছর বয়সী রাজন হোসেনের অভিজ্ঞতা এই ভয়াবহ বাস্তবতার একটি উদাহরণ। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির আশ্বাস দিয়ে গত মে মাসে বাংলাদেশের একটি ট্রাভেল এজেন্সি তাঁকে রাশিয়ায় পাঠায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁর পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর তাঁকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিদেশে গিয়ে কাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর যে স্বপ্ন নিয়ে রাজন দেশ ছেড়েছিলেন, তা মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। তিনি জানতেন না, যে দেশে যাচ্ছেন সেখানে তাঁর জন্য কী অপেক্ষা করছে। চাকরির চুক্তি, কর্মস্থলের নিরাপত্তা কিংবা নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও তাঁর ছিল না বলে জানিয়েছেন তিনি। একপর্যায়ে তাঁকে রুশ সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে অস্ত্র চালানোসহ যুদ্ধসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁকে সরাসরি পাঠানো হয় ইউক্রেনের সম্মুখসারির যুদ্ধক্ষেত্রে।
রাজনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে আরও ২৯ জন বাংলাদেশিকে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর প্রথম দিনেই ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় তাঁদের দলের ১৭ জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ওই ৩০ জনের মধ্যে ২০ জন নিহত হয়েছেন বলে বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ ইউনিটের তদন্তে তথ্য উঠে এসেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা রাজনের জীবনকে এমনভাবে বদলে দেয়, যার পরিণতি তাঁকে সারা জীবন বহন করতে হতে পারে। ইউক্রেনে পৌঁছানোর মাত্র দুই দিনের মাথায় ড্রোন হামলায় তাঁর কোমর ও পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর দাবি, আঘাতের পর কোমরের নিচের পুরো অংশ অবশ হয়ে গিয়েছিল। চলাফেরা করার ক্ষমতা হারিয়ে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে ছিলেন। সঙ্গে থাকা ওয়াকিটকির মাধ্যমে রুশ সেনাদের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও উদ্ধার করতে কেউ আসেনি বলে জানান তিনি।
একসময় বুঝতে পারেন, এভাবে পড়ে থাকলে হয়তো আর কোনো দিন বাড়ি ফেরা হবে না। তখন হাত ও বুকের ওপর ভর দিয়ে অবশ দুই পা টেনে সামনে এগোতে শুরু করেন। এভাবে প্রায় চার দিন ধরে চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে একটি রুশ সেনা ক্যাম্পে পৌঁছান তিনি। এই পুরো সময় খাবার তো দূরের কথা, এক ফোঁটা পানিও পাননি বলে জানিয়েছেন রাজন।
একজন আহত মানুষের জন্য এমন পরিস্থিতি কতটা অসহনীয়, তা কল্পনা করাও কঠিন। যে তরুণ নিজের পরিবারের জন্য উপার্জন করতে বিদেশে গিয়েছিলেন, তাঁকেই জীবন বাঁচাতে যুদ্ধক্ষেত্রে হাত ও বুকের ওপর ভর দিয়ে এগোতে হয়েছে। চারপাশে গোলাগুলি, ড্রোন হামলা আর মৃত্যুর আশঙ্কার মধ্যে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অনিশ্চিত। তবু তিনি বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
কিন্তু সেনা ক্যাম্পে পৌঁছানোর পরও তাঁর দুর্ভোগ শেষ হয়নি। রাজন ভেবেছিলেন, সেখানে পৌঁছালে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হবে। অথচ তাঁর অভিযোগ, প্রথমেই একজন কমান্ডার জানতে চান, তাঁর অস্ত্র কোথায়। হামলার স্থানে অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম ফেলে আসার কথা জানালে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে একজন সেনা তাঁকে কমান্ডারের কাছ থেকে সরিয়ে ক্যাম্পের অস্থায়ী হাসপাতালে নিয়ে যান।
চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করার সময় রাজনের মনে আরও গভীর সন্দেহ তৈরি হয়। তিনি বারবার অনুরোধ করছিলেন, যেন তাঁকে উন্নত কোনো হাসপাতালে নেওয়া হয়। তখন সেখানে থাকা একজন তাঁকে জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁদের দলের আরেক বাংলাদেশি আহত অবস্থায় রয়েছে এবং সে শিগগিরই মারা যাবে। এরপর তাঁকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হবে বলে জানানো হয়। ওই কথার অর্থ বুঝতে পেরে রাজনের মনে হয়, তাঁদের জীবনকে কোনোভাবেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
রাজনের অভিযোগ, ইউক্রেনীয় বাহিনী কোন কোন অবস্থান থেকে হামলা চালাচ্ছে, তা শনাক্ত করার জন্য তাঁদের সামনে রাখা হয়েছিল। তাঁদের ওপর ড্রোন হামলা হলে রুশ বাহিনী হামলার উৎস শনাক্ত করে সেই অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করত এবং পরে নিজেদের সৈন্য পাঠাত। রাজনের ভাষায়, তাঁরা কার্যত প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন।
এই অভিযোগের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, এটি শুধু চাকরির প্রলোভনে বিদেশে গিয়ে প্রতারণার ঘটনা নয়; বরং মানুষের জীবনকে যুদ্ধের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করার অভিযোগও। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনের বর্ণনা এবং বাংলাদেশের পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এমন অভিযোগ উঠে এলেও রুশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা চূড়ান্ত প্রমাণের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে তদন্তসাপেক্ষ বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রাজন শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য ইউক্রেন থেকে রাশিয়ায় স্থানান্তরিত হন। সেখানে কয়েক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকার পর মস্কোয় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। হাসপাতালের একজন চিকিৎসক তাঁকে সহযোগিতা করেন বলে জানান তিনি। পরে দূতাবাসের সহায়তায় আগস্ট মাসের শেষ দিকে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু দেশে ফিরে আসতে পারলেও তাঁর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ কতটা ফিরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। শারীরিক ক্ষতি, মানসিক আঘাত এবং ভয়াবহ যুদ্ধের স্মৃতি তাঁকে দীর্ঘদিন তাড়িয়ে বেড়াতে পারে।
