বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম কোর্ট। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন, নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক বিরোধ, ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলাসহ বহু বিষয়ে এখানেই নির্ধারিত হয় রাষ্ট্র ও নাগরিকের অধিকার-দায়িত্বের সীমা। ফলে সর্বোচ্চ আদালতের কার্যক্রম কতটা উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও জনসাধারণের পর্যবেক্ষণের আওতায় রয়েছে—এটি কেবল সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকারের প্রশ্ন নয়; এটি বিচার বিভাগের প্রতি জনআস্থার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
কিন্তু ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগসহ হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন বিচারকক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে যে বিধিনিষেধ তৈরি হয়েছে, তা এখন দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। সাংবাদিক সংগঠনগুলো বলছে, সরাসরি এজলাসে বসে শুনানি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের সুযোগ না থাকায় আদালতের সংবাদ পরিবেশনে সমস্যা হচ্ছে।
ছয় মাস পেরিয়েও কেন প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ
বিষয়টি শুরু হওয়ার পর সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে একাধিকবার আলোচনা, চিঠি, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে। মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট বিটের সাংবাদিকেরা কালো কাপড় মুখে বেঁধে প্রতিবাদ করেন এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে আদালতের সংবাদ বর্জনের হুঁশিয়ারিও দেন।
জুনেও সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার পুনর্বহাল হয়নি। তখনও আপিল বিভাগের দরজা সাংবাদিকদের জন্য পাঁচ মাসের বেশি সময় বন্ধ থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
সবশেষ ১২ আগস্ট ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের উদ্যোগে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। সেখানে সাংবাদিক নেতারা প্রধান বিচারপতির কাছে অবিলম্বে এজলাসে প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
অর্থাৎ এটি আর স্বল্পমেয়াদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ কতটা আছে—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
‘ওপেন জাস্টিস’ কেন গুরুত্বপূর্ণ
আদালত কেবল বিচারক, আইনজীবী ও মামলার পক্ষগুলোর জন্য একটি প্রতিষ্ঠান নয়। বিচারব্যবস্থার বৈধতা অনেকাংশেই নির্ভর করে জনগণ যেন জানতে পারে—বিচার কীভাবে হচ্ছে, যুক্তি কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে এবং আদালত কীভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে ফৌজদারি মামলার বিচার জনসমক্ষে হওয়ার নীতি স্বীকৃত। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়েও ‘public trial’ বা উন্মুক্ত বিচারের সঙ্গে জনগণের আদালতের কার্যক্রমে প্রবেশাধিকারের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং এটিকে ‘open justice’-এর অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে সাংবাদিকদের ভূমিকা বিশেষ। আদালতের কক্ষে উপস্থিত থাকা সাধারণ মানুষের সংখ্যা সীমিত হতে পারে; কিন্তু সাংবাদিকরা আদালতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে সেই তথ্য বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেন। ফলে সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশাধিকার কার্যত জনগণের আদালত-সম্পর্কিত তথ্য পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
এটি কি সরাসরি ‘সাংবাদিকতার স্বাধীনতা’ সংকুচিত করা?
সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে একই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, মানহানি, আদালত অবমাননা বা অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধের সুযোগও রাখা হয়েছে।
তাই আদালতকক্ষে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, আসনসংকট বা নির্দিষ্ট বিচারিক পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতে পারে—এটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন সীমিত ও প্রয়োজনভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সাধারণ নিষেধাজ্ঞা এক জিনিস হয়ে যায়।
যদি নির্দিষ্ট নিরাপত্তা বা আদালতের শৃঙ্খলার কারণে সাংবাদিকদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়, তাহলে অ্যাক্রেডিটেশন, নির্দিষ্ট আসন, রোটেশন, প্রেস গ্যালারি বা পূর্বনির্ধারিত প্রবেশব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকদের দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি বিচার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ থেকে দূরে রাখা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা কোথায় শেষ হচ্ছে এবং অস্বচ্ছতা কোথা থেকে শুরু হচ্ছে?
