
অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের পাওনা পরিশোধে সরকার একযোগে ১ লাখ ২৩ হাজার ৩২০টি আবেদন নিষ্পত্তির কার্যক্রম শুরু করেছে। এর জন্য বরাদ্দ হয়েছে ২ হাজার ৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। চার বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা প্রবীণ শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য এটি অবশ্যই স্বস্তির খবর।
কিন্তু ঘোষণাটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—সরকার হঠাৎ এত অর্থ পাচ্ছে কোথায়?
একই সময়ে দুর্বল ব্যাংকে মূলধন দেওয়া হচ্ছে, শিল্প খাতে বড় পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে, জ্বালানি আমদানিতে ভর্তুকি ও বাড়তি ব্যয় হচ্ছে এবং সরকারি বাজেটও সম্প্রসারিত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর একটি। কর আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে, ব্যবসা ও বিনিয়োগও প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না।
রাজস্ব আয় যখন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, তখন সরকারের সামনে সাধারণত তিনটি পথ থাকে—দেশি-বিদেশি ঋণ নেওয়া, আগের ব্যয় কমানো অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় নতুন টাকা সৃষ্টি করা।
বাংলাদেশ কি ক্রমে তৃতীয় পথটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো: সরকার প্রতিটি ব্যয় সরাসরি টাকা ছাপিয়ে মেটাচ্ছে—এমন প্রমাণ নেই। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারি ঋণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থে পুনঃঅর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা কেনার বিপরীতে বাজারে টাকা ছাড়া এবং তফসিলি ব্যাংক থেকে বিপুল সরকারি ঋণ—সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতিতে এমন চাপ তৈরি হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত নতুন মুদ্রা সৃষ্টি ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
‘টাকা ছাপানো’ বলতে আসলে কী বোঝায়?
টাকা ছাপানোর কথা শুনলে কাগজের নোট তৈরির যন্ত্রের কথা মনে হয়। আধুনিক অর্থনীতিতে অধিকাংশ নতুন টাকা এভাবে তৈরি হয় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল হিসাবের মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন রিজার্ভ বা তারল্য যোগ করতে পারে।
সরকার যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেয় কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন অর্থ সৃষ্টি করে সরকারি বন্ড কেনে, তখন সরকারের হিসাবে টাকা জমা হয়। সরকার সেই টাকা বেতন, ভাতা, ভর্তুকি, প্রকল্প বা অন্য ব্যয়ে ব্যবহার করে। অর্থনীতিতে অতিরিক্ত টাকা প্রবেশ করে, যদিও সমপরিমাণ নতুন পণ্য বা সেবা তৈরি না-ও হতে পারে।
এটিই বাজেট ঘাটতির মুদ্রায়ন বা প্রচলিত অর্থে ‘টাকা ছাপিয়ে সরকারি ব্যয় চালানো’।
তবে সরকার তফসিলি ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেই তা সরাসরি টাকা ছাপানো নয়। ব্যাংকগুলো সাধারণত আমানতকারীদের অর্থ দিয়ে ট্রেজারি বিল বা বন্ড কেনে। এতে বিদ্যমান অর্থ সরকার ব্যবহার করে, নতুন ভিত্তিমুদ্রা তৈরি হয় না।
কিন্তু এই পার্থক্য সব সময় স্থায়ী থাকে না। সরকারি ঋণের চাপে ব্যাংকের তারল্য কমে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন, রেপো বা বিশেষ তারল্য সহায়তার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে নতুন অর্থ দিতে পারে। তখন পরোক্ষভাবে সরকারি ঋণও মুদ্রায়িত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সরকার কত টাকা ঋণ নিয়েছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই–ডিসেম্বর ২০২৬ মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১৪ জুন পর্যন্ত সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নিট ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অথচ পুরো অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৩ হাজার ৭১১ কোটি টাকা বেশি ব্যাংকঋণ নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে:
- তফসিলি ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪০২ কোটি টাকা;
- বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৮ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সরকারি সিকিউরিটিজের বাধ্যতামূলক ক্রয় বা ‘ডিভলভমেন্ট’ বন্ধ করায় বর্তমানে সরকারের ঋণ প্রধানত তফসিলি ব্যাংকনির্ভর। তাই সরকারের পুরো ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ঋণকে ছাপানো টাকা বলা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতি
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ৮ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা সরাসরি মুদ্রানীতির প্রশ্ন তৈরি করে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে দেওয়া অন্য তারল্য সহায়তা সরকারকে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়িয়ে থাকলে তার প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
রাজস্ব ঘাটতির কারণে কেন ঋণ বাড়ছে?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের প্রধান দুর্বলতা শুধু ব্যয়ের পরিমাণ নয়; আয় সংগ্রহের অক্ষমতা।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘোষিত বাজেট ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। এই ঘাটতি দেশি ও বিদেশি ঋণ এবং অনুদান দিয়ে মেটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। Reuters
নতুন বাজেটে অভ্যন্তরীণ নিট ঋণের লক্ষ্য ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদেশি নিট অর্থায়নের লক্ষ্য ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। The Daily Star
কাগজে ব্যাংকঋণ কিছুটা কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী। ফিচ রেটিংসের হিসাবে, সরকার রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৮ শতাংশ থেকে ১০.২ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। এর জন্য এক বছরে নামমাত্র রাজস্ব প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়াতে হবে। Fitch Ratings
এই লক্ষ্য অর্জিত না হলে তিনটি সম্ভাবনা তৈরি হবে—ব্যয় কমাতে হবে, ঘাটতি বাড়াতে হবে অথবা আরও ঋণ নিতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় উন্নয়ন প্রকল্প, ভর্তুকি, সরকারি বেতন কিংবা সামাজিক সুবিধা হঠাৎ কমানো কঠিন। ফলে চাপটি শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর যায়।
শিক্ষক-অবসর সুবিধার টাকা কোথা থেকে?
অবসর সুবিধার বর্তমান কর্মসূচিতে ৭০ হাজার ১১৯টি আবেদন নিষ্পত্তির জন্য অবসর সুবিধা বোর্ডকে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। কল্যাণ ট্রাস্টের ৫৩ হাজার ২০১টি আবেদনের জন্য দেওয়া হয়েছে ৪৮৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
তবে ১ লাখ ২৩ হাজার ৩২০টি আবেদন মানে সমসংখ্যক আলাদা মানুষ নয়। একই ব্যক্তি অবসর সুবিধা ও কল্যাণ—দুই খাতেই আবেদন করে থাকতে পারেন।
এই দুই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন থেকে যথাক্রমে ৬ ও ৪ শতাংশ চাঁদা কেটে আসছে। ফলে পরিশোধিত অর্থের একটি অংশ সুবিধাভোগীদের নিজেদের জমা অর্থ ও তার বিনিয়োগ-আয়। এর সঙ্গে বিশেষ সরকারি বরাদ্দ ও বন্ডভিত্তিক অর্থসংস্থানও যুক্ত হয়েছে।
সমস্যা শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য টাকা দেওয়া নয়। সমস্যাটি হলো, ২ হাজার ৩৫ কোটি টাকার মধ্যে কত অংশ দুই সংস্থার পুরোনো তহবিল, কত অংশ নতুন বাজেট বরাদ্দ এবং কোনো বিশেষ বন্ডের অর্থ কোথা থেকে এসেছে—এই উৎসভিত্তিক হিসাব জনসমক্ষে পরিষ্কার নয়।
বন্ডটি যদি তফসিলি ব্যাংক কিনে থাকে, এটি সরকারি ঋণ। আর যদি বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি কিনে থাকে বা কেনার জন্য নতুন তারল্য দিয়ে থাকে, তবে অর্থের অন্তত একটি অংশ মুদ্রায়িত হয়েছে বলে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থের প্যাকেজ
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করতে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার উদ্দীপনা ও পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
মুদ্রানীতি বিবৃতি অনুযায়ী:
- ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন ও প্রাক্-অর্থায়ন সুবিধা;
- ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব উৎস;
- বন্ধ বা সংকটে থাকা শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা;
- গ্রামীণ উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ১০ হাজার কোটি টাকা;
- ক্ষুদ্র ব্যবসায় ৫ হাজার কোটি টাকা;
- অপ্রচলিত রপ্তানি খাতে ৩ হাজার কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব উৎসের অর্থ মানেই সব সময় নিট নতুন মুদ্রা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক অন্য কোনো ব্যবস্থায় বাজার থেকে সমপরিমাণ তারল্য তুলে নিলে সামগ্রিক মুদ্রা সরবরাহ নাও বাড়তে পারে।
কিন্তু কোথা থেকে অর্থ সৃষ্টি হলো এবং এর বিপরীতে কীভাবে তারল্য প্রত্যাহার করা হবে—তা পরিষ্কার না থাকলে এই কর্মসূচি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষত উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কাজ হওয়া উচিত অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা। একই প্রতিষ্ঠান একদিকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রেখে অর্থনীতিকে সংকুচিত করতে চাইছে, অন্যদিকে নিজস্ব উৎসে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণসুবিধা দিচ্ছে—এতে মুদ্রানীতির সংকেত পরস্পরবিরোধী হয়ে ওঠে।
রিজার্ভ মানি কেন বেড়েছে?