রাজনের ঘটনা সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি ও তাঁর পরিবার। এরপর তদন্ত শুরু করে পুলিশের বিশেষ ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। তদন্তে জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের পাশাপাশি আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের আরও দুটি এজেন্সির সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, এসব এজেন্সি কয়েক মাসের মধ্যে বিদেশে চাকরির কথা বলে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ৩০ জনকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
এই অঙ্কটি শুধু অর্থের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু পরিবারের সঞ্চয়, ঋণ এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক সংগ্রাম। কারও কাছে আট-নয় লাখ টাকা মানে জীবনের সমস্ত সঞ্চয়। কারও কাছে তা জমি বন্ধক রেখে সংগ্রহ করা অর্থ। আবার কেউ গরু-ছাগল বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে বিদেশযাত্রার খরচ জোগাড় করেন। বিদেশে কাজ করে টাকা পাঠানোর আশায় পরিবারগুলো এই ঝুঁকি নেয়। কিন্তু চাকরির পরিবর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হলে সেই বিনিয়োগের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে পরিবারের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিও।
পুলিশের তদন্তে এই চক্রের সঙ্গে দুজন বিদেশি নাগরিকের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও উঠে এসেছে। তাঁদের একজন রাশিয়ার নাগরিক, যাঁর নাম ইগর বলে জানিয়েছে পুলিশ। অন্যজন কিরগিজস্তানের নাগরিক জুলিয়া নামে এক নারী। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার কথা বলে বাংলাদেশিদের সেখানে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় এই দুই ব্যক্তির ভূমিকা ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিদেশি এই দুই নাগরিককে তখনও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এদিকে বাংলাদেশি এজেন্সিগুলোর মূল সমন্বয়কারী হিসেবে চিহ্নিত জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তের ফলাফল এবং আদালতে প্রমাণের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারিত হবে।
এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন দেশ থেকে বিদেশি নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে যোগ দেওয়ার খবর এসেছে। কেউ অর্থের বিনিময়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, কেউ সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। কারণ, কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় জেনে-বুঝে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন, আর কাউকে প্রতারণা করে বা চাপ প্রয়োগ করে যুদ্ধে পাঠানো হয়, তাহলে এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
চাকরির কথা বলে বিদেশে নিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নেওয়া, এরপর সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ সত্য হলে তা ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘনের প্রশ্ন তৈরি করে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া মানুষের হাতে প্রয়োজনীয় তথ্য, চুক্তিপত্র ও যোগাযোগের স্বাধীনতা থাকা জরুরি। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বিদেশে পৌঁছে যদি নিজের পরিচয়পত্র হারান, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারেন এবং নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামরিক কার্যক্রমে যুক্ত হন, তাহলে তাঁর পক্ষে সাহায্য চাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত তরুণদের অনেকেই নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তান বলে জানা যাচ্ছে। তাঁদের পরিবারের আশা ছিল, বিদেশে গিয়ে কাজ করে তাঁরা আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠবেন। সেই আশায় কেউ জমি বন্ধক রেখেছেন, কেউ গরু-ছাগল বিক্রি করেছেন, কেউ ব্যাংক বা অন্য উৎস থেকে ঋণ নিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন, কিছুদিন পর ছেলে টাকা পাঠাতে শুরু করবেন। ঋণ শোধ হবে, বন্ধক রাখা জমি ফিরে আসবে, সংসারে স্বচ্ছলতা আসবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক পরিবারকে এখন ছেলের মৃত্যুসংবাদ, নিখোঁজ হওয়ার আশঙ্কা কিংবা দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহ আল মামুনের পরিবারের অভিজ্ঞতা সেই বেদনাকে আরও স্পষ্ট করে। ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য তাঁর বাবা আব্দুল মাজিদ গরু-ছাগল বিক্রি করেছেন, জমি বন্ধক রেখেছেন এবং ঋণ নিয়েছেন। তাঁর আশা ছিল, ছেলে উপার্জন করে টাকা পাঠাবেন। সেই অর্থ দিয়ে ঋণ শোধ করবেন, বন্ধক রাখা জমি ছাড়াবেন এবং আবার গরু-ছাগল কিনে জীবিকা গুছিয়ে নেবেন। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, ছেলেকে যুদ্ধে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
