
১৯২০ সালের ১০ আগস্ট। প্যারিসের উপকণ্ঠে সেভ্র শহরের একটি চীনামাটির কারখানার প্রদর্শনীকক্ষে বসেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তিগুলোর প্রতিনিধিরা। তাঁদের সামনে একটি পরাজিত সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ। ছয় শতাব্দীর বেশি সময় ধরে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করা অটোমান সাম্রাজ্য তখন সামরিকভাবে বিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া এবং রাজনৈতিকভাবে প্রায় অচল।
সেদিন স্বাক্ষরিত সেভ্র চুক্তি ছিল কাগজে-কলমে একটি শান্তিচুক্তি। বাস্তবে এটি ছিল অটোমান ভূখণ্ড ছিন্নভিন্ন করে বিজয়ী শক্তিগুলোর মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা। চুক্তিটি পুরোপুরি কার্যকর হলে আনাতোলিয়ার একটি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া অটোমানদের হাতে প্রায় কিছুই থাকত না। এমনকি সেই অবশিষ্ট রাষ্ট্রটির সেনাবাহিনী, অর্থনীতি, সমুদ্রপথ ও রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপরও বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতো।
কিন্তু ইতিহাসের বিস্ময় এখানেই—চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলেও কার্যকর করা যায়নি। যে সাম্রাজ্যকে বিজয়ীরা মৃত ভেবেছিল, তার ধ্বংসস্তূপ থেকেই মুস্তফা কামালের নেতৃত্বে শুরু হয় প্রতিরোধ। মাত্র তিন বছরের মধ্যে সেভ্র চুক্তি পরিত্যক্ত হয়, অটোমান সালতানাত বিলুপ্ত হয় এবং জন্ম নেয় আধুনিক তুরস্ক।
সেভ্র তাই শুধু একটি ব্যর্থ চুক্তির ইতিহাস নয়। এটি দেখায়, মানচিত্রে টানা রেখা আর বাস্তব ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়; সামরিক বিজয় দিয়ে একটি জাতির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সব সময় নির্ধারণ করা যায় না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানি ও অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির পক্ষে যোগ দিয়েছিল। যুদ্ধের আগে থেকেই সাম্রাজ্যটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বলকান অঞ্চলের অধিকাংশ ভূখণ্ড হারিয়ে গিয়েছিল, আরব প্রদেশগুলোতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বাড়ছিল এবং ইউরোপীয় ঋণের ওপর নির্ভরতা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত করেছিল।
তারপরও অটোমানরা দারদানেলিসে মিত্রবাহিনীকে পরাজিত করেছিল এবং গ্যালিপলির যুদ্ধে ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু যুদ্ধের সামগ্রিক ফল পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা, আরব বিদ্রোহ এবং জার্মানির পরাজয়ের পর ১৯১৮ সালের ৩০ অক্টোবর অটোমান সরকার মুদ্রোস যুদ্ধবিরতিতে স্বাক্ষর করে।
যুদ্ধবিরতির পর বিজয়ী শক্তিগুলো অটোমান ভূখণ্ড দখল করতে শুরু করে। ব্রিটিশ বাহিনী ইস্তাম্বুলে প্রবেশ করে। ইতালি দক্ষিণ-পশ্চিম আনাতোলিয়ায় অবস্থান নেয়। ফরাসিরা সিলিসিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। ১৯১৯ সালের মে মাসে গ্রিক সেনাবাহিনী স্মিরনা—বর্তমান ইজমির—দখল করে।
অটোমান সরকারের হাতে তখন নামমাত্র ক্ষমতা ছিল। সুলতান ষষ্ঠ মেহমেদ ইস্তাম্বুলে অবস্থান করলেও তাঁর সরকার কার্যত বিজয়ী শক্তিগুলোর নির্দেশের বাইরে যেতে পারছিল না। এই পরিস্থিতিতেই অটোমান সাম্রাজ্যের জন্য শান্তিচুক্তির শর্ত তৈরি হয়।
সেভ্র চুক্তির সবচেয়ে বড় দিক ছিল ভূখণ্ডের পুনর্বণ্টন। পূর্ব থ্রেস এবং এজিয়ান সাগরের কয়েকটি দ্বীপ গ্রিসকে দেওয়ার কথা ছিল। স্মিরনা আনুষ্ঠানিকভাবে অটোমান সার্বভৌমত্বের মধ্যে থাকলেও এর প্রশাসন চলে যেত গ্রিসের হাতে। পাঁচ বছর পর গণভোটের মাধ্যমে অঞ্চলটি গ্রিসের সঙ্গে যুক্ত হবে কি না, তা নির্ধারণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