‘আদালতের সংবাদ’ আর ‘আদালতের কার্যক্রম’ এক নয়
এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সম্ভবত এখানেই।
একজন সাংবাদিক আদালতের বাইরে দাঁড়িয়ে আইনজীবী, পক্ষ বা আদালত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন করতে পারেন। কিন্তু আদালতের ভেতরে উপস্থিত থেকে শুনানি পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতা ভিন্ন।
কে কী যুক্তি দিলেন, বিচারকের কোন প্রশ্নটি মামলার কোন দিককে সামনে আনল, কোন বক্তব্যের পর আদালত কী প্রতিক্রিয়া দেখাল—এসব অনেক সময় মামলার প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেবল লিখিত আদেশ বা পক্ষগুলোর বক্তব্যের ওপর নির্ভর করলে সেই প্রক্রিয়ার একটি অংশ অদৃশ্য থেকে যেতে পারে।
এ কারণেই সাংবাদিক সংগঠনগুলো বলছে, সরাসরি এজলাসে উপস্থিত হতে না পারলে নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ সংবাদ সংগ্রহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিচার বিভাগের জন্যও এটি ঝুঁকির প্রশ্ন
সাংবাদিকরা আদালতে প্রবেশের সুযোগ পেলে শুধু আদালতকে পর্যবেক্ষণ করেন না; তারা বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা তৈরিতেও ভূমিকা রাখেন।
স্বচ্ছতা মানে এই নয় যে আদালতের প্রতিটি কার্যক্রম ক্যামেরায় সম্প্রচার করতে হবে। বরং এর অর্থ হলো—যেখানে আইনগত বা বাস্তব নিরাপত্তাজনিত বাধা নেই, সেখানে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণের জানার সুযোগ থাকা।
উল্টোভাবে, দীর্ঘ সময় সাংবাদিকদের দূরে রাখার ফলে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ধারণা তৈরি হতে পারে—আদালতের ভেতরে কী হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষকে জানার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
এই ধারণাটি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানকে শুধু স্বচ্ছ থাকলেই হবে না; তার স্বচ্ছতাও দৃশ্যমান হতে হয়।
সমাধান কী হতে পারে?
এই পরিস্থিতিতে বিতর্ককে ‘সাংবাদিক বনাম আদালত’ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং প্রয়োজন এমন একটি কাঠামো, যাতে আদালতের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন কাজের সুযোগ নিশ্চিত হয়।
কয়েকটি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে—
১. নির্দিষ্ট প্রেস গ্যালারি: আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ এজলাসে সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট আসন রাখা।
২. অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা: সুপ্রিম কোর্ট বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের পরিচয় যাচাই করে নিয়মতান্ত্রিক প্রবেশাধিকার দেওয়া।
৩. প্রয়োজন হলে রোটেশন: আসনসংখ্যা সীমিত হলে সংবাদমাধ্যমগুলোকে রোটেশনের মাধ্যমে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া।
৪. স্পষ্ট লিখিত নীতিমালা: কোন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের প্রবেশ সীমিত করা যাবে, সেই বিষয়ে প্রকাশ্য ও পূর্বনির্ধারিত নিয়ম থাকা।
৫. ব্যতিক্রমের কারণ জানানো: কোনো নির্দিষ্ট শুনানিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ হলে তার কারণ ও সময়সীমা স্পষ্ট করা।
এতে আদালতের প্রশাসনিক প্রয়োজনও পূরণ হবে, আবার সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নিয়েও অনিশ্চয়তা থাকবে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু সাংবাদিকদের নয়
সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে বর্তমান বিরোধকে তাই শুধু একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর দাবি হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে উন্মুক্ত বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা।
১২ আগস্টের অবস্থান কর্মসূচিতে সাংবাদিক নেতারা সতর্ক করেছেন, প্রবেশাধিকার পুনর্বহাল না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি নেওয়া হতে পারে।
এখন দায়িত্ব কেবল সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নয়। আদালত প্রশাসনের কাছেও প্রয়োজন একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা—কেন এই দীর্ঘস্থায়ী বিধিনিষেধ প্রয়োজন, এর আইনগত ও প্রশাসনিক ভিত্তি কী এবং স্বাভাবিক প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার রূপরেখা কী।
কারণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিচার বিভাগের স্বচ্ছতাও স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সাংবাদিক আদালতের বিচার করেন না; তারা বিচারপ্রক্রিয়া জনগণের সামনে তুলে ধরেন। সেই জানালা যদি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—বিচার কি শুধু স্বাধীন থাকলেই যথেষ্ট, নাকি জনগণের কাছে দৃশ্যমান ও জবাবদিহিমূলকও হতে হবে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ক্রমেই কমছে।
আপনার মতামত জানানঃ