
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের পর সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত সংখ্যাটি ৬২.২৫ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন; ফেল করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। অর্থাৎ প্রতি দশজন পরীক্ষার্থীর প্রায় চারজন মাধ্যমিক শিক্ষার শেষ ধাপের প্রধান পাবলিক পরীক্ষাটি অতিক্রম করতে পারেনি। ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল ৫৮.৩৬ শতাংশ। তার পরের ১৯ বছরে এবারের হারই সর্বনিম্ন।
এক বছরের ব্যবধানে পতনটিও সামান্য নয়। ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৬৮.৪৫ শতাংশ; এবার তা কমেছে ৬.২০ শতাংশ পয়েন্ট। জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ থেকে কমে হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬। কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন। ফলে আলোচনাটি শুধু কে পাস করল বা কে ফেল করল—সেখানে আটকে নেই। প্রশ্ন উঠেছে, এত দিন আমরা যে উচ্চ পাসের হারকে শিক্ষার অগ্রগতি হিসেবে দেখেছি, সেটি আদৌ শ্রেণিকক্ষের শেখার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না।
এই ফলকে সরাসরি ‘বিপর্যয়’ বলা যেমন সহজ, তেমনি একে শুধু ‘কঠোর মূল্যায়নের স্বাভাবিক ফল’ বলে পাশ কাটানোও বিপজ্জনক। দুটি বাস্তবতাই সম্ভবত একই সঙ্গে কাজ করেছে। উত্তরপত্রে যা লেখা হয়েছে, তার ভিত্তিতে নম্বর দেওয়া হলে কৃত্রিমভাবে উঁচু পাসের হার কমতে পারে। কিন্তু প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী ফেল করা, ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস না করা এবং বোর্ডভেদে বড় ব্যবধান—এসব কোনো মূল্যায়ন-পদ্ধতি দিয়ে একা ব্যাখ্যা করা যায় না। এগুলো শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের গভীর দুর্বলতার লক্ষণ।
বাংলাদেশে পাসের হার দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার মানের সবচেয়ে দৃশ্যমান মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০১১ সালে এই হার ৮০ শতাংশ ছাড়ায়, ২০১৪ সালে ওঠে ৯১.৩৪ শতাংশে। করোনাকালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও সীমিত বিষয়ের পরীক্ষায় ২০২১ সালে পাসের হার হয়েছিল ৯৩.৫৮ শতাংশ। পরে পূর্ণ সিলেবাস ও স্বাভাবিক পরীক্ষায় ফিরে হার নামতে থাকে—২০২২ সালে ৮৭.৪৪, ২০২৩ সালে ৮০.৩৯, ২০২৪ সালে ৮৩.০৪ এবং ২০২৫ সালে ৬৮.৪৫ শতাংশ। এবার তা ৬২.২৫ শতাংশ।
এই ধারাবাহিকতা দেখায়, পরীক্ষার ধরন, সিলেবাস ও মূল্যায়ননীতি ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলে। ফলে শুধু দুই বছরের পাসের হার পাশাপাশি রেখে শিক্ষার মান বেড়েছে বা কমেছে—এমন সরল সিদ্ধান্ত টানা যায় না। কিন্তু পূর্ণ সিলেবাস ফিরে আসার পর শিক্ষার্থীরা কেন এত বড় মাত্রায় পিছিয়ে পড়ছে, সেই প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগও নেই। বরং ফলাফল বলছে, আগের বিশেষ ব্যবস্থাগুলো যে শিখনঘাটতি আড়াল করেছিল, এখন তার একটি অংশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
এবারের পরীক্ষার্থীরা ২০২০ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছিল—ঠিক সেই সময়ে, যখন করোনার কারণে দীর্ঘ স্কুল বন্ধ শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষার শেষ অংশ ও মাধ্যমিক শিক্ষার শুরুর গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো তারা স্বাভাবিক শ্রেণিকক্ষের বাইরে কাটিয়েছে। অনলাইন শিক্ষা শহুরে ও তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের কিছু শিক্ষার্থীকে সহায়তা করলেও গ্রাম, নিম্ন আয়ের পরিবার এবং প্রযুক্তি-সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের বড় অংশ কার্যকর পাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। স্কুল খোলার পর পাঠ্যক্রম এগিয়েছে, কিন্তু সবার শেখার ঘাটতি শনাক্ত করে তা পূরণের কোনো দেশব্যাপী, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, সময়সূচির বিপর্যয় এবং কোনো কোনো অঞ্চলে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সংকটের ধাক্কা সব শিক্ষার্থী সমানভাবে সামলাতে পারে না। যার পরিবার গৃহশিক্ষক বা কোচিংয়ের ব্যয় বহন করতে পারে, সে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারে; দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থী পারে না। ফলে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলেও পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি এক নয়।