পূর্ব আনাতোলিয়ায় একটি স্বাধীন আর্মেনিয়া প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি ছিল চুক্তিতে। নতুন রাষ্ট্রটির সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনকে। কুর্দি-অধ্যুষিত অঞ্চলের জন্য প্রথমে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন এবং পরে নির্দিষ্ট শর্তে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আবেদন করার সুযোগও রাখা হয়েছিল।
অন্যদিকে আনাতোলিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ফ্রান্স ও ইতালির প্রভাববলয় নির্ধারণ করা হয়। অটোমান সাম্রাজ্যের আরব ভূখণ্ডগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ পরিত্যাগের বিষয়টি চুক্তিতে নিশ্চিত করা হয়। সিরিয়া ও লেবানন ফরাসি এবং মেসোপটেমিয়া—পরবর্তী ইরাক—ও ফিলিস্তিন ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ব্যবস্থার অধীনে চলে যায়।
তবে আজকের মধ্যপ্রাচ্যের সব সীমান্ত সেভ্র চুক্তিই প্রথম তৈরি করেছিল—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। যুদ্ধ চলাকালীন সাইকস–পিকো সমঝোতা এবং পরে সান রেমো সম্মেলনে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ইতোমধ্যে অটোমান আরব ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেভ্র মূলত সেই সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকে একটি বিস্তৃত শান্তিচুক্তির মধ্যে আইনি রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
ইস্তাম্বুল ও তার আশপাশের একটি ছোট অঞ্চল সুলতানের অধীনে থাকার কথা ছিল। কিন্তু বসফরাস ও দারদানেলিস প্রণালি অটোমানদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকত না। প্রণালিগুলোকে নিরস্ত্রীকরণ করে একটি আন্তর্জাতিক কমিশনের অধীনে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ওই কমিশনে অটোমান রাষ্ট্রের কার্যকর কর্তৃত্ব থাকত অত্যন্ত সীমিত।
সামরিক ক্ষেত্রেও শর্ত ছিল কঠোর। অটোমান সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজারে সীমাবদ্ধ করার কথা ছিল। ভারী অস্ত্র, আধুনিক নৌবাহিনী ও সামরিক বিমানবাহিনী রাখার সুযোগ ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সীমান্ত পাহারা দেওয়ার মতো সীমিত দায়িত্বেই বাহিনীটিকে আটকে রাখা হতো।
আরও গভীর ছিল অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। রাষ্ট্রীয় বাজেট, করব্যবস্থা, ঋণ ও কেন্দ্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালির প্রভাব প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। বিদেশিদের বিশেষ বিচারিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া পুরোনো ‘ক্যাপিটুলেশন’ ব্যবস্থাও ফিরিয়ে আনার কথা ছিল। অর্থাৎ আনাতোলিয়ার ছোট ভূখণ্ডটুকু অটোমানদের হাতে থাকলেও রাষ্ট্রটির প্রকৃত সার্বভৌমত্ব থাকত প্রশ্নবিদ্ধ।
চুক্তিতে যুদ্ধের সময় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের মিত্রশক্তির হাতে তুলে দেওয়ার বিধানও ছিল। বিশেষ করে আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা ও নির্বাসনের দায় নির্ধারণের প্রশ্ন এতে স্থান পেয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি।
সেভ্র চুক্তির আনুষ্ঠানিক নথিতেই এর কঠোরতার চিত্র স্পষ্ট। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ঐতিহাসিক নথিতে পরবর্তীকালে এটিকে ইউরোপের অন্যান্য যুদ্ধোত্তর চুক্তির চেয়েও কঠোর বলে বর্ণনা করা হয়—কারণ এতে ভূখণ্ড হারানোর পাশাপাশি বিদেশি নিয়ন্ত্রণের মাত্রাও ছিল ব্যাপক। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ঐতিহাসিক নথি
চুক্তিতে অটোমান সরকারের প্রতিনিধিরা স্বাক্ষর করলেও অটোমান সংসদ এটি অনুমোদন করেনি। ফলে আইনগত দিক থেকে চুক্তিটি পূর্ণ কার্যকারিতা পায়নি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তখন ইস্তাম্বুলের বাইরে আরেকটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে গেছে।
মুস্তফা কামাল পাশা ১৯১৯ সালের মে মাসে সামসুনে পৌঁছে জাতীয় প্রতিরোধ সংগঠিত করতে শুরু করেন। তাঁর নেতৃত্বে আঙ্কারায় গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সরকার দাবি করে, ইস্তাম্বুলের সুলতান সরকার বিদেশি দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বৈধতা তার নেই।
