
শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনকে শুধু একজন ক্ষমতাচ্যুত নেতার রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখলে ঘটনাটির বৃহত্তর তাৎপর্য ধরা যাবে না। এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ভারতের বাংলাদেশনীতি এবং দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার একটি পরীক্ষা।
মানবজমিনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ঢাকার কঠোর বিবৃতির পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিল্লির অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে এবং সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তাসহ একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ঢাকা আসতে পারেন। তবে এই ‘বিশেষ পত্র’ বা নতুন আমন্ত্রণের দাবি অন্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। উপরন্তু, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ সংবাদ সম্মেলনের আগেই পাঠানো হয়েছিল। ফলে দিল্লির আগের আমন্ত্রণকে ঢাকার বিবৃতির তাৎক্ষণিক ফল বলা যাবে না। মানবজমিন, প্রথম আলো
সংবাদ সম্মেলন কেন কূটনৈতিক ঘটনায় পরিণত হলো
দিল্লির ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া আয়োজিত অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা সরাসরি উপস্থিত না হয়ে অডিও মাধ্যমে কথা বলেন। তিনি আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নিজের বিরুদ্ধে মামলাগুলো বাতিল এবং ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা বলেন। এটি ছিল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তার প্রথম সরাসরি প্রশ্নোত্তর। রয়টার্স
অনুষ্ঠানটির সময় নির্বাচনও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের সরকার যখন ৫ আগস্টকে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মরণ ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাস নির্মাণের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে, তখন একই দিনে দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা সেই অভ্যুত্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ভাষ্য উপস্থাপন করেছেন। ফলে ঘটনাটি নিছক সংবাদ সম্মেলন না থেকে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ইতিহাসের সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ আগেই ভারতকে জানিয়েছিল, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তা সত্ত্বেও অনুষ্ঠানটি হওয়ায় ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি অপমান হিসেবে বর্ণনা করে। প্রথম আলোর পর্যালোচনা
ভারত বলছে, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজন; ভারত সরকার এর সঙ্গে যুক্ত নয় এবং সেখানে প্রকাশিত বক্তব্যও সমর্থন করে না। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একই অবস্থান জানিয়েছে।
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি দুর্বল। শেখ হাসিনা সাধারণ কোনো বিদেশি নাগরিক নন; তিনি ভারতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করছেন এবং তার প্রত্যর্পণ চেয়েছে বাংলাদেশ। দিল্লি অনুষ্ঠানটি আয়োজন না করলেও চাইলে তা ঠেকাতে পারত—এমন অভিমত দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকদেরও। দ্য গার্ডিয়ান, যুগান্তর
ঢাকার বিবৃতি দিল্লির পাশাপাশি দেশের রাজনীতির জন্যও
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির ভাষা প্রচলিত কূটনৈতিক ভাষার তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কঠোর ও রাজনৈতিক। এতে শেখ হাসিনার বিচারিক পরিচয়ের পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থান, জাতীয় মর্যাদা, তাঁবেদার রাষ্ট্র না হওয়া এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
এর একটি অংশ দিল্লির উদ্দেশে—ভারতকে বোঝানো যে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ দেওয়া এবং বর্তমান সরকারের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়া একই সঙ্গে সম্ভব নয়।
অন্য অংশটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির উদ্দেশে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের বিষয়ে নরম অবস্থান নিচ্ছে—এমন অভিযোগ ওঠার সুযোগ রাখতে চায় না। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে আশ্রয়, প্রত্যর্পণের অনিশ্চয়তা এবং আওয়ামী লীগের ভারতকেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতা জনমনে ভারতবিরোধী ক্ষোভ বাড়াতে পারে। কঠোর বিবৃতি দিয়ে সরকার নিজের জাতীয়তাবাদী অবস্থান ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন ভাবমূর্তি তুলে ধরেছে।
কিন্তু এখানে ঝুঁকিও রয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিবৃতির ভাষা যদি দলীয় রাজনৈতিক ভাষার খুব কাছাকাছি চলে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমঝোতার জায়গা সংকুচিত হয়। সরকারের প্রত্যাশা পূরণ না হলে একই মাত্রার কঠোরতা বজায় রাখতে হয়; অন্যথায় দেশে সেটি কূটনৈতিক পিছু হটা হিসেবে প্রচারিত হতে পারে।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক লক্ষ্য কী
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তব পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশলও হতে পারে। দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তার গ্রেপ্তার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তার প্রত্যাবর্তন সমর্থক ও বিরোধীদের পাল্টাপাল্টি সমাবেশ, সহিংসতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। প্রথম আলো