ইংরেজি ও গণিতের ফল সেই বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। নয়টি সাধারণ বোর্ডের মানবিক বিভাগের ছাত্রদের পাসের হার মাত্র ৪১.১৪ শতাংশ; ছাত্রীদের ৫৪.৩৮ শতাংশ। দুটি মৌলিক বিষয়ে দুর্বলতা দশম শ্রেণিতে হঠাৎ তৈরি হয় না। প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে ধারণাগত শিক্ষা দুর্বল থাকলে শিক্ষার্থী ওপরের শ্রেণিতে উঠলেও ঘাটতি সঙ্গে নিয়েই এগোয়। আমাদের শিক্ষা কাঠামো সেই ঘাটতি শনাক্ত করার বদলে বার্ষিক পরীক্ষায় ন্যূনতম নম্বর দিয়ে পরের শ্রেণিতে তুলে দেওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এসএসসিতে এসে সেই জমে থাকা দুর্বলতার আর আড়াল থাকে না।
বোর্ডভিত্তিক ফলেও শিক্ষার ভৌগোলিক বৈষম্য প্রকট। নয়টি সাধারণ বোর্ডে ঢাকার পাসের হার সর্বোচ্চ ৭১.৬৩ শতাংশ, আর ময়মনসিংহে সর্বনিম্ন ৫৭.৩৯ শতাংশ। যশোরে ৬৬.২৭, কুমিল্লায় ৬৫.৪২, রাজশাহীতে ৬৩.৬৭, বরিশালে ৬০.৩৫, চট্টগ্রামে ৫৯.৪৮, সিলেটে ৫৮.৩৩ এবং দিনাজপুরে ৫৮.০৫ শতাংশ। মাদ্রাসা বোর্ডে হার ৫৫.৪৯ এবং কারিগরি বোর্ডে ৫৮.২০ শতাংশ। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের সম্মিলিত পাসের হার ৬৪.০৫ শতাংশ হলেও মাদ্রাসা ও কারিগরিসহ সামগ্রিক হার নেমেছে ৬২.২৫ শতাংশে।
এই ব্যবধানকে শিক্ষার্থীর মেধার আঞ্চলিক পার্থক্য বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না। কোথাও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই, কোথাও শিক্ষক থাকলেও প্রশিক্ষণ ও নজরদারি দুর্বল, কোথাও নিয়মিত ক্লাসের বদলে কোচিংই প্রধান ভরসা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বহু স্কুলে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের দক্ষ শিক্ষক পাওয়া কঠিন। একই জাতীয় পাঠ্যক্রম থাকলেও শেখার সুযোগ তাই সমান নয়। ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষকসংকটে থাকা স্কুলের শিক্ষার্থী একই পরীক্ষায় বসে, কিন্তু তাদের প্রস্তুতির অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল সম্ভবত আরও বড় সতর্কসংকেত। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩০ হাজার ৪০২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯৮৪ থেকে কমে ৬৬৯ হয়েছে। বিপরীতে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠান ১৩৪ থেকে বেড়ে ৩১২—এক বছরে প্রায় ১৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি। একটি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ফেল করলে দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো যায় না। সেখানে শিক্ষক উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক শূন্যপদ, স্কুল ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পাঠদান, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি—সবকিছুর নিরীক্ষা প্রয়োজন।
ফলাফলে লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধানও তাৎপর্যপূর্ণ। মেয়েদের পাসের হার ৬৬.৬৮ শতাংশ, ছেলেদের ৫৭.৮৬ শতাংশ—ব্যবধান ৮.৮২ শতাংশ পয়েন্ট। জিপিএ–৫ পেয়েছে ৬৩ হাজার ৮৯৬ ছাত্রী এবং ৫২ হাজার ৭৮০ ছাত্র। একসময় মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ; এখন অনেক সূচকে তারা ছেলেদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এটি মেয়েদের অগ্রগতির ইতিবাচক দিক হলেও ছেলেরা কেন পিছিয়ে পড়ছে, তা পৃথকভাবে অনুসন্ধান করা দরকার। দারিদ্র্য, কিশোর বয়সে কাজে প্রবেশ, পড়াশোনায় অনাগ্রহ, স্কুলের সঙ্গে দুর্বল সংযোগ এবং সামাজিক প্রত্যাশা—সবই ভূমিকা রাখতে পারে।