সেভ্র চুক্তির সংবাদ তুর্কি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে। যে পরিকল্পনা অটোমান রাষ্ট্রকে দুর্বল করার কথা ছিল, সেটিই উল্টো প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়। মুস্তফা কামালের আন্দোলন সেভ্রকে শুধু একটি অসম চুক্তি নয়, তুর্কি ভূখণ্ড ও স্বাধীনতা নিশ্চিহ্ন করার বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরে।
তবে এই প্রতিরোধ ছিল শুধু তুর্কি জাতীয় স্বাধীনতার সরল গল্প নয়। আনাতোলিয়া তখন বহু জাতি ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি ছিল। আর্মেনীয়, গ্রিক ও কুর্দিদের নিজস্ব রাজনৈতিক দাবি এবং যুদ্ধকালীন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা ছিল। তুর্কি জাতীয়তাবাদের বিজয়ের ফলে স্বাধীন আর্মেনিয়া ও সম্ভাব্য কুর্দিস্তানের পরিকল্পনা বিলুপ্ত হয় এবং পরবর্তী সময়ে অঞ্চলটির জনমিতি সহিংসভাবে বদলে যায়।
১৯২০ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে আঙ্কারা সরকার একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ করে। পূর্বে আর্মেনীয় বাহিনী, দক্ষিণে ফরাসি বাহিনী এবং পশ্চিমে গ্রিক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। সোভিয়েত রাশিয়া মুস্তফা কামালের আন্দোলনকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করে। বলশেভিক নেতৃত্ব ও তুর্কি জাতীয়তাবাদীদের আদর্শ এক ছিল না; কিন্তু পশ্চিমা শক্তির বিরোধিতা তাদের সাময়িক অংশীদারে পরিণত করেছিল।
প্রথম দিকে গ্রিক বাহিনী আনাতোলিয়ার গভীরে অগ্রসর হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল আঙ্কারার জাতীয়তাবাদী সরকারকে পরাজিত করে সেভ্রের ব্যবস্থা কার্যকর করা। কিন্তু ১৯২১ সালের সাকারিয়া যুদ্ধে গ্রিক অগ্রযাত্রা থেমে যায়। পরের বছর তুর্কি বাহিনীর ‘মহা আক্রমণ’ গ্রিক প্রতিরক্ষা ভেঙে দেয়। ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বরে তুর্কি বাহিনী স্মিরনা পুনর্দখল করে।
স্মিরনা পুনর্দখলের পর শহরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং বিপুলসংখ্যক গ্রিক ও আর্মেনীয় অধিবাসী বাস্তুচ্যুত হয়। ফলে তুর্কি স্বাধীনতাযুদ্ধের বিজয় এক পক্ষের কাছে জাতীয় মুক্তি হলেও অন্য পক্ষের কাছে তা ছিল মাতৃভূমি হারানো, মৃত্যু ও নির্বাসনের ইতিহাস।
যুদ্ধক্ষেত্রে তুর্কি জাতীয়তাবাদীদের বিজয়ের পর ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালি বুঝতে পারে, বড় সামরিক অভিযান ছাড়া সেভ্র চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ক্লান্ত ইউরোপীয় শক্তিগুলো নতুন যুদ্ধে জড়াতে প্রস্তুত ছিল না। ফ্রান্স ও ইতালি এরই মধ্যে তুর্কি জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে সমঝোতার পথে এগোচ্ছিল। গ্রিসও সামরিকভাবে পরাজিত।
১৯২২ সালের অক্টোবরে মুদ্রানিয়া যুদ্ধবিরতি সই হয়। এর মাধ্যমে যুদ্ধ থামে এবং নতুন শান্তি সম্মেলনের পথ তৈরি হয়। একই বছরের ১ নভেম্বর আঙ্কারার গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি অটোমান সালতানাত বিলুপ্ত করে। ষষ্ঠ মেহমেদ দেশত্যাগ করেন। ছয় শতাব্দীর বেশি সময়ের অটোমান রাজবংশীয় শাসনের রাজনৈতিক সমাপ্তি ঘটে।
নতুন আলোচনায় এবার ইস্তাম্বুলের পরাজিত সুলতান সরকারের বদলে আঙ্কারার জাতীয়তাবাদী সরকার তুর্কি পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করে। ১৯২৩ সালের ২৪ জুলাই সুইজারল্যান্ডের লুজানে নতুন শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেভ্রের বিপরীতে লুজান চুক্তি আনাতোলিয়া ও পূর্ব থ্রেসের ওপর নতুন তুর্কি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়। দ্য লুজান প্রজেক্ট