এখন তাঁর চাওয়া আর অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নয়, ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা। সন্তানকে জীবিত অবস্থায় ফিরে পাওয়ার আশা শেষ হয়ে গেলে একজন বাবা অন্তত নিজের হাতে তাঁকে দাফন করতে চান। এই চাওয়ার মধ্যে যে অসহায়ত্ব রয়েছে, তা কোনো সরকারি আশ্বাস বা আর্থিক হিসাব দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাট থেকে একসঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া চারজনের মধ্যে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাঁদের একজন আল আমিন ইসলাম এখনও দেশে ফেরার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন বলে তাঁর পরিবার জানিয়েছে। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় তাঁর পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনযাপনও ব্যাহত হচ্ছে। তাঁরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করেও কার্যকর সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এর আগে বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনায় গত এক বছরে তিন ডজনেরও বেশি আবেদন পাওয়া গেছে। এসব আবেদনের ভিত্তিতে রুশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছয়জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছিল বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। বাকিদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছিল। তবে আগে শনাক্ত হওয়া ওই ছয়জনের মরদেহও তখন পর্যন্ত দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন নতুন করে ২০ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য সামনে আসায় তাঁদের পরিবারের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। নিহতদের মরদেহ কোথায় রয়েছে, সেগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হবে কি না, এবং কবে দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত। পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ যেমন অসহনীয়, তেমনি তাঁর মরদেহের অবস্থান না জানা এবং শেষবারের মতো দেখতে না পারার কষ্টও গভীর।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি জরুরি দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা করে মানুষকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে। শুধু মধ্যস্থতাকারীদের গ্রেপ্তার করলেই চলবে না; কারা অর্থ সংগ্রহ করেছে, কারা বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে, কোন পথে তাঁদের নেওয়া হয়েছে এবং বিদেশে পৌঁছানোর পর কীভাবে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, রাশিয়ায় অবস্থানরত এবং এখনও জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে—এমন বাংলাদেশিদের শনাক্ত করে তাঁদের নিরাপদে দেশে ফেরানোর জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ জরুরি। তৃতীয়ত, নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশ ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ঠেকাতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিদেশে যাওয়ার আগে নিয়োগদাতার পরিচয়, চাকরির চুক্তি, ভিসার ধরন, কাজের প্রকৃতি এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করা জরুরি। অস্বাভাবিক উচ্চ বেতনের প্রতিশ্রুতি, অস্পষ্ট কাজের বিবরণ, তাড়াহুড়া করে অর্থ জমা দেওয়ার চাপ কিংবা বিদেশে পৌঁছানোর পর অন্য কাজ করতে হবে—এমন ইঙ্গিতকে সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা উচিত। তবে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের দায়ী না করে তাঁদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হতে হবে প্রধান লক্ষ্য।
বিদেশে কাজের স্বপ্ন বাংলাদেশের বহু পরিবারের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই স্বপ্নকে অপরাধী চক্রের হাতে জিম্মি হতে দেওয়া যায় না। একজন তরুণের বিদেশযাত্রা মানে শুধু তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাবা-মায়ের আশা, ভাইবোনের প্রয়োজন, ঋণগ্রস্ত পরিবারের মুক্তির প্রত্যাশা এবং একটি সংসারের নতুন করে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা। সেই স্বপ্নকে কাজে লাগিয়ে কাউকে যদি অজান্তে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে তা কেবল ব্যক্তিগত প্রতারণা নয়, মানবিক বিপর্যয়ও।
রাজন হোসেন বেঁচে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। অন্যদিকে, যেসব পরিবারের সন্তানরা আর ফিরবেন না, তাঁদের কাছে এখন অপেক্ষার অর্থ শুধু একটি খবর নয়—প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পাওয়ার শেষ আশাটুকুও। যুদ্ধের ময়দানে তাঁদের কী ঘটেছিল, কে তাঁদের সেখানে পাঠিয়েছিল এবং কারা এই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ছিল, তার নির্ভরযোগ্য উত্তর প্রয়োজন।
চাকরির আশায় বিদেশে যাওয়া কোনো তরুণের পরিণতি যেন আর যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর অপেক্ষা না হয়। বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন পূরণের পথ হতে হবে নিরাপদ, বৈধ ও মর্যাদাপূর্ণ। আর যে পরিবারগুলো ইতিমধ্যে তাঁদের সন্তানদের হারিয়েছে বা হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে, তাদের জন্য তদন্ত, জবাবদিহি, মরদেহ ফিরিয়ে আনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আপনার মতামত জানানঃ