২০২৫–২৬ অর্থবছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ মানি বা ভিত্তিমুদ্রার প্রবৃদ্ধি আনুমানিক ১২.১ শতাংশ হবে বলে জানিয়েছিল। পূর্ববর্তী লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ শতাংশ।
এই অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ সরকারকে সরাসরি ঋণ নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজার থেকে নিট ৬.৪৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছিল। ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনার সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিময়ে টাকা দেয়, ফলে বাজারে তারল্য বাড়ে।
রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য ডলার কেনা প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু তার বিপরীতে বাজারে ছাড়া টাকা যদি ট্রেজারি বিল, বাংলাদেশ ব্যাংক বিল বা অন্য ব্যবস্থায় তুলে নেওয়া না হয়, তবে সেটিও মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থাৎ নতুন টাকা শুধু সরকারি বন্ড কেনার মাধ্যমেই আসে না। বৈদেশিক মুদ্রা কেনা, পুনঃঅর্থায়ন এবং বিশেষ তারল্য সুবিধার মাধ্যমেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালান্সশিট সম্প্রসারিত হতে পারে।
কেন মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বড়?
২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৪২ শতাংশ—১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব পূর্বাভাসে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে তা ৮.৯ এবং ২০২৭ সালের জুনে ৮.৬ শতাংশ থাকতে পারে।
অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই সরকারের চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা করছে। বাজার অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যাশা আরও বিস্তৃত—২০২৭ সালের জুনে মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক
উৎপাদন ও পণ্যের সরবরাহ না বাড়িয়ে অর্থের পরিমাণ বাড়লে একই পণ্যের পেছনে বেশি টাকা ছুটবে। দাম বাড়বে। নতুন অর্থ প্রথমে যে খাত বা ব্যক্তির কাছে যায়, তারা পুরোনো দামে পণ্য কিনতে পারে; পরে যখন দাম বাড়ে, নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
এ কারণে মূল্যস্ফীতিকে কখনো কখনো ‘অদৃশ্য কর’ বলা হয়। সরকার সংসদে নতুন কর অনুমোদন না করেও মানুষের নগদ অর্থ ও সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কমিয়ে দেয়।
এক লাখ টাকা ব্যাংকে থাকলেও বছরে ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হলে সেই অর্থের ক্রয়ক্ষমতা প্রায় ৯ হাজার টাকা কমে যেতে পারে—যদি আমানতের কর-পরবর্তী সুদ সমান না হয়।
তফসিলি ব্যাংক থেকে ঋণও কেন ক্ষতিকর হতে পারে?
সরকার তফসিলি ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে নতুন ভিত্তিমুদ্রা সৃষ্টি নাও হতে পারে। কিন্তু এর অন্য ক্ষতি আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শেষে সরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি আনুমানিক ২৫.৯ শতাংশ, অথচ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি মাত্র ৫.৫ শতাংশ।
ব্যাংকগুলোর সামনে দুটি বিকল্প থাকে—ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়া অথবা তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড কেনা। সরকার যখন বেশি ঋণ নেয়, ব্যাংকগুলো নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিতে অর্থ রাখতে আগ্রহী হয়।
ফলে শিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও নতুন উদ্যোক্তার জন্য ঋণ কমে যায়। এটিই সরকারি ঋণের ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব।
দীর্ঘমেয়াদে এতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমে। সরকার আজ ব্যয় করার জন্য যে অর্থ নিচ্ছে, তা ভবিষ্যতের উৎপাদনক্ষমতা তৈরির বদলে যদি চলতি ব্যয় বা অদক্ষ প্রতিষ্ঠানে যায়, তবে ঋণের বিপরীতে অর্থনৈতিক আয়ও তৈরি হবে না।
টাকার বিনিময়মূল্যেও চাপ পড়তে পারে