পরীক্ষায় কঠোর মূল্যায়ন অবশ্যই অস্বস্তিকর ফল আনতে পারে। কিন্তু সততার সঙ্গে নম্বর দেওয়া শিক্ষার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নয়। বছরের পর বছর উদার নম্বর দিয়ে পাসের হার বাড়ানো হলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—কেউই প্রকৃত ঘাটতি বুঝতে পারে না। শিক্ষার্থী সনদ পায়, কিন্তু উচ্চশিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে গিয়ে ভাষা, গণিত ও সমস্যা সমাধানের মৌলিক দক্ষতায় হোঁচট খায়। ফলে একটি সৎ ফল খারাপ দেখালেও দীর্ঘ মেয়াদে তা সংশোধনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে সেই যুক্তি তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন মূল্যায়নের মান সব বোর্ডে এক হবে, পরীক্ষকেরা পর্যাপ্ত নির্দেশনা ও সময় পাবেন এবং ফল প্রকাশের পর দুর্বল শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য রাষ্ট্র নির্দিষ্ট সহায়তা দেবে। শুধু ‘যা লিখেছে, তাই নম্বর পেয়েছে’ বললে শিক্ষাব্যবস্থার দায় শেষ হয় না। একজন শিক্ষার্থী দশ বছর স্কুলে পড়ার পরও যদি মৌলিক বিষয়ে উত্তীর্ণ হতে না পারে, তবে সে কী শিখেছে—এই প্রশ্নের পাশাপাশি স্কুল তাকে কী শেখাতে পারেনি, সেটিও জিজ্ঞাসা করতে হবে।
এখন প্রয়োজন ৩১২টি শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন একাডেমিক নিরীক্ষা; বোর্ড, জেলা, বিষয়, লিঙ্গ ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পূর্ণ ফল উন্মুক্ত করা; ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে ভাষা ও গণিতের নিয়মিত শিখন-নির্ণয়; দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য স্কুলভিত্তিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি; এবং প্রত্যন্ত এলাকায় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও ধরে রাখার বিশেষ প্রণোদনা। একই সঙ্গে শুধু পাস ও জিপিএ–৫ নয়, শিক্ষার্থী শ্রেণি অনুযায়ী কী পড়তে, লিখতে, গণনা করতে ও বিশ্লেষণ করতে পারে—সেই তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা জরুরি।
ফেল করা ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়েও তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা দরকার। পুনঃপরীক্ষার সুযোগ বা পরের বছর আবার পরীক্ষা দেওয়ার বিধান থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী হতাশা, সামাজিক অপমান ও আর্থিক চাপে শিক্ষা ছেড়ে দিতে পারে। তাদের কাউন্সেলিং, পুনঃপ্রস্তুতি, কারিগরি শিক্ষায় সেতুবন্ধন এবং পরিবারকে সচেতন করার ব্যবস্থা না থাকলে একটি পরীক্ষার ব্যর্থতা স্থায়ী শিক্ষা-বিচ্ছেদে পরিণত হতে পারে। ফল প্রকাশের পর আত্মহানি বা অপমানজনক আচরণ ঠেকাতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও স্পষ্টভাবে প্রচার করা উচিত।
সুতরাং এবারের ফল ‘খারাপ’—কিন্তু তা শুধু শিক্ষার্থীর খারাপ ফল নয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থার ফল, যেখানে পাঠ্যক্রম বদলায় দ্রুত, শিক্ষক প্রস্তুতি এগোয় ধীরে; সবাই একই পরীক্ষায় বসে, কিন্তু শেখার সুযোগ সমান নয়; পাসের হার নিয়ে রাষ্ট্র গর্ব করে, অথচ প্রকৃত দক্ষতা মাপার তথ্য থাকে সীমিত। কঠোর মূল্যায়ন যদি এই বাস্তবতা সামনে এনে থাকে, তবে সংখ্যাটি অস্বস্তিকর হলেও তা প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা।
এখন সবচেয়ে বড় ভুল হবে আবার নম্বর উদার করে পাসের হার ৮০ বা ৯০ শতাংশে তুলে সমস্যাটিকে আড়াল করা। সফলতা হবে তখনই, যখন আগামী বছরের পাসের হার বাড়ার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বাস্তব শেখাও বাড়বে। ৬২.২৫ শতাংশ কোনো চূড়ান্ত রায় নয়; এটি একটি আয়না। সেই আয়নায় শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার পাশাপাশি রাষ্ট্র, বিদ্যালয়, পাঠ্যক্রম, শিক্ষকব্যবস্থা ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতিচ্ছবিও দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি আয়নাটি ভেঙে ফেলব, নাকি তাতে দেখা সমস্যাগুলো ঠিক করব?
আপনার মতামত জানানঃ