
ক্ষমতার পালাবদলের পর বাংলাদেশে একটি দৃশ্য প্রায় নিয়মিতভাবেই ফিরে আসে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সংস্থা, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সরকারি করপোরেশন, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় সরকারে শুরু হয় নতুন নিয়োগ। বিদায়ী সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা সরে যান; তাঁদের জায়গায় আসেন নতুন ক্ষমতাসীন দলের নেতা, কর্মী কিংবা সমর্থক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরা।
প্রতিবারই এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘প্রশাসন সচল করা’, ‘যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া’ কিংবা ‘গতিশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা’। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দরজায় শুধু নামফলক বদলায়; নিয়োগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায় না।
গত ২৩ জুলাই সরকার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়সহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১১টি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা বিএনপির কেন্দ্রীয় বা সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সাবেক কর্মকর্তা শামসুল আলম বিএনপির নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত একটি কমিটিতে যুক্ত ছিলেন—যদিও তিনি নিজেকে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত হিসেবে মানতে অস্বীকার করেছেন। The Daily Star
নিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট, তাঁত বোর্ড, প্রবাসী কর্মসংস্থান সংস্থা এবং সমাজকল্যাণ পরিষদ।
এগুলো শুধু কয়েকটি সরকারি অফিস নয়। প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের বিপুল সম্পদ ও অর্থ পরিচালনা করে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে এবং শিল্প, পরিবহন, প্রবাসী কর্মসংস্থান, জলবায়ু অর্থায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয়।
ফলে প্রশ্নটি শুধু কে কোন পদ পেলেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় পদ কি এখনো জনস্বার্থে দায়িত্ব পালনের জায়গা, নাকি নির্বাচনে বিজয়ী দলের নেতাদের পুরস্কৃত ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা?
প্রতিশ্রুতি ছিল ভিন্ন
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপির ইশতেহারে সুশাসন, জবাবদিহি ও রাষ্ট্র সংস্কারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। দলটি প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার, পেশাদারত্ব ফিরিয়ে আনার এবং নিয়োগে সততা, দক্ষতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ইশতেহারে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন, শক্তিশালী সরকারি কর্ম কমিশন, স্বাধীন পুলিশ কমিশন এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থার কথা বলা হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার অঙ্গীকারও ছিল স্পষ্ট। The Business Standard
এই প্রতিশ্রুতির পেছনে একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা ছিল। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে প্রশাসন, পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, স্থানীয় সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছিল। পদোন্নতি, নিয়োগ ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি রাজনৈতিক আনুগত্য বড় বিবেচ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সেই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু বিরোধী মতের কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করা ছিল না। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পেশাগত সংস্কৃতি ধ্বংস হয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে এই বার্তা গেছে যে রাষ্ট্রের নয়, ক্ষমতাসীন দলের আস্থা অর্জনই কর্মজীবনে এগিয়ে যাওয়ার কার্যকর পথ।
বিএনপি ক্ষমতায় ফিরেছিল এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাসের মধ্যেই যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ শুরু হয়, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক।
রাজনৈতিক ব্যক্তি কি রাষ্ট্রীয় পদে অযোগ্য?
কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই তিনি অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক নয়। রাজনীতিতে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও দক্ষ প্রশাসক, বিশেষজ্ঞ, সংগঠক ও জনস্বার্থে কাজ করার মতো যোগ্য মানুষ থাকতে পারেন। পৃথিবীর বহু গণতান্ত্রিক দেশেই সরকার রাজনৈতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যক্তিদের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী পদে নিয়োগ দেয়।
তবে রাজনৈতিক নিয়োগ এবং দলীয় পুনর্বাসনের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
কোনো পদে উন্মুক্ত আবেদন আহ্বান করা হলো কি না, যোগ্যতার মানদণ্ড কী ছিল, অন্য কোনো প্রার্থী বিবেচিত হয়েছেন কি না, নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট খাতে অভিজ্ঞতা কতটুকু এবং তাঁর সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত কীভাবে সামলানো হবে—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর থাকলে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়োগের একমাত্র বিচার্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় না।
কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়াই অনুপস্থিত। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো আগে থেকেই নির্ধারিত ব্যক্তিদের দেওয়া হয়; পরে সরকারি আদেশের মাধ্যমে নিয়োগ জানানো হয়। জনগণ জানতে পারে না, কোন যোগ্যতা বা মূল্যায়নের ভিত্তিতে একজন দলীয় নেতাকে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হলো।
সরকারের বক্তব্য, ১২টি নিয়োগই যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীও কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী দায়িত্ব পালনকালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সাংগঠনিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। bdnews24.com