অতিরিক্ত টাকা বাজারে এলে আমদানি ও ডলারের চাহিদা বাড়তে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ সমান হারে না বাড়লে টাকার দাম কমবে।
টাকার অবমূল্যায়নে জ্বালানি, খাদ্য, ওষুধ, সার ও শিল্পের কাঁচামাল ব্যয়বহুল হয়। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এটি নতুন মূল্যস্ফীতি তৈরি করে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও সুদ বাড়াতে বাধ্য হতে পারে।
এভাবে একটি চক্র তৈরি হয়:
সরকারি ঘাটতি থেকে ঋণ, ঋণ বা তারল্য থেকে অর্থ সরবরাহ, অর্থ সরবরাহ থেকে মূল্যস্ফীতি, মূল্যস্ফীতি থেকে টাকার অবমূল্যায়ন এবং অবমূল্যায়ন থেকে আবার আমদানি ব্যয় ও সরকারি ভর্তুকি বৃদ্ধি।
‘ফিসক্যাল ডমিন্যান্স’-এর ঝুঁকি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্ব মূল্যস্থিতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। কিন্তু সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয়ের চাপ এত বেশি হলে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়মিত ঋণ, পুনঃঅর্থায়ন বা বিশেষ তারল্য দিতে হয়, তখন মুদ্রানীতি বাজেটের অধীন হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিতে একে ‘ফিসক্যাল ডমিন্যান্স’ বলা হয়।
এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদ বাড়ালেও সরকারের ঋণ ব্যয় বেড়ে যায়। আবার সুদ কম রাখলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। সরকারকে অর্থায়ন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—দুটি বিপরীত লক্ষ্য সামলাতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ এখনো জিম্বাবুয়ে বা ভেনেজুয়েলার মতো অনিয়ন্ত্রিত মুদ্রা ছাপানোর অর্থনীতিতে পৌঁছায়নি। সরকারের অধিকাংশ ব্যাংকঋণ এখনো তফসিলি ব্যাংক থেকে আসছে। বৈদেশিক সহায়তা ও জাতীয় সঞ্চয়পত্রও অর্থসংস্থানের অংশ।
তবু সতর্কসংকেতগুলো পরিষ্কার—রাজস্ব আদায় দুর্বল, সরকারি ব্যাংকঋণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে, সরকারি খাতের ঋণ বেসরকারি খাতের তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়ছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বড় ঋণ ও তারল্য কর্মসূচিও পরিচালনা করছে।
কী ধরনের স্বচ্ছতা প্রয়োজন?
প্রথমত, প্রতিটি বিশেষ থোক বরাদ্দের উৎস প্রকাশ করতে হবে। বাজেট পুনর্বণ্টন, পুরোনো তহবিল, তফসিলি ব্যাংকের বন্ড নাকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ—জনগণকে তা জানাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে সরকারকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থায়নের নিয়মিত হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির বিপরীতে কত টাকা নির্বীজন বা বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, তার তথ্য দিতে হবে।
চতুর্থত, বাজেটের বাইরে বিশেষ বন্ড, ব্যাংক পুনঃমূলধন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের গ্যারান্টিযুক্ত ঋণকে সামগ্রিক সরকারি দায়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
পঞ্চমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ ব্যবহারে একটি স্পষ্ট আইনি সীমা থাকা প্রয়োজন। জরুরি অবস্থার ব্যতিক্রম থাকলেও তা সময়বদ্ধ, স্বচ্ছ এবং সংসদীয় পর্যালোচনার আওতায় থাকা উচিত।
সরকারি ব্যয়ের সবটাই অপ্রয়োজনীয় নয়। শিক্ষক-কর্মচারীর পাওনা, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা বা ব্যাংক পুনর্গঠন—অনেক ব্যয়ের যৌক্তিকতা রয়েছে। কিন্তু যৌক্তিক ব্যয়ও অস্বচ্ছ বা মূল্যস্ফীতিমূলক অর্থায়নে পরিচালিত হলে শেষ পর্যন্ত তার মূল্য সুবিধাভোগীসহ পুরো জনগণকে দিতে হয়।
প্রশ্নটি তাই সরকার টাকা খরচ করবে কি না—তা নয়। প্রশ্ন হলো, কোন অর্থে, কোন দায় তৈরি করে এবং ভবিষ্যতে কে সেই দায় পরিশোধ করবে।
আজকের জনপ্রিয় ব্যয়ের মূল্য যদি আগামীকাল বেশি বাজারদর, দুর্বল টাকা, উচ্চ সুদ ও ক্ষয়িষ্ণু সঞ্চয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে দিতে হয়, তবে সেটি বিনা মূল্যের রাষ্ট্রীয় সহায়তা নয়। সেটি ভবিষ্যতের আয় থেকে নেওয়া অদৃশ্য ঋণ।
আপনার মতামত জানানঃ