স্বাধীন আর্মেনিয়া ও কুর্দি স্বায়ত্তশাসনের বিধান লুজানে আর রাখা হয়নি। বিদেশিদের ক্যাপিটুলেশন সুবিধা বিলুপ্ত হয় এবং তুরস্কের অর্থনীতি ও প্রশাসনের ওপর সরাসরি মিত্র নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা প্রত্যাহার করা হয়। তবে তুরস্ককে সাবেক অটোমান আরব ভূখণ্ড, সাইপ্রাস, মিসর ও অন্যান্য এলাকার ওপর দাবি ছেড়ে দিতে হয়। মসুলের ভবিষ্যৎও তখনই চূড়ান্ত হয়নি; পরে অঞ্চলটি ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রিত ইরাকের অংশ হয়।
লুজান আলোচনার সঙ্গে যুক্ত গ্রিস–তুরস্ক জনবিনিময় ছিল নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি। আনাতোলিয়ার প্রায় ১৫ লাখ অর্থোডক্স খ্রিস্টানকে গ্রিসে এবং গ্রিসের প্রায় পাঁচ লাখ মুসলমানকে তুরস্কে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। ধর্মকে পরিচয়ের প্রধান মানদণ্ড ধরে পরিচালিত এই বিনিময়ে বহু মানুষ এমন দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, যেখানে তাদের পরিবার শতাব্দীর পর শতাব্দী বসবাস করেছিল।
১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর তুরস্ককে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয় এবং মুস্তফা কামাল হন এর প্রথম প্রেসিডেন্ট। সেভ্র চুক্তিতে যে ভূখণ্ডকে বিদেশি প্রভাববলয়ে ভাগ করার পরিকল্পনা হয়েছিল, তার বড় অংশ নিয়ে একটি কেন্দ্রীভূত জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই কারণে আধুনিক তুরস্কের রাজনৈতিক স্মৃতিতে ‘সেভ্র’ শুধু একটি ঐতিহাসিক চুক্তির নাম নয়। এটি দেশকে দুর্বল করা, বাইরে থেকে ভাগ করে দেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র ভাঙার আশঙ্কার প্রতীক। তুর্কি রাজনীতিতে এই মানসিকতাকে অনেক সময় ‘সেভ্র সিনড্রোম’ বলা হয়। বিদেশি শক্তি তুরস্কের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে—এমন অভিযোগে আজও সেই স্মৃতি ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু সেভ্রের ইতিহাসকে শুধু পশ্চিমা ষড়যন্ত্র বনাম তুর্কি বীরত্বের গল্পে সীমাবদ্ধ রাখলেও পুরো সত্য পাওয়া যায় না। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পেছনে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পাশাপাশি সাম্রাজ্যের নিজস্ব বৈষম্য, জাতীয়তাবাদী সংঘাত, যুদ্ধকালীন নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতা কাজ করেছিল। আর্মেনীয়, গ্রিক, আরব ও কুর্দি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস বাদ দিলে সেভ্র ও লুজানের পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা যায় না।
সেভ্রের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত অন্য জায়গায়। বিজয়ী শক্তিগুলো মানচিত্র এঁকেছিল, সেনাবাহিনীর আকার নির্ধারণ করেছিল এবং কোন অঞ্চল কার হাতে যাবে তা লিখে দিয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার রাজনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা তাদের ছিল না। অন্যদিকে চুক্তিটি প্রত্যাখ্যানকারী জাতীয়তাবাদীরা ভূখণ্ডের ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে কাগজের পরিকল্পনা নয়, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতাই নতুন চুক্তির শর্ত নির্ধারণ করে।
সেভ্র অটোমান সাম্রাজ্যকে বাঁচাতে পারেনি। বরং সাম্রাজ্যটির আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ত্বরান্বিত করেছিল। কিন্তু বিজয়ীরা যে ক্ষুদ্র ও পরাধীন তুর্কি রাষ্ট্রের নকশা এঁকেছিল, সেটিও জন্ম নেয়নি। তার বদলে জন্ম নেয় আরেক ধরনের রাষ্ট্র—ভৌগোলিকভাবে ছোট, রাজনৈতিকভাবে জাতীয়তাবাদী এবং নিজের সার্বভৌমত্ব নিয়ে গভীরভাবে সংবেদনশীল আধুনিক তুরস্ক।
এই কারণেই ১০ আগস্ট ১৯২০ শুধু একটি চুক্তি স্বাক্ষরের দিন নয়। এটি সেই দিন, যেদিন অটোমান সাম্রাজ্যকে মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল—এবং একই সঙ্গে অজান্তেই এমন একটি প্রতিরোধের জন্ম দেওয়া হয়েছিল, যা তিন বছরের মধ্যে সেই মানচিত্র আবার বদলে দেয়।
সেভ্র চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি পাঠ ব্রিটিশ সরকারের চুক্তি সংগ্রহে সংরক্ষিত আছে। মূল চুক্তির নথি—FCDO
আপনার মতামত জানানঃ