কিন্তু কাগজে দলীয় পদ ছেড়ে দিলেই বহু বছরের রাজনৈতিক আনুগত্য, যোগাযোগ ও স্বার্থের সম্পর্ক বিলুপ্ত হয়ে যায় না। বরং স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা না থাকলে জনগণের মনে যুক্তিসংগত সন্দেহ তৈরি হয়—যোগ্যতার কারণে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, নাকি দলীয় অবদানের পুরস্কার হিসেবে?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক নির্বাচন কমিশন
অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগটি বেশি সংবেদনশীল। কারণ নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা শুধু কমিশনারদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে না; এর সচিবালয়ের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়োগ পাওয়া শামসুল আলম আগে নির্বাচন কমিশনের উপসচিব ছিলেন এবং ২০১৭ সালে অবসর নেন। তিনি ২০২৫ সালে বিএনপির নির্বাচনী এলাকার সীমানা পর্যালোচনা কমিটিতে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তাঁকে কমিশন সচিবালয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে বসানোয় বিরোধীরা কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এখানে শামসুল আলম ব্যক্তিগতভাবে পক্ষপাতমূলক আচরণ করবেন কি না, সেটি একমাত্র প্রশ্ন নয়। স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রকৃত নিরপেক্ষতার পাশাপাশি দৃশ্যমান নিরপেক্ষতাও প্রয়োজন। জনগণ ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো যদি যুক্তিসংগতভাবে মনে করে যে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত, তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশনের একজন সদস্য জানিয়েছেন, কমিশনের নিজস্ব সচিবালয়ে কর্মকর্তা নিয়োগে কমিশনেরই কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই; নিয়োগ দেয় সরকার। এই পরিস্থিতি প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতার কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ করে।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সচিব নিয়োগ এবং আলাদা নির্বাচন কমিশন সার্ভিস প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছিল। সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন না করে সরকারের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হলে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমিত থেকে যায়।
১২টি নিয়োগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়
দলীয়করণের অভিযোগ শুধু জুলাইয়ের ১২টি নিয়োগে সীমাবদ্ধ নয়। মার্চ মাসে সরকার ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেয়, যাঁদের প্রত্যেকেই বিএনপির কেন্দ্রীয় কিংবা জেলা পর্যায়ের নেতা। তাঁদের মধ্যে ১১ জন কেন্দ্রীয় এবং ৩১ জন জেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতা ছিলেন। The Daily Star
সরকারের যুক্তি ছিল, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় অকার্যকর হয়ে পড়া জেলা পরিষদগুলোকে সচল ও গতিশীল করতে রাজনৈতিক প্রশাসক প্রয়োজন। আমলাদের তুলনায় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের যোগাযোগ বেশি—এই যুক্তিও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের বৈধতা যদি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থেকে আসে, তাহলে প্রশাসক নিয়োগের বদলে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে না কেন?
নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকে প্রশাসক বানানো হলে তিনি জনপ্রতিনিধি হন না; তিনি সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত দলীয় প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। এতে স্থানীয় সরকার একদিকে নির্বাচিত নেতৃত্ব হারায়, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক বিস্তারের অংশে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বরাবরই একটি পুরস্কার-বণ্টন ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়া নেতা, দলের দীর্ঘদিনের কর্মী কিংবা অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের বিভিন্ন করপোরেশন, বোর্ড ও পরিষদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে দলীয় অসন্তোষ সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও প্রতিষ্ঠানগুলো পেশাগত নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।
‘ওরা করেছে’ কি গ্রহণযোগ্য যুক্তি?
দলীয় নিয়োগের পক্ষে প্রায়ই বলা হয়, আগের সরকারও একই কাজ করেছে। আওয়ামী লীগ যদি বছরের পর বছর দলীয় লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে থাকে, তাহলে বিএনপি কেন তার সমর্থকদের সুযোগ দেবে না?
এই যুক্তির মধ্যেই বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বড় সংকট লুকিয়ে আছে।
অন্যায় ব্যবস্থার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা যদি একই ব্যবস্থা দখল করার আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তন কখনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপ নেয় না। শুধু সুবিধাভোগীর পরিচয় বদলায়।
দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকা বিএনপির বহু নেতা-কর্মী নিপীড়ন, মামলা ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন—এটি একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। তাঁদের প্রতি দলের দায়ও থাকতে পারে। কিন্তু সেই দায় পূরণের জায়গা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়। দল তার কর্মীদের সাংগঠনিক দায়িত্ব, রাজনৈতিক মনোনয়ন কিংবা দলীয় কাঠামোর মাধ্যমে মূল্যায়ন করতে পারে। সরকারি পদ জনগণের সম্পদ; সেটি দলীয় ক্ষতিপূরণের উপকরণ হতে পারে না।
বরং যারা দীর্ঘদিন দলীয়করণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, তাঁদের কাছেই আরও উচ্চমানের আচরণ প্রত্যাশিত। কারণ তাঁরা জানেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয় দখলে গেলে বিরোধী মতের নাগরিক ও পেশাজীবীদের কী ধরনের মূল্য দিতে হয়।
কেন দলীয়করণ এত সহজে ফিরে আসে?