তবু ঘোষণাটির কয়েকটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
প্রথমত, নিষিদ্ধ ও সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগের কর্মীদের সক্রিয় রাখা। দ্বিতীয়ত, বর্তমান সরকারকে প্রতিনিয়ত শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নিজের বিচার ও আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞাকে রাজনৈতিক নিপীড়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা।
এখানে একটি বৈপরীত্যও রয়েছে। বাংলাদেশের আদালতের নির্দেশে দেশীয় সংবাদমাধ্যমে তার বক্তব্য প্রচার সীমিত হলেও দিল্লির আয়োজনটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। অর্থাৎ দেশে বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা উল্টো বিদেশে তার রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
ভারতের ‘হাসিনা কার্ড’-এর সীমাবদ্ধতা
ভারতের সামনে এখন দুটি পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য। একদিকে শেখ হাসিনা ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র। তাকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করলে দিল্লির আঞ্চলিক মিত্ররা ভারতের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সহযোগিতা ছাড়া সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, নদীর পানি ও চীনের প্রভাব মোকাবিলা করা ভারতের জন্য কঠিন।
ফলে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বিকল্প বা চাপ প্রয়োগের উপকরণ হিসেবে ধরে রাখার সুবিধা আছে। কিন্তু তাকে যত বেশি প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিসর দেওয়া হবে, বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের খরচ তত বাড়বে।
এ কারণেই ভারত এক ধরনের মধ্যবর্তী অবস্থান নিচ্ছে: শেখ হাসিনাকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তার বক্তব্যকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা ও শীর্ষ পর্যায়ের সম্ভাব্য বৈঠকের পথও খোলা রাখা হচ্ছে।
এই ভারসাম্য দীর্ঘদিন ধরে রাখা কঠিন। কারণ বাংলাদেশের কাছে প্রশ্নটি শুধু ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততার নয়; ভারতীয় ভূখণ্ড বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেটিই মূল বিষয়।
২৪ ঘণ্টায় কি সত্যিই দিল্লির কৌশল বদলেছে?
মানবজমিনের প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু এখনো অনিশ্চিত অংশ হলো ঢাকার বিবৃতির পর দিল্লি থেকে কথিত বিশেষ বার্তা পাঠানোর দাবি। এমন বার্তা এসে থাকলে তা সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা কমানোর চেষ্টা হিসেবে দেখা যাবে। কিন্তু একে ভারতের নীতিগত পরিবর্তন বা বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিজয় বলা আগাম সিদ্ধান্ত হবে।
কারণ ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণ আগেই দেওয়া হয়েছিল। নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সরকারের বৈঠকও স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। তাই সময়ের কাছাকাছি দুটি ঘটনা ঘটলেই একটি অন্যটির ফল—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
ভারতের প্রকৃত নীতিগত পরিবর্তন বোঝা যাবে কয়েকটি পদক্ষেপে:
- শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভারত কী আচরণ করে;
- বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধে দিল্লি আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায় কি না;
- তারেক রহমানের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হয় কি না;
- সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য, ভিসা, তিস্তা ও গঙ্গার পানি নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে কি না।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিরোধ যদি রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পুরো পরিসর দখল করে নেয়, তাহলে দুই দেশই বড় কৌশলগত ক্ষতির মুখে পড়বে।
সামনে কোন পথে সম্পর্ক
নিকট ভবিষ্যতে পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ কিংবা দ্রুত বন্ধুত্ব—কোনোটিই সম্ভাব্য নয়। সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট হলো নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা: প্রকাশ্যে কঠোর বক্তব্য, কিন্তু নেপথ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা।
ঢাকা চাইবে ভারত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা সীমিত করুক এবং বর্তমান সরকারকে বাংলাদেশের বৈধ রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব হিসেবে গ্রহণ করুক। দিল্লি চাইবে নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও চীনসংক্রান্ত স্বার্থে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে, কিন্তু শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্কও সম্পূর্ণ ছিন্ন না করতে।
সংকটটির আসল পরীক্ষা তাই একটি সংবাদ সম্মেলন নয়। ভারত কি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে একজন নির্দিষ্ট নেতার সম্পর্ক থেকে আলাদা করতে পারবে? আর বাংলাদেশ কি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামলে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক, ধারাবাহিক ভারতনীতি গড়ে তুলতে পারবে?
এই দুই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ঢাকা–দিল্লির সম্পর্ক পুনর্গঠন হবে, নাকি ‘হাসিনা কার্ড’ দুই দেশকে আরও দীর্ঘ অবিশ্বাসের মধ্যে আটকে রাখবে।
আপনার মতামত জানানঃ