বাংলাদেশে নিয়োগের এই সংস্কৃতি শুধু ক্ষমতাসীনদের নৈতিক দুর্বলতার কারণে টিকে নেই। এর পেছনে শক্তিশালী কাঠামোগত কারণ রয়েছে।
প্রথমত, বহু স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে নিয়োগের নির্দিষ্ট, প্রকাশ্য এবং প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি নেই। আইন সরকারকে ব্যাপক বিবেচনামূলক ক্ষমতা দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রণালয়গুলোর হাতে নিয়োগক্ষমতা অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত। রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিক নিয়োগ দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
জুলাই সনদের খসড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু কয়েকটি পদে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন নিয়োগক্ষমতা দেওয়ার প্রশ্নে বিএনপিও আপত্তি জানিয়েছিল। The Business Standard
তৃতীয়ত, নিয়োগের পর স্বাধীন পর্যালোচনা বা সংসদীয় শুনানির ব্যবস্থা নেই। ফলে যোগ্যতা, সম্পদের বিবরণ, স্বার্থের সংঘাত কিংবা রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্য যাচাই হয় না।
চতুর্থত, প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের মেয়াদ ও অপসারণের সুরক্ষা দুর্বল। যিনি সরকারের ইচ্ছায় নিয়োগ পান এবং সরকারের ইচ্ছাতেই অপসারিত হতে পারেন, তাঁর কাছ থেকে সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা আশা করা কঠিন।
এই কাঠামো পরিবর্তন না করলে ভবিষ্যতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, একই পথ ব্যবহারের প্রলোভন থাকবে।
পরিবর্তন সম্ভব কীভাবে
দলীয়করণ বন্ধ করতে শুধু ভালো মানুষ নিয়োগ কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করলে হবে না। এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে ক্ষমতাসীন দল চাইলেও ইচ্ছামতো প্রতিষ্ঠান দখল করতে পারবে না।
গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শীর্ষপদের জন্য প্রকাশ্য যোগ্যতার মানদণ্ড থাকতে হবে। শূন্যপদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়ে আবেদন ও মনোনয়নের সুযোগ দিতে হবে। স্বাধীন অনুসন্ধান কমিটি সম্ভাব্য প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করবে এবং নির্বাচনের কারণ প্রকাশ করবে।
নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারি কর্ম কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নিয়োগে সংসদীয় শুনানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রার্থীর পেশাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক সম্পর্ক, সম্পদ ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত জনগণের সামনে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি শুধু বর্তমান দলীয় পদ ছেড়েছেন কি না, সেটিই যথেষ্ট নয়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দায়িত্ব ও সংশ্লিষ্টতার তথ্য প্রকাশ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট বিরতিকাল বা ‘কুলিং-অফ পিরিয়ড’ চালু করা যেতে পারে।
সবশেষে, স্থানীয় সরকারে অনির্দিষ্টকাল দলীয় প্রশাসক বসিয়ে রাখার বদলে দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে। জনগণের প্রতিষ্ঠান জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই পরিচালনা করবেন—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম।
ক্ষমতার পরিবর্তন রাষ্ট্র সংস্কারের সুযোগ তৈরি করে; সংস্কার নিজে থেকে আসে না। নতুন ক্ষমতাসীনরা যদি পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধা গ্রহণ শুরু করে, সেই সুযোগ দ্রুত হারিয়ে যায়।
বিএনপির সামনে এখনো পথ বদলানোর সুযোগ রয়েছে। বিতর্কিত নিয়োগগুলো পর্যালোচনা, যোগ্যতার ভিত্তি প্রকাশ এবং ভবিষ্যতের জন্য স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা প্রবর্তন করলে সরকার দেখাতে পারে যে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়।
তা না হলে বাংলাদেশের মানুষ আবারও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে—দল বদলেছে, কিন্তু দলীয়করণ নয়; শুধু রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের নতুন দাবিদার এসেছে।
আপনার মতামত জানানঃ